সাড়ে পাঁচ বছর কারাভোগের পর বহুল আলোচিত ‘শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে হামলা মামলা’ থেকে খালাস পেয়ে মুক্তি মিলেছিল। সেই মুক্তি আবার স্বস্তি বয়ে আনেনি। পাবনার ঈশ্বরদীতে মামলাটির অন্তত ১৫ জন বিএনপি নেতা এখন ক্যান্সার, কিডনি, লিভারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। অনেকেই অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। কেউ কেউ ওষুধ কেনার টাকাও জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারামুক্ত কয়েকজন মারা গেছেন।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘ কারাবাস, মামলা-হামলা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ভেঙে পড়েছে এসব পরিবারের জীবন। একসময় যাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, এখন তারা অনেকটাই উপেক্ষিত।
যে মামলায় দেশজুড়ে আলোচনা
১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ৩ জুলাই পাবনার আদালত ৪৭ জন বিএনপি নেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। এর মধ্যে ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ২৫ জনের যাবজ্জীবন এবং ১৩ জনের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। রায় ঘোষণার আগেই আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর উচ্চ আদালতে মামলাটি খারিজ হয়। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের আদেশে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ধাপে ধাপে মুক্তি পান এসব নেতা।
খোঁজ রাখতেন তারেক রহমান
কারাবন্দি অবস্থায়ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঈশ্বরদীর এসব নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের খোঁজ রাখতেন। সংসার চালাতে সহায়তা হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে ৩৩টি পরিবারকে ব্যাটারিচালিত অটো ইজিবাইক দেওয়া হয়েছিল। ওই ইজিবাইক চালিয়েই চলত অনেক পরিবারের সংসার। ঈদের সময় আর্থিক সহায়তাও পাঠানো হতো। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই সহায়তা পৌঁছে দিতেন–এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা। তবে কারাগার থেকে মুক্তির পর সেই সহায়তা আর আগের মতো নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
একে একে ঝরে পড়ছেন নেতারা
কারামুক্ত হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নেফাউর রহমান রাজু, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আখতারুজ্জামান আক্তার, আজাদ রহমান খোকন ও বিএনপি নেতা তাহাজুল ইসলাম লাইজু। রায়ের আগেই মারা যান জাবেদ করিম খোকন, আলমগীর হোসেন, ওসিয়া আহমেদ, এহতেশাম ও মো. তুহিন। কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান পাকশী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ এবং বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম টেনু।
মুক্তিপ্রাপ্ত ৪৭ নেতার মধ্যে অন্তত ১৫ জন গুরুতর অসুস্থ। তাদের মধ্যে আছেন সাবেক পৌর মেয়র মকলেছুর রহমান, বিএনপি নেতা মাহ্বুবুর রহমান পলাশ, উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম ভিপি শাহীন, ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আজিজুর রহমান শাহীন, শহীদুল ইসলাম অটল ও মোস্তফা নূরে আলম শ্যামল।
ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই
দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা আব্দুল জব্বার বলেন, ‘অপারেশন করার পর এখন ওষুধ কেনার মতো টাকাও নেই। অনেকের কাছে গিয়েছি, কিন্তু তেমন সহযোগিতা পাইনি।’ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী রয়েছেন বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার মুক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘১৮ বছর ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারিনি। এখনও ঈশ্বরদীর বড় বড় ব্যবসা কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে। আমরা যারা দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার, চিকিৎসার খরচও চালাতে পারছি না।’
ফাঁসির দণ্ড থেকে মুক্তি পাওয়া বিএনপি নেতা মাহ্বুবুর রহমান পলাশ বলেন, ‘কারাগার থেকে বের হওয়ার পর একটি কিডনি ফেলে দিতে হয়েছে। আমার ছোট ভাই শাহীন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসা নিচ্ছে। বড় ভাই সাবেক মেয়র বাবলুও নানা জটিল রোগে ভুগছেন।’
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত নেতাদের বিষয়ে তারেক রহমান অবগত আছেন। তাদের চিকিৎসা সহায়তার বিষয়ে সুপারিশ করা হবে।’