চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নাম মোহাম্মদ মনজুর আলম। তবে তার পরিচয় যতটা না স্পষ্ট, তার চেয়ে বেশি অস্পষ্ট তার রাজনৈতিক অবস্থান। কখনো বিএনপির সমর্থনে নির্বাচিত হয়ে নগরীর মেয়র, কখনো আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী, আবার কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া ব্যক্তি হিসেবে দাবি—এই ধারাবাহিক অবস্থান পরিবর্তনের কারণে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এক রকম ধোঁয়াশা হিসেবে রয়ে গেছেন। দীর্ঘদিনের সেই প্রশ্ন নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে, যখন তার বাসভবনে হাজির হন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসভবনে যান হাসনাত আবদুল্লাহ। বিষয়টি প্রথমদিকে সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনাটি রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নেয়। খবর পেয়ে স্থানীয়ভাবে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি মনজুর আলমের বাসার সামনে জড়ো হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাক্ষাৎ শেষে হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাকে নানা প্রশ্ন করেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা। একই ঘটনার একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, মনজুর আলমের বাসভবনের সামনে কয়েকজন ব্যক্তি হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে অবস্থান নেন। এ সময় একজন সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কী করতে গেছেন? আপনি একজন জুলাই যোদ্ধা, সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন। তাহলে আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কেন গেলেন?’
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহকে হাত নেড়ে তাদের শান্ত করতে দেখা যায়। পরে একজন এসে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সরে যেতে বলেন।
এ ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কারণ, হাসনাত আবদুল্লাহ নিজেই বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে এমন একজন ব্যক্তির বাসায় তার উপস্থিতি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে সমালোচিত।
ঘটনার ব্যাখ্যায় হাসনাত আবদুল্লাহ পরে গণমাধ্যমে বলেন, ‘রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আলাদা বিষয়। আমি সেখানে চা খেতে গিয়েছিলাম।’
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর মধ্যে রাত ৮টায় এনসিপির পক্ষ থেকে পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বৈঠকে তারা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বৈঠকে উভয় নেতাই আগামী দিনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
অন্যদিকে মোহাম্মদ মনজুর আলম বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে এসেছিলেন। পরে আমাকে ফোন দেন এবং বলেন, আমার বাসায় আসবেন। আমি তাকে দুপুরে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই। বিকেল ৩টার দিকে তিনি আমার বাসায় আসেন এবং কিছু সময় অবস্থান করেন। এটি কোনো রাজনৈতিক বৈঠক ছিল না, বরং ব্যক্তিগত সৌজন্য সাক্ষাৎ।’ মনজুর আরও বলেন, ‘আমার নামে কোনো মামলা নেই। আমি আওয়ামী লীগও করি না। আমাকে আওয়ামী লীগের দোসর বলা হচ্ছে কেন, তা আমি বুঝি না।’
তার এই বক্তব্য জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন প্রশমিত করতে পারেনি। কারণ, ঘটনাটির পেছনে থাকা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক গভীর। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় মনজুর আলমের রাজনৈতিক অতীতে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম-১০ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আফছারুল আমীনের কাছে পরাজিত হলেও, তিনি একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ২০১০ সালে, যখন তিনি বিএনপির সমর্থনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। এই বিজয় শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার জন্ম দেয় এবং তাকে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ লাভ করেন। তবে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পুনরায় বিএনপির সমর্থনে অংশ নিয়ে নির্বাচনের দিন সকালে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করেন এবং একই সঙ্গে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা ছিল নাটকীয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো স্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, এটি ছিল সাময়িক অবস্থান।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি আবারও আলোচনায় আসেন, যখন তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন এবং দলীয় ফরম সংগ্রহ করেন। একসময় বিএনপির সমর্থনে নির্বাচিত একজন নেতা হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান—এই পরিবর্তন রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করে। যদিও তিনি মনোনয়ন পাননি, তবুও এটি তার অবস্থানের পরিবর্তনের একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। একইভাবে ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন; কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ হন। ফলে তিনি এক ধরনের দলীয় পরিচয়হীন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান।
২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর একটি অনুষ্ঠানে মনজুর আলম নিজেই বলেন, তিনি শৈশব থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এখনো সেই সম্পর্ক বজায় রয়েছে। এই বক্তব্য তার পূর্ববর্তী বিএনপি-ঘনিষ্ঠ অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে। তার পারিবারিক পটভূমিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত—তার বাবা আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টর ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতা।
২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর মনজুর আলমের রাজনৈতিক উপস্থিতি আবারও আলোচনায় আসে, যখন তার বড় ছেলে নিজামুল আলম চট্টগ্রাম-১০ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। ওই আসনে তখন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী হিসেবে মো. মহিউদ্দিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই আসনে ২০০৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মনজুর পরাজিত হয়েছিলেন। প্রায় দেড় দশক পর আবারও একই আসনে তার রাজনৈতিক পরিবারের সক্রিয়তা ফিরে আসে, যা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় ২০০৮ সালের নির্বাচন, ২০১০ সালের মেয়র বিজয়, ২০১৫ সালের ভোট বর্জন ও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো, ২০১৮ ও ২০২০ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা এবং ২০২২ সালের রাজনৈতিক বক্তব্য মিলিয়ে মনজুরের রাজনৈতিক জীবন ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।
একদিকে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচিত হয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা এবং পারিবারিক আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা—এই দ্বৈত অবস্থানের মাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি। এনসিপির প্রভাবশালী নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ তার বাসায় যাওয়া মানে তিনি নতুন করে এনসিপির হয়ে আবারও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে লড়াই করতে চান—এমন মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ নিয়ে মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার।
পোস্টে বাকের মজুমদার দাবি করেছেন, সাবেক মেয়র মনজুর আলম এনসিপির সমর্থনে সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। তিনি লিখেছেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে দীর্ঘদিন সাবেক মেয়র মনজুর তার রাজনৈতিক প্রোগ্রাম পরিচালনা করছেন। আওয়ামী লীগ করেছে এ রকম অনেকেই অভ্যুত্থানের পক্ষ নিয়েছেন। মনজুর বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুটিই করেছেন এবং ৫ আগস্টের পরে বিএনপির পক্ষ থেকে মেয়র মনজুর বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
ছাত্রশক্তির এই নেতা আরও লেখেন, ‘আজ যখন হাসনাত আবদুল্লাহ মেয়র মনজুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন, তখন বিএনপির আরেক পক্ষ সেখানে গিয়ে মব চালাচ্ছে। মূলত সাবেক মেয়র মনজুর এনসিপির সমর্থনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন।’
এনসিপি থেকে সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক মেয়র মনজুর আলম কালবেলাকে বলেন, ‘মানুষ এটা নিয়ে কানাঘুষা করছে। আমি তো কাউকে বলি নাই আমি নির্বাচন করব।’
এসব বিষয়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। সাবেক সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম কোন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তিনি কখন কী অবস্থান নেন—এসব নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারছেন না কেউ-ই। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তার বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে একাধিক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি সামনের দিনে এনসিপিতে যোগ দেবেন, নাকি ১১ দলীয় জোটের হয়ে নির্বাচনী মাঠে নামবেন?