Image description

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে সাধারণত ছাত্রত্ব শেষ করে কিংবা ছাত্রসংগঠনের পাট চুকিয়ে বিয়ে করার রেওয়াজই দীর্ঘদিনের। জামায়াতে ইসলামীর সমমনা ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্ষেত্রেও এতদিন এটিই ছিল অলিখিত নিয়ম—শিবির থেকে বিদায় নিয়ে বিয়ে করে মূল দল জামায়াতে যোগদান করা। তবে সম্প্রতি এই চিত্রে বড় ধরনের বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছাত্রাবস্থাতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন শিবিরের বহু নেতাকর্মী। এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদে নির্বাচিত শীর্ষ নেতারাও এর ব্যতিক্রম নন।

jagonews24ডাকসুতে জয়ী শিবিরের এই তিন নেতাই বিয়ে করেছেন-ছবি সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকাশ্যে আসে ইসলামী ছাত্রশিবির। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের পাঁচটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় পায় শিবির-সমর্থিত প্যানেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চকসু) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জকসু) ছাত্রসংসদে আসে নতুন নেতৃত্ব। এরপর থেকে ক্যাম্পাসগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের মুখোমুখি অবস্থানের খবর যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনই সমান্তরালভাবে আলোচনায় এসেছে শিবির নেতাদের বিয়ের বিষয়টিও। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারাও এখন ছাত্রজীবনেই ঘর বাঁধছেন।

ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকাকালীন এই শীর্ষ নেতাদের বিয়ে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা সমীকরণ মেলানো হচ্ছে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ একে ছাত্ররাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে ছাত্রসংসদে নির্বাচিত শিবির নেতাদের বিয়ে নিয়ে। গত ১৩ মে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম, যিনি বর্তমানে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক। প্রায় ৫ হাজার মানুষের সমাগমে হওয়া এই বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলছে।

 

jagonews24সাদিক কায়েমের বিয়েতে উল্লাস-ছবি সংগৃহীত

শিবির সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর চকসুর নির্বাহী সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস সানজিদাকে বিয়ে করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। একই দিনে বিয়ে হয় ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মহিউদ্দীন খানেরও। এছাড়া, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ২০২১ সালেই বিয়ে করেছেন। আর চলতি মাসের ৮ মে বিয়ে করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম ফাহিম।

একটা সময় শিবির নেতাদের বিয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা কড়াকড়ি থাকলেও এখন অনেকটা শিথিল। ছাত্র অবস্থায় বিয়ে করলে ছাত্র সংগঠন থেকে বিদায় হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করা সহজ হয়—এটা সব ছাত্র সংগঠনেই দেখা যায়। বর্তমানের বিয়েগুলোও সেরকম বার্তা দিচ্ছে। সাদিক কায়েম, ফরহাদ কিংবা মাজহাররা এখন পাবলিক ফিগার। তাই তাদেরকে দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা হচ্ছে।

ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকাকালীন এই শীর্ষ নেতাদের বিয়ে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা সমীকরণ মেলানো হচ্ছে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ একে ছাত্ররাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক একজন সভাপতি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘একটা সময় শিবির নেতাদের বিয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা কড়াকড়ি থাকলেও এখন অনেকটা শিথিল। ছাত্র অবস্থায় বিয়ে করলে ছাত্র সংগঠন থেকে বিদায় হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করা সহজ হয়—এটা সব ছাত্র সংগঠনেই দেখা যায়। বর্তমানের বিয়েগুলোও সেরকম বার্তা দিচ্ছে। সাদিক কায়েম, ফরহাদ কিংবা মাজহাররা এখন পাবলিক ফিগার। তাই তাদেরকে দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা হচ্ছে।’

jagonews24মেয়র প্রার্থী হওয়া নিয়ে আলোচনায় আছেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম-ছবি সংগৃহীত

তিনি আরও যোগ করেন, তারা ছাত্রশিবিরে দীর্ঘ সময় থাকবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়, সামনে হয়তো তারা সরাসরি জামায়াতে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবেন।

ছাত্রশিবিরের ঢাকা কলেজ শাখার সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মারুফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের আশপাশের অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীও এখন স্টুডেন্ট লাইফে বিয়ে করে নিচ্ছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে ইসলামিক স্কলারদের ধারাবাহিক লেকচারগুলোর একটা ইতিবাচক প্রভাব এটি। আর ছাত্রসংসদের নেতাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা হচ্ছে, তারা লাইমলাইটে থাকায় তাদের ব্যাপারে পারিবারিকভাবে আগ্রহও বেশি থাকে।’

শিবিরের সাবেক নেতারা বলছেন, অতীতে সভাপতি-সেক্রেটারি, জেলা বা থানা সভাপতির মতো দায়িত্বশীল পদে থাকা অবস্থায় বিয়ের চল কম ছিল। বেশিরভাগই বিদায় নেওয়ার পর বিয়ে করতেন। তবে প্রয়োজন হলে সংগঠনের অনুমতি নেওয়ার সুযোগ ছিল। চরিত্র হেফাজত ও ব্যক্তিগত জীবনের তাগিদ থেকেই মূলত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া অতীতে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বা পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির ঘটনা ঘটতো। এখন সংগঠন প্রকাশ্যে কাজ করায় বিষয়গুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। তাছাড়া, আগে অনেকে ছাত্রজীবন শেষে ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে পাত্রী পেতে সংকটে পড়তেন, তাই এখন অনেকে আগেই বিয়ে করে এরপর ক্যারিয়ার গড়তে চাইছেন।

 

ছাত্রশিবিরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থ সম্পাদক সৌরভ আমান বলেন, ‘যেহেতু তারা আলোচিত মুখ, তাই ছাত্রসংসদের নেতৃত্বে আসার পর তারা হয়তো কেন্দ্রীয় শিবিরের বড় দায়িত্বে নাও আসতে পারেন। বিয়ে করে দ্রুত ছাত্ররাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে জামায়াতে যোগ দেওয়া এবং সামনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটি প্রক্রিয়াও এটি হতে পারে।’

jagonews24জাকসু জিএস মাজহারুল ইসলামের বিয়েতে সাদিক কায়েম

বিয়ের নিয়মে যেভাবে এলো শিথিলতা

শিবিরের ভেতরের সূত্রগুলো জানায়, আগে শিবিরের সাথী, সদস্য বা বড় দায়িত্বশীলদের বিয়ের জন্য সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির একটা রেওয়াজ ছিল। সংগঠন তখন ব্যক্তির পারিবারিক জীবন, চাকরি, বয়স ও যৌক্তিকতা বিবেচনা করে অনুমতি দিত। তবে করোনা মহামারির সময় থেকে জামায়াত আমিরের নির্দেশনায় এই নিয়মে বড় ধরনের শিথিলতা আসে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিবেচনায় বড় দায়িত্বশীলদের ক্ষেত্রে দ্রুত বিয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে শিবিরের কেন্দ্রীয় অনেক নেতাই এখন বিবাহিত।

তবে এই আলোচনাকে রাজনৈতিক রূপ দিতে নারাজ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক মোবারক হোসাইন। তিনি বলেন, ‘এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই। শিবিরে ছাত্রজীবনে বিয়ে করার ঘটনা আগেও ছিল। এটাকে নতুন কোনো ট্রেন্ড বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’

ডাকসুর ভিপি বা জিএসের মতো পদে থাকা ব্যক্তিদের মানুষ বেশি চেনে, তাই আলোচনাও বেশি। শিবির থেকে বিদায় নিয়ে জামায়াতে যুক্ত হওয়ার একটা দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া আছে, তবে বিয়েকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এটা সম্পূর্ণ যার যার ব্যক্তিগত বিষয়।

বিশেষ অনুমতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টিকে অনেক সময় বাড়িয়ে বলা হয়। উপরের পর্যায়ের কেউ বিয়ে করলে সংগঠনকে জানাতো, তবে এটাকে কড়াকড়ি নিয়ম বলা ঠিক হবে না। মূলত পরিবার ও অভিভাবকের সম্মতিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।’

jagonews24সাদিক কায়েমের বিয়েতে জামায়াত-শিবিরের শীর্ষ নেতারা

পাবলিক ফিগারদের বিয়ে নিয়ে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পরিচিত নেতাদের ব্যক্তিগত বিষয়ও বেশি সামনে আসে। ডাকসুর ভিপি বা জিএসের মতো পদে থাকা ব্যক্তিদের মানুষ বেশি চেনে, তাই আলোচনাও বেশি। শিবির থেকে বিদায় নিয়ে জামায়াতে যুক্ত হওয়ার একটা দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া আছে, তবে বিয়েকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এটা সম্পূর্ণ যার যার ব্যক্তিগত বিষয়।’

সদ্য বিয়ে করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের জিএস মাজহারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করাকে সংগঠন স্বাভাবিকভাবেই দেখে। ইসলামের রীতিনীতি অনুযায়ী যেভাবে বিয়ের বিষয়টি পরিচালিত হওয়া উচিত, সংগঠনও সেভাবেই দেখে। এক্ষেত্রে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের অবগত করা হয়। এর সঙ্গে জামায়াতে যোগ দেওয়া বা ভবিষ্যতের রাজনীতির খুব বেশি সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না। তবে ছাত্রশিবিরের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর চিন্তাগত মিল বেশি থাকায়, ছাত্রজীবন শেষে অনেকেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে জামায়াতে যোগ দেন।

অতীতে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বা পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির ঘটনা ঘটত। এখন সংগঠন প্রকাশ্যে কাজ করায় বিষয়গুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। তাছাড়া, আগে অনেকে ছাত্রজীবন শেষে ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে পাত্রী পেতে সংকটে পড়তেন, তাই এখন অনেকে আগেই বিয়ে করে এরপর ক্যারিয়ার গড়তে চাইছেন।

তিনি বলেন, বিয়ের পর অনেকের জন্য সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে, পরিবার সামলাতে গিয়ে কেউ কেউ হিমশিম খান। তবে এটি স্বাভাবিক বিষয়। আন্দোলনের প্রয়োজন অনুযায়ী তখন পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ে সংগঠনের কাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু নয়। বরং এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বিবাহিত কর্মীরাও পরিবার ও সংগঠন দুই দিকই সফলভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন।