জীবিত বাবাকে অবলীলায় শহীদ বলে দাবি করার পর, এখন তা সামান্য ‘মুখের ভুল’ বা ‘স্লিপ অব টাং’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন জামায়াতে ইসলামীর একজন সংসদ সদস্য। তবে বংশপরিচয় নিয়ে এমন অদ্ভুত কাণ্ড এখন দলটির আইনপ্রণেতাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি জামায়াতের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য যেন দলের প্রধান কৌতুকের উৎসে পরিণত হয়েছেন। জাতীয় সংসদে তারা এতটাই অদ্ভুত বক্তব্য দিচ্ছেন যে, তা স্পিকারের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করছে।
এমনকি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলও ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর কাছে স্বীকার করেছেন, তাদের নেতৃত্ব বিষয়টি খেয়াল করেছে এবং বর্তমানে ‘কী করা যায় তা নিয়ে ভাবছে’। সম্ভবত তারা নিজেদের সংসদ সদস্যদের জন্য কথা বলার পাঠশালা চালুর কথা ভাবছেন।
বক্তব্যের এই সর্বশেষ কসরত দেখিয়েছেন নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। গত ১৪ জুন সংসদ অধিবেশনে তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন, ‘আমার বাবা ও দাদা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমার বাবার সাত ভাই, যার মধ্যে চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমার ১১ জন দাদা বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে মোট ৪৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন।’
বংশলতিকার এমন অসাধারণ কীর্তি আরও বেশি অলৌকিক মনে হয় এই কারণে যে, মুনতাকিম জন্ম নিয়েছেন ১৯৮১ সালে, আর তার তথাকথিত শহীদ বাবা বর্তমানে দিব্যি জীবিত ও সুস্থ আছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে তিন দিন পর সংসদে ফিরে তিনি এটিকে ‘মুখের ভুল’ বলে দাবি করেন। লিখিত বক্তব্যে কিভাবে কেউ ভুলবশত নিজের জীবিত বাবাকে মৃত বানিয়ে দিতে পারেন টাইমস-এর এমন প্রশ্নের জবাবে মুনতাকিম চতুরতার সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে বলেন, তিনি আসলে তার বাবার চাচাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। সংশোধন করতে কেন পুরো তিন দিন সময় লাগল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া রয়েছে।’
সংসদের এই অদ্ভুত নাট্যশালায় পিছিয়ে ছিলেন না নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুস সাত্তারও। তিনি ‘চালুন’ ও ‘সূঁচ’ নিয়ে একটি গ্রামীণ উপমা ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই উপমাটি এতটাই আপত্তিকর ছিল যে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তিনি ওই আপত্তিকর বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন এবং সতর্ক করে বলেন, ‘সংসদে কথা বলার সময় সতর্ক থাকুন। আমরা কোনো অপ্রীতিকর বা অশ্লীল শব্দ শুনতে চাই না।’
সংসদ সদস্য সাত্তার অবশ্য সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন।
এদিকে জামায়াত নেতারা কেন বারবার কল্পকাহিনীর আশ্রয় নিচ্ছেন—মুনতাকিমের কাছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বেশ আধ্যাত্মিক জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘আমি ধীরে ধীরে চেষ্টা করছি। দয়া করে দোয়া করবেন যেন কোনো ভুল না হয়।’
রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের জন্য যেন আর কোনো জীবিত আত্মীয়কে এভাবে হারিয়ে যেতে না হয়, সেজন্য এই দোয়াই এখন ভরসা।
‘কিছু চাইনি, আমার তো পাওয়ার কথা ছিল’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে তার এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাটের জন্য পর্দা, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং ওয়াশিং মেশিনের মতো অত্যন্ত জরুরি সামগ্রীর ‘জোরালো দাবি’ তোলেন।
সংসদে এমন অভাব-অনটনের দৃশ্য দেখে বিজেপি চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ ব্যক্তিগতভাবে মিজানুরকে একটি ওভেন কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে একটি ওয়াশিং মেশিন দেওয়ার অনুরোধ করেন।
নির্বাচনের আগে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বর্জন করার যে প্রতিশ্রুতি জামায়াত দিয়েছিল, তার সঙ্গে গৃহস্থালি সামগ্রীর এই দাবি সাংঘর্ষিক কি না— টাইমসে’র এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুর বলেন, ‘আমি এগুলো চাইনি। এগুলো আমাদের বাসায় দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেওয়া হয়নি। আমি শুধু সেটাই তুলে ধরেছি।’
দলের নৈতিক অবস্থান নিয়ে যেন কোনো বিভ্রান্তি না থাকে, সেজন্য মিজানুর বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলি, আমাদের আমির বলেছিলেন যে আমরা সরকারি প্লট এবং শুল্কমুক্ত গাড়ি নেব না। ফ্ল্যাটের কথা তিনি বলেননি। তিনি ফ্ল্যাট নিয়ে কিছু বলেননি। আমরা সরকারি প্লট আর শুল্কমুক্ত গাড়ি নিইনি।’
এদিকে আন্দালিব রহমান পার্থের এই দানশীলতা জামায়াত নেতৃত্ব ভালোভাবে নেয়নি। পরের দিনই জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ক্ষুব্ধভাবে বিজেপি চেয়ারম্যানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সংসদ সদস্যের রান্নাঘর সাজানোর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমির প্রশ্ন তোলেন, ‘তার কাছে মাইক্রোওয়েভ ওভেন কে চেয়েছে?’
৬০০ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট!
গত ৪ জুন জামায়াতের কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা দেশের অর্থনৈতিক আলোচনাকে এক লহমায় কৌতুক বানিয়ে ছাড়েন। তিনি পরামর্শ দেন, দেশের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট কমিয়ে ‘অন্তত ২০০ বা ৬০০ কোটি টাকা’ করা উচিত। বিশাল সংখ্যার হিসাবে হয়তো তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাই তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নয় হাজার কোটি টাকাই অনেক বেশি।’
১৭ জুনের মধ্যে হামজা তার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে রন্ধনশিল্পের পর্যালোচনায় চলে যান। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, এই বাজেট ‘একটি চানাচুর ব্র্যান্ডের মতো, যা খেলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
টাইমস যখন তার এই ক্ষুদ্র বাজেট প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন হামজা গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপিয়ে দাবি করেন তিনি আসলে ছয় লাখ কোটি টাকা বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে যে কাটছাঁট ছাড়াই তাকে পরিষ্কার ‘৬০০ কোটি’ বলতে দেখা গেছে—তা মনে করিয়ে দেওয়া হলে তিনি দলের প্রিয় সেই আত্মরক্ষা ‘মুখের ভুল’ বা ‘স্লিপ অব টাং’-এর আশ্রয় নেন।
বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে হামজা মন্তব্য করেন, খোদ প্রধানমন্ত্রীরও মুখের ভুল হয়। আসলে ‘মানুষের কোনো কাজ নেই।’
তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের সঙ্গে হামজার শত্রুতা অবশ্য পুরোনো। মনোনয়ন পাওয়ার আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কাল্পনিক পড়াশোনার কথা বানিয়ে বলা, হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হলে দীর্ঘ ১৭ বছর আজান দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল বলে মিথ্যা দাবি করা এবং ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে অদ্ভুত মন্তব্য করার জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। স্বভাবতই দল তখন তাকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছিল।
সংসদের বাইরের ‘ভুল’
জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়ার এই শিল্প শুধু সংসদের হলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জামায়াতের আঞ্চলিক নেতারাও সমানভাবে নিজেদের কথাবার্তায় জড়িয়ে পড়ছেন।
গত জানুয়ারিতে রংপুর-৪ আসনের এটিএম আজম খানকে জোটের শরিক দলের কাছে তার মনোনয়ন ছেড়ে দিতে হয়। এই রাজনৈতিক ‘ত্যাগ’কে খান হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক কোরবানি ও পরীক্ষার সাথে তুলনা করেন। এই অহংকারপূর্ণ তুলনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে ১০ জানুয়ারি আজম খান তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দলের সেই চেনা পথ বেছে নেন এবং বলেন যে এটি ছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ‘মুখের ভুল’।
এদিকে, বরগুনায় জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান ডাকসু নিয়ে এক কাল্পনিক ইতিহাস তৈরি করে বিপাকে পড়েন। আহসান দাবি করেন, তাদের ছাত্রসংগঠন নির্বাচনে জেতার আগে ডাকসু মূলত মাদকের আখড়া ও ‘বেশ্যালয়’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে তিনি দ্রুত একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে বিনীতভাবে ক্ষমা চান।
একই ধারায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মো. নকিবুর রহমান টেলিভিশনের পর্দায় কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি করেন। ১ ফেব্রুয়ারি একটি টকশোতে রহমান বিএনপির আইটি সম্পাদককে ‘সাইবার সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। যখন তাকে এর সপক্ষে প্রমাণ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানানো হয়, তখন রহমান হঠাৎ করেই সংযমের গুণটি আবিষ্কার করেন। তিনি তার ‘অপ্রমাণিত’ মন্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান এবং স্বীকার করেন, তার ভাষা ‘অনুপযুক্ত’ ছিল।
‘ভুল মানুষেরই হয়, প্রশিক্ষণ জামায়াতের কাজ’
সহকর্মীদের বক্তব্যের এমন ধারাবাহিক বিপর্যয় নিয়ে টাইমস যখন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়েরের মুখোমুখি হয়, তখন তিনি চিরন্তন দর্শনের আশ্রয় নেন। তিনি টাইমস’কে মনে করিয়ে দেন, ‘মানুষ মাত্রেই ভুল হয়।’ সেই সঙ্গে আশাবাদী হয়ে যোগ করেন, ‘আর যারা নিজেদের ভুল সংশোধন করে নেয়, মানুষ তাদের ক্ষমা ও সহানুভূতির চোখেই দেখে।’
কিন্তু এই ‘মানবিক ভুলগুলো’ কেন আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো প্রতিদিন নিয়ম করে ঘটছে—এমন প্রশ্নের জবাবে জুবায়ের স্বীকার করেন, দলের নেতৃত্ব সংসদ সদস্যদের এই কৌতুককর পরিস্থিতি লক্ষ্য করেছে। তিনি বলেন, ‘সামান্য ভুল নিয়েও অনেক আলোচনা হচ্ছে। আমরাও বিষয়টি নিয়ে ভাবছি।’
বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন বক্তব্যের এই মহামারী ঠেকাতে জুবায়ের জানান, দল কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তাদের বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’