Image description

আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন করে মাঠ প্রস্তুত করছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের চেষ্টার মধ্যেই ২০২৪ সালে গণআন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডের জন্য দলের ক্ষমা চাওয়া উচিত কি না–তা নিয়ে এখন দলটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র বিতর্ক চলছে। এ বিষয়টি এখন রাজনৈতিক অঙ্গন এবং দলের সমর্থকদের মধ্যে আলোচনার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে দল আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে নয়। এর বদলে তারা এই সহিংসতার নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্ত চাইবে এবং সেই তদন্তের ফলাফল সবার সামনে প্রকাশের দাবি তুলবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, দেশের মানুষই সত্য বিচার করবে এবং ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

দলটির একাধিক নেতা জানান, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত লোকবল নামানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে শেখ হাসিনা দল গোছাতে চাইছেন। দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক গুরুত্ব ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন তিনি।

সম্প্রতি দেশজুড়ে কিছু মিছিল-সমাবেশ করেছেন আওয়ামী লীগের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বর্তমান সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংঘাতে না গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দলটির বর্তমান কৌশল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি রাজনৈতিক প্রভাব ফিরে পাওয়ার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।

অবশ্য দলের নীতিপ্রণেতারা জানেন, এখন রাজপথে আন্দোলন করতে গেলে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। তবে দলের ভেতরকার অনেকে মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে বাইরে থাকার চেয়ে জেলে যাওয়াই বেশি নিরাপদ। তাদের ধারণা, গণগ্রেপ্তার শুরু হলে কারাগারগুলোতে জায়গা থাকবে না। গ্রেপ্তার হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই তারা জামিন পেয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন।

গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে চলে যাওয়া শেখ হাসিনা এখন দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

তিনি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন। তার এই সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসার পর থেকেই দেশ-বিদেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্তের কারণে দেশের রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি দলের তৃণমূলের কর্মীরা নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। দলের অনেক শীর্ষ নেতা কারাগারে বা দেশের বাইরে থাকলেও শেখ হাসিনা সাধারণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

সরকার পতনের পর ভারত ছাড়া অন্য প্রায় সব দেশের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। গত দুই বছরে বিদেশে দলের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন শেখ হাসিনা। দলের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহত্যা ও দুর্নীতির অভিযোগের বিপরীতে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে নিজস্ব যুক্তি তুলে ধরছেন এবং নতুন বন্ধু তৈরির চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা অবশ্য জানেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এত সহজ হবে না। বর্তমান সরকার বাধা দিলে হাইকমিশন ট্রাভেল পাস নাও দিতে পারে। আবার ভারতও তাকে জোর করে সীমান্ত পার করে দেবে না। তবে ট্রাভেল পাসের আবেদন করার মাধ্যমেই তিনি বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কাড়তে চান। কারণ, আইন অনুযায়ী কোনো দেশই তার নাগরিককে দেশে ফিরতে বাধা দিতে পারে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো যেসব আন্তর্জাতিক পক্ষ আওয়ামী লীগের হয়ে মধ্যস্থতা করতে পারত, তারা এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত তাড়াহুড়ো না করে ধীরে চলো নীতি বজায় রাখবে। এ সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনা তার দল গোছানো, রাজপথে উপস্থিতি দেখানো এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পাবেন।

আপাতত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দলের ভেতরের ঐক্য জোরদার করার দিকেই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। এজন্য তিনি স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে অভ্যন্তরীণ ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরুরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।