Image description

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নদীভাঙন প্রতিরোধ ও বাঁধ সুরক্ষা প্রকল্পের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এতে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। তবে এই কাজে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াত নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

 

এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার মেলেনি। অবশেষে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে পাউবো। এতে অবিলম্বে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযুক্ত জামায়াত নেতা নজরুল ইসলাম শ্যামনগর উপজেলার ৯ নম্বর বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

 

গত ১৩ মে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর পাঠানো অভিযোগপত্রে পাউবোর ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ প্রকল্প (কম্পোনেন্ট-১, বাপাউবো অংশ)’-এর প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, শ্যামনগরের খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা এবং বাঁধ সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখন কার্যত হুমকির মুখে।

 

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডিএল-উন্নয়ন (জেভি) এবং ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে আর-রাদ করপোরেশন। পোল্ডার-৫ এলাকার পূর্ব দুর্গাবাটি, পশ্চিম দুর্গাবাটি, দাতিনাখালী ও ঝাপালিতে তীররক্ষা, স্লোপ প্রোটেকশন, জিওব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

 

অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রকল্পের শুরু থেকেই চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম কাজটি বন্ধ করতে নানা চাপ সৃষ্টি করেন। প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দায়িত্বরত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, শ্রমিকদের ভয় দেখানো এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়।

 

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর তিনি সরাসরি প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে প্রকল্প অফিসে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, জেলা প্রশাসন ও শ্যামনগর থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করা হলেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

১২ লাখ টাকা চাাঁদা দাবি

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া, মানববন্ধন করা এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর হুমকি দেওয়া হয়।

 

তিনি বলেন, ‘চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকদের কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সাব-ঠিকাদারদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প এখন ঝুঁকিতে।’

 

প্রকল্পের কর্মীদের মারধরের হুমকি

গত ১৪ এপ্রিল পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায় প্রকল্প সাইটে গিয়ে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, স্থানীয় কয়েকজন জামায়াত নেতাকর্মী এবং বহিরাগত লোকজন মানববন্ধনের নামে বিক্ষোভ করেন। এ সময় কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। স্কেভেটরের চালক ও সহকারীকে যন্ত্রের ভেতরে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে উপস্থিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

 

pawbo

পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভিযোগপত্র। ছবি : সংগৃহীত

 

 

ওই ঘটনার পর থেকে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তাহীনতায় অধিকাংশ শ্রমিক কাজ ছেড়ে চলে যান। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে যায়।

 

একই দিন শ্যামনগর থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগে আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন জানান, সিসি ব্লক তৈরির স্থানে ও সরকারি জমিতে কাজ চলাকালে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম লোকজন নিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন। পরদিন ৩০ থেকে ৪০ জন লোক নিয়ে গিয়ে নির্মাণাধীন বাঁধ ভেঙে ফেলা হয়, যাতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তখন শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বর্ষার আগে কাজ না হলে বিপর্যয়ের শঙ্কা

প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া তার অভিযোগে বলেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শেষ করা না গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে জনবসতি, কৃষিজমি ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকিতে পড়বে। প্রকল্পটি জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হওয়ায় সময়মতো কাজ শেষ না হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষার আগে বাঁধের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে ঝুঁকি নিয়ে সীমিত পরিসরে জিও ব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক তৈরির কাজ চালু রাখা হয়।

 

অভিযোগ অস্বীকার জামায়াত নেতার

নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জামায়াত নেতা মো. নজরুল ইসলাম। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি সামাজিক বনায়নের জায়গায় অবৈধভাবে ব্লক নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আমি বাধা দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তার দাব, জমি সংক্রান্ত পূর্বের বিরোধের জের ধরে তাকে হয়রানির চেষ্টা চলছে।

 

প্রশাসনের বক্তব্য

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম রাজু আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নতুন পুলিশ সুপার যোগদান করেছেন। বিষয়টি আমরা এখনো অবগত নই। সরকারি কাজ বাস্তবায়নে জেলা পুলিশ সহযোগিতা করবে।’

 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। তবে এখনো অভিযোগ অফিশিয়ালি পাইনি। পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

 

এ অবস্থায় প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।