সম্প্রতি চীন সফর শেষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এবার সফরসঙ্গী ছিল ইলন মাস্কের মতো মার্কিন ধনকুবেররা। বাণিজ্যিক স্বার্থ গুরুত্ব পেলেও কার্যত বিনিয়োগসংক্রান্ত কোনো চুক্তি হয়নি।
তেল আর বোয়িং কেনাবেচা ছাড়া এই সফরের কোনো সার্থকতা দেখছেন না বিশ্লেকেরা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেও কৌশলগত তাইওয়ান ইস্যুতে নীরব থাকতে দেখা গেছে ট্রাম্পকে। তবুও বেইজিং সফরকে ‘সফল’ বলতে চাইছে তার প্রশাসন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে বৈরী সম্পর্ক ওয়াশিংটনের। প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক সফর শেষ হতেই চীনকে প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষিত ঘাঁটি স্থাপনের খরব প্রকাশ্যে এলো। চীনের গুপ্তচরবৃত্তি থেকে উন্নত প্রযুক্তিকে রক্ষা করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রতিযোগিতায় আমেরিকার আধিপত্য সুসংহত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে হোয়াইট হাউস।
আর এ জন্য ঘনিষ্ট মিত্র ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে একটি সুরক্ষিত এআই ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে তারা। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ কথা লিখেছেন হাডসন ইনস্টিটিউটের মাইকেল ডোরান ও জিনেব রিবুয়া।
হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ডোরান ও ওয়াশিংটনভিত্তিক একই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের রিসার্চ ফেলো রিবুয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা একটি যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছেন। উদ্যোগটি ইসরায়েলে ‘প্রজেক্ট স্পায়ার’ নামে পরিচিত। প্রস্তাবিত এই স্থাপনাটি একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা মানের সঙ্গে একটি প্রধান প্রযুক্তি কেন্দ্রের গবেষণা ও প্রকৌশল সংস্কৃতিকে একত্রিত করবে।
নিবন্ধে বর্ণিত পরিকল্পনাটি পশ্চিম নেগেভে ইসরায়েলের প্রস্তাবিত তিনটি স্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। জানা গেছে, ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে মার্কিনিদের ব্যবহারের জন্য জমি সরবরাহ করবে। এই স্থাপনাটি গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রধান সার্ভার পরিকাঠামো, বিশেষায়িত শক্তি ব্যবস্থা, চিপ ডিজাইন, এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য ডিজাইন করা হবে। এই প্রকল্পের পেছনের কৌশলগত যুক্তি কেবল আরেকটি প্রযুক্তি ক্যাম্পাস তৈরি করা নয়।
ডোরান ও রিবোয়া যুক্তি দিয়েছেন, ওয়াশিংটন-বেইজিং প্রতিযোগিতার পরবর্তী পর্যায়ে এমন সুরক্ষিত অঞ্চলের প্রয়োজন হবে, যেখানে বিশ্বস্ত মিত্ররা সংবেদনশীল প্রযুক্তিকে চুরির ঝুঁকিতে না ফেলে এআই নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। তাদের মতে, ‘প্রজেক্ট স্পায়ার’ হবে সুরক্ষিত এআই ঘাঁটিগুলোর একটি নেটওয়ার্কের প্রথম কেন্দ্র, যা মার্কিন কোম্পানি ও মিত্র গবেষকদের কঠোর মানদণ্ডে পরিচালিত সুরক্ষিত বেষ্টনীর মধ্যে থেকে সহযোগিতার সুযোগ দেবে।
ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ট্রাম্প প্রশাসনের ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগের অংশ হতে পারে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তির অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা।
লেখকরা আরও উল্লেখ করেছেন, ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি জেরুজালেমে মার্কিন পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী জ্যঅকব হেলবার্গ ও ইসরায়েলের জাতীয় এআই অধিদপ্তরের প্রধান এরেজ আসকাল যে ঘোষণাপত্রে সই করেছিলেন, সেটিই এই উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে।
গবেষকদের যুক্তি হলো, সাইবার, গোয়েন্দা, সামরিক প্রযুক্তি, চিপ আর্কিটেকচার এবং ফলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতার কেন্দ্রীভূত অবস্থানের কারণে এই ধরনের প্রথম ঘাঁটির জন্য ইসরায়েল অসাধারণ স্থান।
তারা আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলে এনভিডিয়া, ইন্টেল, গুগল ও মাইক্রোসফ্টসহ প্রধান মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, দেশটি ইতোমধ্যেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের গভীরে অবস্থান করছে।
তাদের মতে, নেগেভ অঞ্চল কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেবে। কারণ সেখানে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উন্নত শিল্প সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। এর মধ্যে ইন্টেলের কিরিয়াত গেটের দীর্ঘদিনের উৎপাদন কার্যক্রমও আছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন এআই ঘাঁটিটি সেই বিদ্যমান ভিত্তির ওপর গড়ে উঠবে। তবে এটি আরও সংবেদনশীল খাতে কাজ করবে, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং শক্তি, জ্বালানি সক্ষমতা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং উন্নত চিপ প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ডোরান ও রিবোয়া এই প্রকল্পটিকে উভয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তারা লিখেছেন, কেন্দ্রে বিকশিত প্রযুক্তিগুলো মার্কিন মালিকানাধীন থাকবে। তবে একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এর উৎপাদন ও সম্প্রসারণের সুযোগও থাকবে। এই কাঠামোটি দুই দেশে উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান তৈরি করবে। আমেরিকান সংস্থাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ এআই সিস্টেমের ওপর নেতৃত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
এই প্রস্তাবটি বিদ্যমান সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও তৈরি করা হয়েছে। তাইওয়ান বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও চীনের ভূরাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন। যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতসহ অন্যান্য মিত্রদের প্রত্যেকেরই বড় শক্তি রয়েছে। কিন্তু লেখকদের যুক্তি হলো, ইসরায়েল আভিযানিক গতি, প্রযুক্তিগত গভীরতা, যুদ্ধক্ষেত্র-চালিত উদ্ভাবন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আস্থার এক বিরল সমন্বয় প্রদান করে।
প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে ‘প্রজেক্ট স্পায়ার’ অন্যান্য মিত্র দেশগুলোতে একই ধরনের সুরক্ষিত এআই কেন্দ্রগুলোর জন্য মডেল হয়ে উঠতে পারে। এর মূল ধারণাটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা থেকে সরে আসবে না। বরং এটিকে এমন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিয়ে যাবে যেখানে মেধাস্বত্ব, সামরিক প্রয়োগ এবং সংবেদনশীল অবকাঠামো আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত থাকবে।