আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৭৮ বছর বয়সী এই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে।
শুক্রবার রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি এবং তার দলের সিনিয়র নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা এই ঘোষণাকে স্রেফ একটি “রাজনৈতিক স্টান্ট” রাজনৈতিক চালবাজি বলে মনে করছেন।
দেড় মাসেরও কম সময় আগে, গত ২৩ মে, ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ প্রথম শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ইচ্ছার খবর দেয়। “বিচারের মুখোমুখি হতে চান হাসিনা” শিরোনামের সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, দলের তৃণমূল কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি এ বছরের মধ্যেই দেশে ফিরতে ভীষণ আগ্রহী।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, যেহেতু তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে, তাই তিনি আগস্টের মধ্যে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ‘ট্রাভেল পাস’ বা ভ্রমণের অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “হাসিনা সবসময় বলতেন তিনি কখনো দেশ ছেড়ে পালাবেন না, অথচ শেষ পর্যন্ত তিনি পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন।”
শুক্রবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “এখন তিনি বলছেন ফিরে আসবেন, কিন্তু তিনি আসলে কখনোই ফিরবেন না।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরাও চাই তিনি ফিরে আসুন, যাতে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা যায়। এই গণহত্যাকারীকে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে সঠিক কূটনৈতিক ও আইনি পথ ব্যবহার করতে হবে।”
শুক্রবার ঢাকায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ আরও বলেন, “শেখ হাসিনা কিভাবে ফিরবেন বা আত্মসমর্পণ করবেন, সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। রাষ্ট্র সব প্রস্তুতি নিয়ে সঠিক সময়ে আইনি রায় কার্যকর করার ব্যবস্থা করবে।”
রয়টার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে হাসিনা দেশে ফেরার ঝুঁকির কথা মেনে নিয়ে বলেন, “আমি ফিরলে ওরা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “তা সত্ত্বেও আমাকে যেতেই হবে।” যে মাটিতে তার বাবা-মা শুয়ে আছেন, সেখানে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
২০২৪ সালে ছাত্রদের আন্দোলনের সময় কেন দেশ ছেড়েছিলেন, তার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “উত্তেজিত জনতা যখন আমার বাড়ির দিকে আসছিল, তখন প্রাণের ঝুঁকির কারণে আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম।”
শেখ হাসিনার ফিরে আসার ঘোষণাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বিএনপি সরকার। এনিয়ে সরকার বেশ সতর্ক। তারা এই ফেরার পরিকল্পনাকে দেশে নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরির একটি বিপজ্জনক “রাজনৈতিক ফাঁদ” হিসেবে মনে করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, এই পদক্ষেপটি আসলে আওয়ামী লীগ কর্মীদের চাঙ্গা করা এবং রাজপথে আন্দোলন শুরু করার একটি “পরিকল্পিত চাল”।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভয়, সুপ্রিম কোর্ট যদি শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো আপিল খারিজ করে দেয়, তবে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অশান্তি ও অরাজকতা তৈরি হতে পারে।
শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেই পুরো বিচারটিই আসলে একটি “প্রহসন”।
তিনি দাবি করেন, তিনি আত্মসমর্পণ করলে জনগণের সামনে সত্যিটা প্রমাণ হবে। জেলে যাওয়া নিয়ে তিনি ভয় পাচ্ছেন না জানিয়ে বলেন, ১৯৮১ এবং ২০০৭ সালেও তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে আইনি চাপ থাকলেও তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কখন বা কিভাবে দেশে ফিরবেন—এ বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সাথে কোনো আলোচনা করেননি।
দেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী এই প্রধানমন্ত্রীর ফেরার পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের টিকে থাকার বড় পরীক্ষা নেবে। ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ বারবার তাকে ফেরত চাইলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই অনুরোধটি খতিয়ে দেখছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক ভালো রাখতে কাজ করে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা জানান, তিনি অনলাইনের মাধ্যমে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সাথে বৈঠক করে দল গোছানোর কাজ করছেন।
তিনি মেনে নিয়েছেন, আদালতের রায়ের কারণে হয়তো তিনি নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। তবে তার দল নিষিদ্ধ বা স্থগিত করার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তবে জনগণই সেই বিচার করুক।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে “কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে”, তবে একটি সরকারকে বিচার করার আসল অধিকার কেবল জনগণেরই আছে।
সামরিক অভ্যুত্থানে তার পিতা স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্য নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে আসা শেখ হাসিনা প্রায় ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী নাম।
তার ২০ বছরের শাসনামলে মুসলিম প্রধান এই দেশটির “অর্থনীতির অনেক উন্নতি” হলেও, তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের মুখ বন্ধ রাখা ও দমনপীড়নের বড় অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পতনের আগে গণবিক্ষোভে প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।