Image description

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সময়ে সময়ে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু ঘটনাই নয়, একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত হয়ে ওঠে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তেমনই এক সকাল দেখেছিল রাজধানী ঢাকা। সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেট দিয়ে বের হলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু দৃশ্যটি ছিল প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতির চেনা ছবির সম্পূর্ণ বিপরীত। ছিল না দীর্ঘ গাড়িবহর, সাইরেন কিংবা কড়া নিরাপত্তার বলয়। তিনি হেঁটেই রওনা দিলেন ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের উদ্দেশে, যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে সচিবালয়ের ১ নম্বর গেট দিয়ে আবারও হেঁটেই ফিরে যান কার্যালয়ে।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে এমন দৃশ্য কৌতূহল জাগায় সাধারণ মানুষের মধ্যে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ কেউ মোবাইল ফোনে মুহূর্তটি ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রীও থেমে থেমে হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন, হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সচিবালয় থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও অতীতে কোনো সরকারপ্রধানকে এভাবে হাঁটতে দেখা যায়নি। ফলে ঘটনাটি শুধু ব্যতিক্রম হিসেবেই নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার আচরণগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও আলোচনায় আসে।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অনেক সরকারপ্রধানের মধ্যেই এমন আচরণ দেখা যায়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নিউজিল্যান্ড, নর্ডিক দেশ কিংবা ইউরোপের অনেক নেতাকে প্রায়ই দেখা যায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে, নির্ধারিত প্রটোকলের বাইরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে। তারা ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলেন, ছোট ছোট কফি শপে বসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, হঠাৎ করেই কোনো স্কুল বা কৃষকের মাঠে গিয়ে হাজির হন। রাজনৈতিক শিষ্টাচার, নাগরিক স্বস্তি এবং ক্ষমতার বিনয়ী ব্যবহারকে তারা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তারেক রহমানের সাম্প্রতিক আচরণ ও কর্মকাণ্ডে অনেকেই সে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখতে শুরু করেছেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তারেক রহমান নিজেকে উপস্থাপন করছেন এক ভিন্নধর্মী সরকারপ্রধান হিসেবে। তার চলাফেরা, জনসম্পৃক্ততা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে সক্রিয় উপস্থিতি— সবকিছুতেই রয়েছে এক ধরনের সংযমী ও সাদামাটা বৈশিষ্ট্য। নিয়মিত সময়মতো অফিসে উপস্থিত হওয়া, নির্ধারিত বৈঠক ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, এমনকি প্রয়োজন হলে ছুটির দিন শনিবারও সচিবালয়ে সময় কাটানো— এসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো প্রশাসন ব্যবস্থায়। কোনো বিশেষ নির্দেশনা ছাড়াই এখন দেশের সরকারি অফিসগুলো সকাল ৯টার মধ্যেই সরগরম হয়ে ওঠে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদচারণায়। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ধীর হয়ে পড়া প্রশাসন আবারও গতি ফিরে পেতে শুরু করেছে।

সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে তার চলাচলের ধরনে। রাজধানীবাসী এখন আর দেখেন না রাস্তা ফাঁকা করে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলা প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। সড়কের দুই পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের দৃশ্যও অনেকটাই কমে গেছে। কোনো কোনো সময় ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি জ্বললে থেমে যাচ্ছে সরকারপ্রধানের গাড়ি। সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতেই তিনি নিজের চলাচলকে সাধারণ নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। এ আচরণ নাগরিক জীবনে তৈরি করেছে এক ধরনের স্বস্তির অনুভূতি।

শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রেও নতুন ধারা তৈরি করছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, শিশুদের সঙ্গে স্কুলের বেঞ্চে বসে কথা বলছেন তিনি, তাদের আঁকা ছবি দেখছেন, পড়াশোনার খোঁজ নিচ্ছেন। প্রটোকল ভেঙে কৃষককে পাশে বসিয়ে শুনছেন কথা। প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের সৃজনশীল কাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের প্রশংসা করে তাদের উৎসাহিত করছেন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো নতুন উপায়ে তিনি চেষ্টা করছেন জনসম্পৃক্ততার বার্তা দেওয়ার।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সৌজন্যের ক্ষেত্রেও নতুন এক বার্তা দেন তারেক রহমান। জয়লাভের পর বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের বাসায় গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সৌজন্যমূলক আচরণ দীর্ঘদিন ধরেই বিরল ছিল। শুধু তাই নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপচারিতাও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু আচরণগত পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তারেক রহমান। ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে নিত্যপণ্য সহনীয় মূল্যে সরবরাহের লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগকে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার নতুন মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে কৃষকদের জন্য চালু করা ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে সার, বীজ, কৃষিঋণ ও ভর্তুকি কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, জনদুর্ভোগ কমানো এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বার্তা দিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর সীমিত করা এবং প্রশাসনে জবাবদিহি বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তগুলোও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সংকটকালে দিকনির্দেশনার প্রতীক

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে কিছু নেতা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তারা শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, বরং সংকটকালে দিকনির্দেশনারও প্রতীক। তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রাও অনেকের কাছে এখন তেমন এক অধ্যায়ের নাম।

তবে তার রাজনৈতিক পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। এক-এগারোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে কারাবরণ করতে হয়। সেই সময়টি ছিল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন অধ্যায়। এরপর আসে ১৭ বছরের নির্বাসন। দেশের বাইরে থেকেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক কাঠামো ব্যবহার করে আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং দলকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান। এই দীর্ঘ সময় তাকে আরও ধৈর্যশীল, কৌশলী ও দূরদর্শী করে তুলেছে বলেই মনে করেন তার ঘনিষ্ঠরা।

পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার সেই প্রত্যাবর্তন ছিল শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার ফেরা নয়; বরং অনেকের কাছে তা ছিল একটি রাজনৈতিক ধারার পুনর্জাগরণ। দেশে ফেরার অল্প সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপির বিজয় সেই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তারেক রহমান দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করেন। প্রথম ৬০ দিনে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি সরকারের ভেতর থেকেই তুলে ধরা হয়। তার নেতৃত্বের আরেকটি বিশেষ দিক হলো ভাষার সংযম ও সহজ উপস্থাপন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন দৃঢ়ভাবে, কিন্তু তা প্রকাশ করেন কোমল ভঙ্গিতে। তার কথাবার্তায় নেই অহংকারের আড়ম্বর; বরং আছে সহজাত আন্তরিকতা।

‘দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের পর্যবেক্ষণ, ‘তারেক রহমান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকেও তার চলাফেরা, কথাবার্তা ও জীবনযাপনে যে স্বাভাবিকতা ও সংযম দেখা যায়, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল।’

তার ভাষায়, ‘একসময় দেশের মানুষ ভাবত প্রধানমন্ত্রী মানেই দূরের কেউ। অপ্রাপ্য, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এক ক্ষমতার প্রতীক। কিন্তু সেই চিরাচরিত ধারণা ভেঙে দিয়ে তারেক রহমান নিজেকে সাধারণ মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছেন। মানুষের সমস্যা, কষ্ট ও বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার মধ্য দিয়েই তিনি গড়ে তুলতে চাইছেন নতুন ধরনের নেতৃত্বের ধারণা।’

‘প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ইতিবাচক’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান ইদানীং অনেক ভালো কাজ করেছেন। সম্প্রতি তিনি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করে দিয়েছেন। তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনেক জায়গায় যাচ্ছেন অর্থাৎ মানুষের মধ্যে থাকার চেষ্টা করছেন। অবশ্য তারেক রহমানের সবসময় তৃণমূলের সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল। লন্ডনে থাকাকালেও তিনি তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে ছিলেন। তৃণমূলে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়।’

‘বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুব ভালো। তিনি জামায়াতের ইফতার পার্টিতে গিয়েছিলেন। এগুলো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে তিনি একটা পজিটিভ ইমেজ তৈরি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখি’— যোগ করেন তিনি।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষ্য, ‘রাজনীতি মানেই সহনশীলতা। একে অন্যের সঙ্গে কো-অপারেশন, কম্প্রোমাইজ, ডায়ালগ হবে— এগুলো সুস্থ রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। আমরা বাংলাদেশে অনেক দিনই কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতি দেখিনি। আশা করছি, আমরা এবার সেদিকে যাত্রা করব।’