সংসদ ভেঙে গেলেও কেউ যদি নিজেকে সংসদ সদস্য দাবি করেন, তাহলে যে ঘটনাটি ঘটবে, ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে। সেখানে করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে মেয়র দাবি করে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন।
মেয়াদ শেষ হলেও শাহাদাত কীভাবে মেয়রের পদে, এ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কোনো বক্তব্য দেয়নি, কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, আদালতে গিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি।
অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই গত ফেব্রুয়ারিতে করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হবে জানিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিএনপি সরকারে আসার পর সেই বিভাগের কোনো নড়চড় নেই।
আইন অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও স্থানীয় সরকারের সেই নির্বাচন কবে হবে, সেটি ঠিক করে সরকার।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণার পর তিনি ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি হয় করপোরেশনের প্রথম সভা। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী প্রথম সভার তারিখ থেকেই করপোরেশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ গণনা শুরু হয়। সেই হিসেবে করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি।
কিন্তু নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১ অক্টোবর সেই মামলার রায় তার পক্ষে যায়। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেয়র পদে শপথ নেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক।
করপোরেশনের মেয়াদ শেষেও প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস হয়ে গেছে। তবু নির্বাচনের উদ্যোগ যেমন নেওয়া হয়নি, তেমনি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে মেয়রের জায়গায় কাউকে প্রশাসক বসানোর উদ্যোগও নেয়নি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
নির্বাচন কমিশনের আইন শাখার সাবেক যুগ্ম সচিব অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ শাহজাহান সাজু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে মামলা করে আদালতের রায়ে কেউ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেলেও তার করপোরেশনের অবশিষ্ট মেয়াদকালই দায়িত্ব পালন করার কথা।’
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ধরুন মামলা নিষ্পত্তি হতে হতে পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র পাঁচ দিন বাকি আছে। সেক্ষেত্রে তিনি সেই পাঁচ দিনের জন্য মেয়র হতে পারবেন। কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার আর কোনো সুযোগ নেই।’
নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আইনের দৃষ্টিতে শাহাদাতের মেয়র হিসেবে দায়িত্বে থাকার সুযোগ নেই। তবে বিষয়টি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়।
তারা জানান, আদালতের রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন শুধু গেজেট প্রকাশ করেছে। সেখানে নতুন করে কোনো পাঁচ বছরের মেয়াদের কথা উল্লেখ নেই। করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কী হবে, সেটি স্থানীয় সরকার বিভাগের বিষয়।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আইন মেয়রের ব্যক্তিগত মেয়াদ নির্ধারণ করেনি, মেয়াদ নির্ধারণ করেছে করপোরেশনের। ফলে করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে মেয়রের দায়িত্বও শেষ হয়ে যায়। কেউ হয়ত প্রশ্ন তুলছে না, এজন্য তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচন কমিশনার টাইমসকে বলেন, ‘এখানে নির্বাচন কমিশনের কোনো ভূমিকা নেই। স্থানীয় সরকার বিভাগ সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার নির্বাচন করতে বললে কমিশন প্রস্তুত রয়েছে।’
শাহাদাতের মেয়র পদে থাকার কোনো আইনি সুযোগই নেই বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউল আলম মজুমদার।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তাকে করপোরেশনের বাকি সময়ের জন্য মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি দাবি করছেন সম্পূর্ণ সময়ের জন্য। এটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা আইনের শাসনের সঙ্গে অসংগতি।’
আইনে কী আছে?
২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ৬ ধারায় ‘সিটি করপোরেশনের মেয়াদ’ বিষয়ে বলা হয়েছে, করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।
দুই বছর পর ২০১১ সালে এ আইন সংশোধনের সময় ‘তবে মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও পুনর্গঠিত সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা যাবে’ অংশটি বিলুপ্ত করা হয়।
সেই সঙ্গে ২০১১, ২০১২ ও ২০২৪ সালে ‘অবস্থা বিশেষে প্রশাসক নিয়োগ’, ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ ও কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা’, ‘নির্বাচনের সময়, ইত্যাদি’- তিন বিষয়ে সংশোধনীও আনা হয়।
মেয়াদ শেষের আগের ১৮০ দিনের মধ্যে এবং করপোরেশন গঠন বাতিলাদেশের পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে ভোটের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ছয় সিটিতে ও ১৪ মার্চ আরও পাঁচ সিটিতে দলের নেতাদের প্রশাসক পদে বসায়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সংশোধনীসহ অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিল সংশোধন বিল আকারে পাস করা হয়।
শাহাদাতের বিষয়ে সরকারের অবস্থান
শাহাদাত কীভাবে এখনো মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন-এ প্রশ্নে স্থানীয় সরকার বিভাগের কেউ সদুত্তর দিতে পারেননি।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব (সিটি করপোরেশন) মো. রবিউল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমরা তো মুখপাত্র না। আপনি সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আমাদের কাছে তথ্য চাইলে আমরা দিতে পারব।’
পরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় মুখপাত্র, এটা তিনি বলবেন।’
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন এবং মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে লিখিত প্রশ্ন পাঠালে তিনি তার একান্ত সচিব মো. মনিরুজ্জামানকে দিয়ে জবাব পাঠান। তিনি বলেন, ‘এটা আদালতের বিষয়, আদালত দেখবে।’
তবে এই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা শাহাদাত-কেউ আদালতে যাননি।
নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে ইসিকে চিঠি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠিয়েছিল। সেই চিঠিতেও ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা লেখা হয়।
তবে সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে আর কোনো নির্দেশনা পাঠানো হয়নি।
সে সময় নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া টাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার (শাহাদাত হোসেন) দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করার জন্য ইলেকশন কমিশনকে চিঠি দেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চাইছেন।’
শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে মেসেজ পাঠানো হলেও জবাব আসেনি।
তবে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামের সংবাদকর্মীদের কাছে তিনি দাবি করেন, আদালতের রায় অনুযায়ী ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত তার মেয়াদ।