Image description

নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হলেও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা ঠেকাতে ফের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

নানা ইস্যুতে মতপার্থক্য, রাজনৈতিক দূরত্ব ও পারস্পরিক টানাপোড়েন থাকলেও আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর প্রশ্নে দল তিনটির মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য ধরে রাখার তাগিদ তৈরি হয়েছে।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাত এবং বিভিন্ন স্থানে এনসিপির জুলাই পদযাত্রায় বিএনপির ছাত্রসংগঠনের হামলার ঘটনায় দল তিনটির শীর্ষ পর্যায়ে এ নিয়ে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।

বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতা টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেছেন, নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ, রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোসহ নানা বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় সেই মতপার্থক্য প্রকাশ্যও হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ যাতে এসব বিভাজনের সুযোগ নিয়ে আবারও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না পায় সে বিষয়ে তিন দলের মধ্যেই সমন্বয় রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট দিল্লীর ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য দেয়া এবং তার সাম্প্রতিক তৎপরতা সামনে আসার পর দলগুলোর এমন তাগিদ লক্ষ্য করা গেছে।

ক্যাম্পাসে সংঘাত, কেন্দ্রের সতর্কতা

জুলাইয়ের শেষভাগ থেকে আগস্টের শুরুতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটে। কর্মসূচি পালন, আধিপত্য, মিছিল-মিটিং এবং জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রশ্নে তৈরি হয় এই বিভাজন।

গত ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ ছিল বেশ আলোচনায়।

এসব ক্যাম্পাসে এনসিপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রশক্তির নেতারাও অনেকেক্ষেত্রে আক্রমণের শিকার হন। এ ছাড়া আগে থেকেই ঢাকা ও রাজশাহী বিশবিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের পাল্টাপাল্টি তৎপরতায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

দলগুলোর সূত্র বলছে, ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তা শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতিকেই অস্থিতিশীল করবে না, বরং বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয়ও দুর্বল করতে পারে। এ কারণে ছাত্রসংগঠন ছাড়াও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে সংঘাত এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এমন তথ্যের ইঙ্গিত দিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম টাইমসকে বলেন, ‘চব্বিশ পরবর্তীতে আমরা ক্যাম্পাসে সহাবস্থান চেয়েছি। কিন্তু কয়েকটি ক্যাম্পাসে ঝামেলার পর আমি নিজে ছাত্রদলের হাইকমাণ্ডের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের আপাতত উপলব্ধি হয়েছে, ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি হলে দিনশেষে ছাত্রলীগসহ ফ্যাসিবাদ সুযোগ নিতে পারে বা তারাও ক্ষতিতে পড়তে পারে।’

অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘কিছু জায়গায় ঝামেলার পর ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে আমরা অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাতে ইতিবাচক ফল এসেছে। বিষয়টি বিএনপির হাইকমাণ্ডের পরামর্শে হয়েছে বিষয়টি এরকম নয়। ফ্যাসিবাদ বিরোধী অবস্থান অটুট রাখা ও চেতনা থেকেই আমরা এটি করেছি।’

ঐক্যের প্রয়োজন থাকলেও আস্থার সংকট

বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একদিকে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা।

নির্বাচন, সংস্কার, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতাও এখন একেবারে সহজ নয়।

দলগুলোর শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও তা যেন আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না দেয়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাসসুজ্জামান দুদু টাইমসকে বলেন, ‘ছাত্রদল ও শিবির দুটি ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসে আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এখন তাদের মাঝে নানা ইস্যুতে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। তারপরও আগামীতে আওয়ামী লীগ ঠেকানো প্রশ্নে ছাত্রদল-শিবির এক কাতারে থাকবে এটিই স্বাভাবিক।’

ক্যাম্পাসে সংঘাত কমানোর উদ্যোগ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় সহাবস্থান নিশ্চিত করা, গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির কর্মসূচিতে বিরোধ এড়ানোর তাগিদ এবং শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য আভাস দিচ্ছে, তাদের মধ্যে আস্থার সংকট থাকলেও আওয়ামী লীগ ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায়।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ টাইমসকে বলেন, ‘ক্যাম্পাস বা রাজনীতির মাঠে অস্থিরতা তৈরি হলে আওয়ামী লীগ যে লাভবান হবে সেটি তো পরিস্কার। সুতরাং সেটি যেন না হয় আমরা সে ব্যাপারে সচেতন।’

বিএনপিকে বিশ্বাস করা কঠিন, তবুও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে তারা এক থাকবেন বলে টাইমসকে জানিয়েছেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহীন।

তিনি বলেন, ‘এনসিপির পদযাত্রায় হামলার পর বিএনপির শীর্ষ নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছেন, এ ধরণের কর্মকাণ্ড করবে না বিএনপি। তারপরও বারবার হামলা হয়েছে।’

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় সহাবস্থান

গত ৪ আগস্ট ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর সহাবস্থানের তাগিদ থেকেই গত ৯ আগস্ট সেখানে সবপক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন ঢাকা-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ এবং জামায়াতের ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন। মাদ্রাসা প্রশাসনসহ সবপক্ষের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকের পর ১০ আগস্ট থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ফিরেছেন। সেখানে আগে থেকেই ছিল ছাত্রদল। কোলাকুলির মাধ্যমে দুইপক্ষের ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়।

আলিয়া মাদ্রাসার ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। সংসদ সদস্য কামাল হোসেন জানান, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তা বৃহত্তর আওয়ামী লীগবিরোধী ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে-এমন ভাবনা থেকে আলোচনার উদ্যোগ ছিল।

বর্ষপূর্তির কর্মসূচিতেও বিভাজন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি আয়োজিত অনুষ্ঠানেও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ্যে আসে।

চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের ওই অনুষ্ঠানে জুলাই-আগস্টের যে ভিডিও চিত্র দেখানো হয় সেখানে অসঙ্গতি থাকায় অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য ও দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। অবশ্য জামায়াত নেতারা সেখানে বক্তব্য দেন।

ওই অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অবশ্য ভিন্ন বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বা মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রশ্নে তাদের এক থাকতে হবে।’

একইদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত কর্মসূচিতেও নিজেদের মধ্যে বিরোধের চিত্র সামনে এসেছে। শরিয়তপুরের জাজিরা, নারায়নগঞ্জে তোলারামপুর কলেজে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর ও গাইবান্ধায় কোথাও কর্মসূচির নেতৃত্ব, কোথাও মিছিল নিয়ে উত্তেজনা ও মারামারির ঘটনা ঘটে।

এনসিপির পদযাত্রায় হামলা

নিজেদের মধ্যে দূরত্বের পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলোর কর্মসূচি ঘিরে হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এনসিপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সিলেট ও হবিগঞ্জে হামলার ঘটনা ঘটে। গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ছাত্রদলের হামলায় এনসিপির কর্মী আলিফের একটি চোখ হারানোর খবরও উদ্বেগ তৈরি করে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা চালায়, তাহলে তা আন্দোলনের মূল চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।