মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট। কয়েক দিন ধরেই দরজাটা বন্ধ। কলিংবেল বাজিয়েও সাড়া মিলছিল না। ভেতর থেকে কোনো শব্দও আসছিল না। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাকর্মীরা পুলিশ ডাকল। দরজা ভাঙার পর যে দৃশ্য দেখা গেল, সেটি ছিল একসময়ের ভয়ংকর এক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের নিঃসঙ্গ সমাপ্তি। অর্ধগলিত মরদেহ পড়ে রয়েছে ঘরের ভেতরে।
একসময় যার নাম শুনে ঢাকার ব্যবসায়ীরা কেঁপে উঠতেন, সেই তানভীর ইসলাম জয় তখন মৃত। পরিচয়পত্রে অবশ্য লেখা ছিল, তারেক রানা, ভারতীয় নাগরিক। তারিখটা ২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল।
ঢাকার অপরাধ জগতের ইতিহাসে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ একসময় ছিল আতঙ্কের আরেক নাম। সেই গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য জয় ছিলেন অনেকটা মুকুটহীন সম্রাটের মতো। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ— একের পর এক অভিযোগে তখন তার নাম ঘুরত পুলিশের ফাইলে।
২০০৫ সালে বাংলাদেশের অনুরোধে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে ‘রেড কর্নার নোটিস’ জারি করে। এক বছর পর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার নাম প্রকাশ করে পুলিশ। তাকে ধরিয়ে দিতে ঘোষণা করা হয় ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার। ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে ‘সেভেন স্টার’ মানেই ছিল আতঙ্ক। কোন ব্যবসায়ী কত টাকা চাঁদা দেবেন, তাও ঠিক করে দিত এই গ্রুপ। টাকা না দিলে হামলা, গুলি, এমনকি খুনও ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ১৪ মে রাজধানীর পরীবাগে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘তুর্কি অ্যাসোসিয়েটস’-এর মালিকের কাছে ৮ লাখ মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করে জয়। টাকা না পেয়ে তার অস্ত্রধারীরা অফিসে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ওই ঘটনায় একজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়।
জয়ের বাহিনী শুধু চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা ভাড়াটে কিলার হিসেবেও কাজ করত। ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ফুলার রোডের বাসায় ঢুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আফতাব আহমেদকে গুলি করে জয়ের পাঠানো অস্ত্রধারীরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। অভিযোগ ছিল, মোটা অঙ্কের চুক্তিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।
এমন বহু আলোচিত অপরাধের নেপথ্যে উচ্চারিত হয়েছে জয়ের নাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, একের পর এক অভিযান চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো তার নাগাল পায়নি। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালে কলকাতায় ধরা পড়েন জয়। বাগুইআটির চিনার পার্ক এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি। তবে সেখানে তিনি জয় নন, ‘তারেক রানা’। জাল নথি ব্যবহার করে ভারতীয় পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স— সবই বানিয়ে ফেলেছিলেন। এমনকি খুলেছিলেন ব্যবসাও।
কলকাতার অভিজাত মহলে তার পরিচয় ছিল ‘জি ফ্যাশন’ নামের পোশাক প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে। এ প্রতিবেদক তার প্রমাণ পেয়েছিলেন ঢাকার ধানমন্ডিতে একটি বিউটি পার্লারের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে। জয়ের স্ত্রীর মালিকানাধীন বো-মন্ড নামক পার্লারটির ফিতা কাটতে জয় বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন টলিউডের বিখ্যাত নায়িকা দেবশ্রী রায় ও নায়ক যিশু সেনকে। ঢাকায় যখন এ আয়োজন চলে, তখনো জয়ের বিরুদ্ধে কলকাতার সিআইডির করা পাঁচটি আলাদা মামলা ছিল।
সে সময় পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির ডিআইজি (অপারেশনস) ছিলেন রাজীব কুমার। তার নেতৃত্বেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জয়। বাংলাদেশও তাকে ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল ভারতকে। কিন্তু দুই দেশের যোগাযোগের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে যান তিনি। তারপর হঠাৎ উধাও। কলকাতার স্থানীয়দের বিস্ময় ছিল অন্য জায়গায়। ব্যারাকপুর, কসবা, দমদম, তিলজলা ও কাঁকসা থানায় মামলা থাকার পরও কীভাবে জামিন পেলেন? আর জামিন পেয়ে কীভাবেই বা দেশ ছাড়লেন?
জয়ের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য, ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করেই পরে তিনি কানাডায় পাড়ি জমান। ২০১১ সালে পর্যটক ভিসায় কানাডায় গিয়ে ধীরে ধীরে বদলে ফেলেন নিজের জীবন। ২০১৪ সালে পান ১০ বছরের ভিসা। জয় তখন পুরোপুরি তারেক রানা।
সুদর্শন, স্মার্ট এবং ইংরেজি, হিন্দি ও স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ জয় খুব দ্রুত টরন্টোর শহরতলি আয়াক্সে প্রভাবশালী মহলে জায়গা করে নেন। সেখানে ‘এসজে ৭১’ নামে বড় একটি আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে নিয়মিত ওঠাবসা ছিল তার। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও দান করতেন মোটা অঙ্কের অর্থ। রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলেও দিতেন চাঁদা।
২০১৮ সালের ২ অক্টোবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে আয়াক্স সিটির তৎকালীন মেয়র শন কোলিয়ারের সঙ্গে তার ছবিও ছাপা হয়েছিল। প্রতিবেদনে তাকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কারণ, তিনি কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন, বিনিয়োগ এনেছেন।
কিন্তু অতীত শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দেয়নি। ২০২২ সালের দিকে বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা কানাডা সরকারের কাছে তার আসল পরিচয় ও অপরাধ জগতের তথ্য পাঠায়। এরপর কানাডার অভিবাসন বিভাগ কয়েকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে বিপুল সম্পদ ফেলে কানাডা ছাড়েন জয়। তারপর শুরু হয় আরেক দৌড়। কখনো ব্যাংকক, কখনো অস্ট্রেলিয়া, কখনো মালয়েশিয়া।
এ সময় তিনি রাজনীতিতেও আসার চেষ্টা করেছিলেন। প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ‘নতুন বাংলাদেশ পরিষদ’ নামের একটি দলের ব্যানারে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে অর্থসহায়তা ও কর্মী সরবরাহ করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে একসময় আর্থিক সংকটে পড়েন। এর মধ্যেই শরীরে বাসা বাঁধে কিডনির জটিলতা। প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করাতে হতো তাকে। ব্যয়বহুল সে চিকিৎসার খরচ টানতেই হিমশিম খেতে থাকেন একসময়ের ভয়ংকর এই ডন।
২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল কুয়ালালামপুরের সেই অ্যাপার্টমেন্টে নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সবচেয়ে করুণ বিষয় ছিল, তিনি সেখানে ভারতীয় নাগরিক ‘তারেক রানা’ পরিচয়ে বসবাস করছিলেন। ফলে আইনি জটিলতায় পরিবারের কেউ মরদেহ গ্রহণ করতে পারেননি। পরে কুয়ালালামপুরেই তার দাফন সম্পন্ন হয়।
১৯৬৭ সালে ঢাকার এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া জয় অপরাধ জগতে ভয়ংকর নাম হয়ে ওঠেন ২০০৫ সালের দিকে। ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন থেকে কলকাতার অভিজাতপাড়ার বাসিন্দা, সেখান থেকে কানাডার উদ্যোক্তা— তার জীবন যেন ছিল একের পর এক ছদ্মবেশের গল্প।
মৃত্যুর দুই মাস আগে কুয়ালালামপুরে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে তিনি দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতার পালাবদল হলে আবার ফিরবেন বাংলাদেশে।
কিন্তু ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে যে ‘ম্যাজিক’ দেখিয়ে তিনি ভয়ংকর ডনে পরিণত হয়েছিলেন; কিংবা কানাডায় যে কৌশলে নিজেকে উদ্যোক্তা বানিয়েছিলেন, রাজনীতিতে ফিরে সে ম্যাজিক আর দেখানো হয়নি তার। নিঃসঙ্গ এক কক্ষে শেষ হয়ে যায় তানভীর ইসলাম জয় ওরফে তারেক রানার বিচিত্র জীবনগাথা।
জয়ের বিরুদ্ধে যত মামলা
* রাজধানীর পরীবাগে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তুর্কি অ্যাসোসিয়েটসে হত্যা মামলা
* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আফতাব আহমেদ হত্যা মামলা
* বনানীতে ভারতীয় চাল ব্যবসায়ী হত্যা মামলা
এ ছাড়া জয়ের বিরুদ্ধে দুটি হত্যাচেষ্টা, ভয়ংকর অস্ত্র দিয়ে মারাত্মক জখম এবং চাঁদার জন্য শারীরিক ক্ষতির হুমকি দেওয়ার অনেক অভিযোগ ছিল
কলকাতায়ও জয়ের বিরুদ্ধে মামলা ছিল অন্তত পাঁচটি
* ব্যারাকপুর থানায় হত্যা, ষড়যন্ত্র ও অস্ত্র আইনে মামলা। মামলা নম্বর ৮৫
* দমদম থানায় ডাকাতিচেষ্টার মামলা নম্বর ৪৯
* কসবা থানায় জালিয়াতি ও অস্ত্র আইনের মামলা নম্বর ২১৮
* তিলজলা থানায় ডাকাতিচেষ্টার অভিযোগে করা মামলা নম্বর ১৮৪
* কাঁকসা থানায় জালিয়াতি, প্রতারণা এবং চোরাই মাল কেনাবেচার অভিযোগে করা মামলা নম্বর ১৬৩