বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিক, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার কনিষ্ঠ পুত্র নওফেল জমির এক ফেসবুক পোস্টে তার মৃত্যুর খবর জানান । তিনি লেখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আজ, ১২ জুলাই ২০২৬, ফজরের ওয়াক্তে আমার শ্রদ্ধেয় পিতা, মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার, তার রবের সান্নিধ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন।’
এদিকে, বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় বলা হয়, ‘গভীর শোক ও দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছে যে, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক স্পিকার, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আজ (১২ জুলাই) ফজরের ওয়াক্তে ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে জানান, ‘ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আজ ভোর ০৪ টা ১৯ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দোয়া করি, মহান আল্লাহ যেন স্যারকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মরহুমের জানাজার নামাজ ও দাফনের সময়সূচি পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমির উদ্দিন সরকার। তার পিতা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স ছিলেন একজন জোতদার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স), এমএ এবং পরে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল সনদ লাভ করেন।
১৯৬০ সালের ২৭ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হাইকোর্টের যে আইনজীবীরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম।
ছাত্রজীবনে ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন জমির উদ্দিন সরকার। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গঠিত জাগদলে যোগ দেন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে তাকে পাঁচবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইনমন্ত্রী থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিল প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
জমির উদ্দিন সরকার একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯ এবং পরবর্তীতে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।
রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারেও অবদান রাখেন তিনি। নিজ জন্মস্থান পঞ্চগড়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। আইন, সংসদীয় গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তার লেখা একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি নূর আখতারের স্বামী ছিলেন। ২০২৩ সালে তার স্ত্রী মারা যান। তাদের এক কন্যা নিলুফার জমির এবং দুই পুত্র নওশাদ জমির ও নওফেল জমির রয়েছেন। বড় ছেলে নওশাদ জমির সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপি।
প্রবীণ এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী মহল তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।