Image description

ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। আজ রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রায় দেড় ঘণ্টার এই বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষ। তবে বৈঠকের পর ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য এবং সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার নির্ধারিত বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির অবস্থানের পার্থক্যই আগামী দিনের আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে উল্লেখ করে তার প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লির অবস্থান হলো, শেখ হাসিনা নিজেই দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি যদি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চান, তাহলে তাকে নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া এবং আদালতে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া উচিত।

ভারতীয় হাইকমিশনারের সোমবারের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে নয়াদিল্লির এই অবস্থান তুলে ধরার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারতীয় সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অবস্থানকে ‘প্রত্যর্পণের বিকল্প হিসেবে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখা গেলেও, তাকে ডিসেম্বরেই দেশে ফেরাতে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উদ্যোগ নিয়েছে—এমন দাবি নিশ্চিত করছে না সূত্র।

আগামীকাল সোমবার সকাল ১১টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটিই হবে ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। ফলে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

রোববার রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য একটি খেলার জায়গা উদ্বোধন করেন দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমস্যার সমাধান হয় যখন দুই পক্ষ কথা বলে। দুই দেশের নেতাদের মধ্যে আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জনবান্ধব নেতা হিসেবে উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সম্মান করে।

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর ভারতীয় হাইকমিশনারের এমন বক্তব্যকে সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের প্রকাশ্য মতপার্থক্যের মধ্যেও ভারত যে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে চায়, তার বক্তব্যে সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। পরে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয় এবং বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে জুলাইয়ে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক দিল্লির অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়েও তিনি দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান। তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও তিনি দাবি করেন। বাংলাদেশের সরকার অবশ্য তার এসব বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে।

৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশবিষয়ক সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে আগেই জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংগঠন আয়োজন করেছে এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সরকারের অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

কিন্তু শেখ হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি ভারতের কাছে কূটনৈতিকভাবে তোলা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সোমবার তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈঠকে শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি উঠতে পারে। একই সঙ্গে তার দেশে ফেরার ঘোষণার পর প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নয়াদিল্লির অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভারত শেখ হাসিনাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর বদলে তার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার বিষয়টিকে সামনে আনতে চাইছে। ভারতের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজেই যখন দেশে ফেরার কথা বলেছেন, তখন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব হবে তার দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি করা এবং তিনি যেন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া।

এখানে বাংলাদেশের অবস্থান ভিন্ন। ঢাকার বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতের রায় ও চলমান আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে তার দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নয়; তাকে দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। দুই দেশের এই অবস্থানের পার্থক্যই শেখ হাসিনাকে ঘিরে কূটনৈতিক আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে।

তবে সোমবারের বৈঠক শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই সম্মেলনের পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। আমন্ত্রণপত্রে তাকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক মহলের কিছু অংশ থেকে প্রশ্ন উঠেছে। কারও কারও বক্তব্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পরিবর্তে একটি আঞ্চলিক জোটের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা অসম্মানজনক। তবে নয়াদিল্লি এ ধরনের অভিযোগ নাকচ করেছে। ভারতের বক্তব্য, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের চেয়ারম্যান বা নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট পরিচয়েই আমন্ত্রণ জানানো হয়ে থাকে। ফলে এতে কোনো ধরনের অবমাননার উদ্দেশ্য ছিল না।

ভারতের পক্ষ থেকে একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহও প্রকাশ করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফরে নেওয়ার বিষয়েও আগ্রহী নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি ঢাকায় এসে সেই আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন।

এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ বৃহত্তর সম্পর্ককে সচল রাখার চেষ্টা করছে। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের পরিধি শুধু রাজনৈতিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুই দেশের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারতীয় সহযোগিতার প্রত্যাশা রয়েছে ঢাকার। এর আগে সংকটের সময়ে ভারত বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে অচল করে দেওয়ার সুযোগ সীমিত। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানি, বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। একইভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে।

এ কারণে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংকটকে কীভাবে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে আলাদা রাখা যায়, সেটিই এখন বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লিও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। তারেক রহমানও পারস্পরিক সম্মান ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

তবে এই ইতিবাচক বার্তার মধ্যেই শেখ হাসিনা ইস্যুটি বারবার সামনে আসছে। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া, ভারতে তার অবস্থান, সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং দেশে ফেরার ঘোষণা—প্রতিটি বিষয়ই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও মতপার্থক্যের জন্ম দিচ্ছে।

ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এমনকি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারত নেপথ্যে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে—এমন কথাও কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একইভাবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটিও এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তাকে দেশে ফেরার পর আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে—এ কথা বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে জানিয়েছে। অন্যদিকে তার সমর্থকদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে তার প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ব্যক্তির দেশে ফেরার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে।

দুই দেশের সম্পর্কের সামনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তার পানি বণ্টনসহ সীমান্ত ও নদীসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যেও এসব বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

সব মিলিয়ে সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তার দীর্ঘ বৈঠক, এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং একই সময়ে সেপ্টেম্বরে সম্ভাব্য দিল্লি সফর—সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লি যে নতুন করে যোগাযোগের পথ সক্রিয় রাখছে, তা স্পষ্ট।

তবে শেখ হাসিনাকে নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য রাতারাতি দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশ চাইছে তার প্রত্যর্পণ এবং আইনগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে। ভারত তার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে সামনে রাখছে এবং তার নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে আগামী দিনের আলোচনায় এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে থাকতে পারে।

অনেকের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর ‘কথাবার্তার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান’ মন্তব্যটি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভারতের নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা নয়। বরং সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে এটিকে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে নয়াদিল্লি যে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে আগ্রহী, সেটিও স্পষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনাকে ঘিরে মতপার্থক্যকে ঢাকা ও নয়াদিল্লি কতটা আলোচনার মাধ্যমে সামাল দিতে পারে। যদি এই একটি ইস্যুর বাইরে বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, যোগাযোগ, সীমান্ত ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি আনা যায়, তাহলে সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুযোগ থাকবে। আর যদি শেখ হাসিনা ইস্যুটি দুই দেশের পুরো সম্পর্ককে ছাপিয়ে যায়, তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও আবার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।