দল এবং সরকারে পদ-পদবি না পাওয়া বিএনপি’র ত্যাগী অনেক নেতা হতাশায় ভুগছেন। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া, দলীয় কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাদের কেউ কেউ রাজনীতি নিয়েও ভিন্ন চিন্তা করছেন। এ ছাড়া দল এবং সরকারের দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের সঙ্গে দূরত্বের কারণেও কেউ কেউ হতাশ। ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ প্রয়োজনের সময় এখন অনেককে পাওয়া যায় না।
তারা বলছেন, দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও সরকারে দায়িত্ব নেয়া নেতারা নিয়মিত নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ রাখলে, তাদের খোঁজখবর নিলে এই সমস্যা অনেকটা কেটে যাবে। এজন্য নেতা ও মন্ত্রীদের দলীয় কার্যালয়ে বসার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এমন দাবি থেকে মন্ত্রীদের দলীয় কার্যালয়ে বসার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই নির্দেশনা খুব একটা মানা হচ্ছে না। দলীয় কার্যালয়ে মন্ত্রীদের না পাওয়ায় অনেকে বিভিন্ন দাবি ও প্রয়োজন নিয়ে সচিবালয়ে ছুটছেন।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিনিয়তই যেভাবে ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দল সংকটে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে কেবল দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাই তৈরি হবে না, বরং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করার কারণে দলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি একটি বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনকে বলেন, আমি এবং জুনিয়র পর্যায়ের দুই-একজন ছাড়া অফিসে আর কেউ আসেন না। অসুস্থতা নিয়েও আমি অফিস নিয়মিত করছি। অথচ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আর কেউ আসেন না! এমনি যারা আসেন, তার মধ্যে তদবিরবাজরা ভিড় করছেন বেশি। ডেডিকেটেড নেতাকর্মীদের অফিসে কিছু কাজ থাকে, এটা তো দিনের বেলা-সেটা তো ন্যায় সংগত এবং আইনের মধ্যে হতেই পারে। কিন্তু যাদেরকে দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর দেখিনি, এই তদবিরবাজরা নানাভাবে ভিড় করছেন।
এদের থেকে মন্ত্রী, এমপি এবং দলের নেতাকর্মীসহ সবাইকে দূরে থাকতে হবে। সতেচন থাকতে হবে। দল এবং সরকারকে আলাদা রাখতে হবে। রুহুল কবির রিজভী বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা একেবারে হতাশ। তারা কিছু বলতেও পারেন না এবং সহ্য করতেও পারেন না।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছেন, অতীতে কাজের মূল্যায়ন হিসেবে দলের পক্ষ থেকে তাদের যেন স্মরণ করা হয়। মন্ত্রীদের কেউ কেউ ফোন ধরেন না। এটি তাদের কষ্ট দেয়।
ওদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিতদের অনেকেই উপজেলা নির্বাচন দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনোনয়ন পেলেও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে। সংরক্ষিত নারী আসনেও মনোনয়ন চেয়ে দলের অনেক ত্যাগী নারী নেত্রীও মনোনয়ন পাননি। তাদের মধ্যেও অনেকেই উপজেলা নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন। এক্ষেত্রেও স্থানীয় জনপ্রিয় ও ত্যাগীদের মূল্যায়নের কথা ভাবছে বিএনপি।
বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে যারা কাজ করেছেন, তাদেরকে দল বিবেচনা করবে। এলাকায় যাদের জনপ্রিয়তা আছে, তাদেরকেই মূল্যায়ন করা হবে। এর বাইরে কাউকে দেয়া হবে না। আর সংরক্ষিত নারী আসনে বঞ্চিত হওয়ার পরিমাণ কম হয়েছে, বরং রাজপথে যারা ছিলেন- তাদের মধ্যে অধিকাংশ মনোনয়ন পেয়েছেন। হয়তো কিছু এদিক সেদিক হয়েছে। শতাভাগ তো আর কখনো হয় না। অনেকাংশে সংগ্রামী নারী নেত্রীদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটা নিয়ে তৃণমূলের তেমন হতাশা নেই।
ওদিকে লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে স্থান না পাওয়া মো. জাহিদ ফেসুবক লাইভে এসে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। লাইভে তার কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। এবারো জেলা শাখার নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদের একটি পাবেন এমনটি প্রত্যাশা ছিল তার। তবে নতুন কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। গত শনিবার রাতে লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের ১৮ সদস্যের নতুন কমিটির অনুমোদন হয়।
কমিটি গঠনের পর নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে আসেন আগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. জাহিদ। তিনি দাবি করেন, দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পরও তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। নতুন কমিটিতে প্রকৃত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ফেসবুক লাইভে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ওদিকে সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে পরাজিত প্রার্থী ও যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। একজন মন্ত্রীর দুর্ব্যবহারের কারণে তিনি দল ছেড়েছেন বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন ইসহাক সরকার। মন্ত্রীর নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, আত্মসম্মানবোধ তো আমাদের অনেক বেশি। আমরা আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছি। এখন আমাদের সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করা হয়, এতে আমাদের আত্মসম্মানবোধে লাগে। আমরা দল করি এবং দলের আদর্শকে লালন করি। এখন কেউ যদি আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং আমাদের অবহেলা করেন- তখন সেটা আমরা মেনে নিতে পারি না। সেটা থেকেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর আমি দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ সেভাবে রেন্সপন্স করেননি।
ওদিকে তৃণমূলের আরও বেশ কিছু নেতাকর্মী এনসিপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের যোগদান করার জন্য যোগযোগ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ইসহাক সরকার বলেন, বিএনপি থেকে এনসিপিতে যোগ দেয়ার জন্য অনেক নেতাকর্মী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এর মধ্যে ঢাকায় বাইরে থেকে বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মী যোগযোগ করছেন। এখন নামগুলো বলা যাবে না। কারণ নাম বলে সমস্যা হয়। তাদের বিভিন্নভাবে চাপ দেয়া হয়, যাতে অন্য দলে যোগ না দেন।