Image description

জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) অনেকেই নাম লেখাচ্ছেন। যোগদানের হিড়িক পড়েছে বলা চলে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকে গণহারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বে আসায় আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। আগতদের বিশদ জানতে বাছাই কমিটিও করেছে এনসিপি।

বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নেতাকর্মীর বিষয়ে ওইসব দলের ভাষ্য, এনসিপি অনেকের আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে কোণঠাসা ও বিতর্কিত নেতাকর্মীরা নিরাপত্তার জন্য যুক্ত হচ্ছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আমলে দলটির অত্যাচার-নির্যাতন থেকে সুরক্ষা এবং নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য জাতীয় পার্টি ছিল অনেকের আশ্রয়স্থল। এখন জুলাই আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে এনসিপিকে একটি মহল বেছে নিচ্ছে। তারা ধরেই নিয়েছে, এখানে থাকলে ক্ষমতাসীনরা পর্যন্ত তাদের ঘাটাবে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যোগদানের হিড়িকে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি পোক্ত হচ্ছে কিনা, এখনই বলা কঠিন। তবে অনেকে ক্ষেত্রে এটিকে অন্যান্য দলের বঞ্চিত ও কোণঠাসা নেতাকর্মীর সাময়িক রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল মনে হচ্ছে। কারণ, এখন পর্যন্ত এমন কোনো রাজনৈতিক চরিত্র এনসিপিতে আসেনি, যাতে দলটির ভোট ব্যাংক বেড়েছে বলা যাবে।

হতাশা মুছতে যোগদান

এনসিপির একাংশের নেতারা জানিয়েছেন, ‘ওপেন প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে তারা সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছেন। কৌশলেরই অংশ, ছোট-বড় রাজনৈতিক দল, ছাত্র রাজনীতি ও পেশাজীবী সংগঠন থেকে দলের জনবল ভারী করা। বিএনপি গণভোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করায় হতাশা তৈরি হয়েছে। সেই হতাশা থেকে অনেকে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপিতে ঝুঁকছেন বলে মনে করেন তারা।

এনসিপির আরেক অংশের ভাষ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কাঠামোয় নতুনরা যুক্ত হতে অস্বস্তিবোধ করেন। সেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করাও কঠিন। বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থীদের অনেকে এনসিপিকে বেছে নিচ্ছেন।

এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিজেদের এককভাবে ক্ষমতার বিকল্প শক্তি মনে করছেন না। তবে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক বিস্তার ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ‘তৃতীয় শক্তি’ এবং এককভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে চান তারা।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, অনেকেই যোগ দিয়েছেন, আগামীতে আরও নতুন মুখ দেখা যাবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নতুনদের নিয়ে আমরা শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলব। দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করব।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশেষ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করায় মানুষ নিজেকে প্রতারিত মনে করছেন। জামায়াতের রাজনৈতিক কাঠামোয় নতুন কারও পক্ষে সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়। সবদিক বিবেচনায় ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভরসা হয়ে উঠছে এনসিপি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমাদের সদস্যদের ক্ষুরধার যুক্তি-তর্ক নতুন আশা জাগিয়েছে।

গতানুগতিক হলে বাড়বে না ভোট ব্যাংক

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি বড় বাস্তবতা। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মতো তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন এখনো গড়ে তুলতে পারেনি এনসিপি। ফলে নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাংগঠনিক সক্ষমতা তৈরিতে বহুপথ পাড়ি দিতে হবে। যোগদানের বিষয়ে সতর্ক না হলে ভেঙে পড়তে পারে কাঠামো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের শক্তির প্রতি মানুষের আলাদা আগ্রহ রয়েছে– এটি যেমন সত্য, তেমনি সুবিধাবাদীরা দলটিকে সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়স্থল বিবেচনা করছেন। অতীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে কিংবা নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে জাতীয় পার্টিকে অনেকে বেছে নিতেন। এখনো তাই ঘটছে। জুলাই আন্দোলনের দল হিসেবে এনসিপিকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ভাবছেন। দলের ভোট ব্যাংক বড় হচ্ছে না। এই গোষ্ঠী পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত এনসিপিতে আসাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিচিত মুখ হলেও, তারা বড় ভোট ব্যাংকের প্রতিনিধি নন। আগামী নির্বাচন অনেক দূরে। যোগদানকে নির্বাচনী সমীকরণের নির্ধারক দেখার সুযোগ নেই। সংসদে সীমিতসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে এনসিপি নিজেদের লম্বা রেসের ‘তৃতীয় শক্তি’ হওয়ার ভিত্তি তৈরি করছে।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, এনসিপির প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো প্রবল। দলটিকে হেয় করার জন্য নানা কথা বলা হয়েছে, যার কিছুটা সত্যতাও রয়েছে। তারপরও আমার মনে হয়, নাহিদ ইসলামদের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। বিশেষ করে সংসদে দলটির সদস্যদের সোচ্চার ভূমিকা মানুষের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে।

তিনি পরামর্শ দেন, দলে নতুন সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যাকে-তাকে জায়গা দিলে আখেরে ক্ষতি হবে। এনসিপি আরেকটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হলে মানুষের যে আস্থা, তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বাচন অনেক দূরে থাকলেও এখন কেন মানুষ এনসিপিতে যোগ দিচ্ছে– অনেকেই এই প্রশ্ন করছেন। এনসিপির প্রতি মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অগাধ প্রত্যাশা ছিল। নানা কারণে তাতে চিড় ধরলেও, শেষ হয়ে যায়নি। জাতীয় রাজনীতিতে এই যোগদান তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে নির্বাচনের পরেও দলটির প্রতি আগ্রহ কিছুটা আশ্চর্যের।

এ ব্যাপারে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, সংসদ নির্বাচনে দলীয় ফলাফল দেখে মানুষ এনসিপির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হচ্ছে। মানুষের ভেতরে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা, তা এনসিপির মাধ্যমে অর্জনের সম্ভাবনা থেকে অনেকে যুক্ত হচ্ছেন। আগামী নির্বাচনের বাকি পাঁচ বছর, দীর্ঘ সময়। এখন আমাদের লক্ষ্য পরিসর বাড়িয়ে সারা দেশে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করা।