Image description

জাতীয় নির্বাচনে বড় জয়ের পর এবার তৃণমূলের ক্ষমতা কাঠামোর দিকে নজর দিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ঢেলে সাজানোর পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মে মাসেই এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে ইতিমধ্যে দুই দফায় ১১ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মে মাসের শেষের দিকে অর্থাৎ ঈদুল আজহার পর ইউপি নির্বাচনের তফসিল হতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিগগিরই এ বিষয়ে ঘোষণা আসবে। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পর তারিখ ঘোষণা হবে।’ 

মাঠ গোছানোর পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে তৃণমূলের রাজনীতিতে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য তফসিল ঘিরে বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার দলীয় সরকারের অধীনে ভোট হওয়ায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড় বাড়ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের একাধিক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলেও প্রার্থীরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে না। দলের প্রার্থীদের বাইরে আগের মতো এলাকায় জনপ্রিয় রাজনীতির বাইরের মানুষগুলো নির্বাচনে আসবেন। আগে তো মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।

নির্বাচন কমিশন ও সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) দিয়ে। আগামী মে মাসের শেষার্ধে তফসিল ঘোষণা করে জুন মাসের দিকে ধাপে ধাপে এ ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে, বরিশাল বিভাগ থেকে প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের বিষয়টি সরকারের প্রাথমিক বিবেচনায় রয়েছে।

সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলোতে যেখানে জনপ্রতিনিধি নেই বা বিতর্কিত, সেখানে শুরুতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। লক্ষ্য হলো নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটানো। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে।

এদিকে বিগত সরকার প্রবর্তিত দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের বিধান বাদ দিয়ে গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করার পর এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে এবারের নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয়। তৃণমূলের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং ‘অরাজনৈতিক’ ও ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিদের সুযোগ দিতেই এ ‘স্বতন্ত্র’ স্টাইলে নির্বাচনের পথে হাঁটছে সরকার।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন বিভিন্ন দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তখন বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

তৃণমূলপর্যায়ের নেতাকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত তিন থেকে পাঁচজন প্রভাবশালী নেতা চেয়ারম্যান পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবার যেহেতু দলীয় প্রতীকের বিধান বাতিল হয়েছে, তাই যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যাও অনেক বেশি। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এখন কেন্দ্রীয় ও জেলাপর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাদের ড্রইংরুমে ভিড় করছেন। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে যারা মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং যারা জুলাই অভ্যুত্থানে মাঠে সক্রিয় ছিলেন, তারা নিজেদের অগ্রাধিকারে রাখছেন।

বাড্ডা থানা বিএনপির নেতা এজিএম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কমিশনার পদে নির্বাচন করতে চাই। এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছি। দল মনোনয়ন দিলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাই।’ তার নির্বাচনী এলাকা বাড্ডায় তার ছবিসহ পোস্টার লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। বিয়েবাড়ি, জানাজা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানকে জনসংযোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন তারা। সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে কুশলবিনিময় এবং বিপদে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে এবার স্থানীয় নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক তরুণ ও সাবেক ছাত্রনেতা অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাদের মতে, বয়স্ক ও সনাতন রাজনীতিকদের পাশাপাশি শিক্ষিত ও কর্মঠ তরুণদের নেতৃত্বে আনা হলে গ্রাম-গঞ্জের উন্নয়ন আরও টেকসই হবে। তৃণমূলের তরুণ ভোটারদের মধ্যেও এই নতুনের আবাহন নিয়ে বেশ ইতিবাচক সাড়া মিলছে।

এদিকে তৃণমূলে প্রার্থীর আধিক্য থাকায় দলীয় কোন্দল বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কাও বাড়ছে। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ব্যক্তিগত রেষারেষি বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা নেতাদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের মতে, গত ১৫ বছরে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের যে একক আধিপত্য ছিল, তা ভেঙে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনাই এখন মূল লক্ষ্য। ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্ব তুলে আনতে চায় দলটি। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা পূরণে স্থানীয় সরকারকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং স্বচ্ছ প্রতিনিধি নির্বাচন নিশ্চিত করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বিএনপি।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই অন্তত এক-দুই ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় সরকার। তিনি স্পষ্ট করেছেন, নির্বাচনে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা পেশিশক্তির ব্যবহার বরদাশত করা হবে না। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের রদবদল করে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ করার কাজও দ্রুতগতিতে চলছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দফায় ১১ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, খুলনা সিটি করপোরেশন, রাজশাহী সিটি করপোরেশন, সিলেট সিটি করপোরেশন, বরিশাল সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, রংপুর সিটি করপোরেশন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আদালতের আদেশে বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মেয়ররা পলাতক রয়েছেন। এ কারণে সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মানুষের সেবা দিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসকরা দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনের পর তারা মেয়রের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন।

গত বুধবার স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সভাপতিত্বে সিটি করপোরেশনসমূহের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের এক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, গাজীপুর, কুমিল্লা, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা নিজ নিজ দপ্তরের চলমান প্রকল্পসমূহের অগ্রগতি ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।