Image description

একসময় বিএনপির রাজনীতিতে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন। ছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। বিএনপির প্রতিষ্ঠার পর দলটির সংগঠন গড়ে তোলার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে খালেদা জিয়ার সরকারের মন্ত্রীও হন। সেই অলি আহমদই এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। তাকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির আসনসংখ্যা অনেক বেশি। ফলে বিএনপির প্রার্থীই জয়ী হবেন—এমন হিসাব রাজনৈতিক অঙ্গনে আগে থেকেই রয়েছে। তারপরও অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তকে শুধু ভোটের হিসাব দিয়ে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট নেতারা।

এখানে জামায়াতের রাজনৈতিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। অলি আহমদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বীরত্বের জন্য তিনি ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকার জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে একজন পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে রাখা দলটির জন্য রাজনৈতিকভাবে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এ কারণেই অলি আহমদকে অনেকে জামায়াতের ‘মুক্তিযোদ্ধা কার্ড’ হিসেবে দেখছেন।

এই সমীকরণ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে অলি আহমদকে নিয়ে জামায়াতের আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ১১–দলীয় জোটের এক নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অলি আহমদের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। ওই বক্তব্যের পর বিএনপির পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছিল।

অলি আহমদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচনেও তিনি বিএনপির হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালেও বিএনপির টিকিটে জয় পান।

তবে সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০০৬ সালে বিএনপির সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। পরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে মিলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন। এরপর রাজনীতির বিভিন্ন সময়ে তিনি বিএনপির সঙ্গে কখনো জোটে ছিলেন, কখনো দূরত্ব বজায় রেখেছেন।

২০১২ সালে এলডিপি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতিতে ছিলেন অলি আহমদ। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে। এলডিপি একপর্যায়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেয়।

নির্বাচনের পর অলি আহমদকে ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা যায়। গত ২৫ জুলাই সিলেটে জোটের সমাবেশে তিনি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলেন। তার বক্তব্য ছিল, এই তিন নেতা এক হলে সরকারের পতন ঘটতে বেশি সময় লাগবে না।

এবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে অলি আহমদের সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হলো। ১১–দলীয় ঐক্যের নেতাদের ভাষ্য, তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তবে এর সঙ্গে আরেকটি বার্তাও আছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয় সম্ভব নয় জেনেও অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে বিরোধী জোট। এর মাধ্যমে সংসদে তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং বিএনপির বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক সমীকরণ দেখানোর চেষ্টা থাকতে পারে।

একসময় যে অলি আহমদ ছিলেন বিএনপির ‘ঘরের লোক’, তিনিই এখন সেই দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়বেন। আর তাকে সামনে রেখেই জামায়াত একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক দূরত্বের বিতর্ক মোকাবিলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিএনপির বিরুদ্ধে নিজেদের জোটের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি সংখ্যার দিক থেকে একতরফা হলেও অলি আহমদের প্রার্থিতা নিয়ে রাজনৈতিক হিসাবটি মোটেই সরল নয়।