সাজেদুল হক
বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েনের লেখা পড়ছিলাম। দৃশ্যত এখনই ইরানে রেজিম চেঞ্জের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন তিনি। তবে পশ্চিমা সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যেটা হয়—ফিলিস্তিন–ইরানের মতো ইস্যুতে তারা ঠিক নিরপেক্ষ থাকেন না। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
বাংলাদেশের জোট রাজনীতি নিয়ে লিখতে বসে বোয়েনের কথা কেন টানলাম? নিবন্ধের শুরুতে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন—কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান কীভাবে হয়? তিনি উত্তর খুঁজেছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কাছ থেকে। মার্কিন এই লেখক বলেছিলেন, ভেঙে পড়ে—ধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে।
গত কয়েক দিন ধরে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ব্যাখ্যায় এ কথাটিই বারবার মনে হচ্ছে। যদিও এটা বলে নেওয়া দরকার যে কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে এ জোটের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু রাজনৈতিক জোটও কি এভাবে ভেঙে পড়ে না? তার আগেই অবশ্য বেশ কিছু প্রশ্ন উঠবে। তারা প্রথমে বলবেন, এটা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন কোনো জোট নয়। একটু পরে বলবেন, এটা আসলে কোনো জোটই নয়—এটা সমঝোতা। আবার নিজেরাই এক ইন্টারভিউতে একাধিকবার বলবেন, জোট। কী অদ্ভুত! নেতা ছাড়া জোট বা রাজনীতি—কোনোটাই হয় না। কে তাদের বোঝাবে!
বুধবার দিনটা ছিল নাটকীয়। এ কথা বলেও খটকা কম লাগল না! কারণ রাতটাও কম উত্তেজনাকর ছিল না। ইসলামী আন্দোলনের নীতিনির্ধারকদের বৈঠক চলে রাত একটা পর্যন্ত। অন্য জোটসঙ্গীদেরও প্রায় একই অবস্থা! কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না তারা। খবর ছড়িয়ে পড়ে—জোটে থাকবে না ইসলামী আন্দোলন। খেলাফত মজলিস নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা যায়। তবে সেটা জোট ছাড়ার মতো নয়।
সকাল ১১টা ২৪ মিনিটে পাওয়া যায় জামায়াতের বার্তা। বলা হয়, বিকেল সাড়ে চারটায় ১১ দলের সংবাদ সম্মেলন। সেখানে আসন সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে। তখনও ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের বৈঠক চলছিল।
তবে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের যোগাযোগ যে শেষ হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২টা ১৬ মিনিটে। হামিদুর রহমান আযাদের বার্তা পাওয়া যায় ফের। জানানো হয়, সংবাদ সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়েছে। পরে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকেও বলা হয়, একবক্স নীতিতে অটল থেকে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতার আলোচনা চলছে। তবে এটাও জানানো হয়, সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করতে ইসলামী আন্দোলনের আমির কাউকে অনুরোধ করেননি।
৩০০ আসনে প্রার্থী না দিয়ে জামায়াত যে একটি ভুল করেছে, তা এখন স্পষ্ট। কারণ ইসলামী আন্দোলন এবং আরও কোনো দল যদি সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে ৩০০ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীই থাকবে না।
সমঝোতার জন্য সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার পর দুটি আলোচনা জোরদার হয়েছে। একটি হতে পারে—ইসলামী আন্দোলনসহ এগারো দল আসন সমঝোতায় পৌঁছাল। আরেকটি হতে পারে—ইসলামী আন্দোলন জোটভুক্ত কয়েকটি দল নিয়ে নতুন জোট গঠন করল। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সঙ্গে তাদের সমঝোতা অস্বাভাবিক নয়। অভাবনীয় নয় বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগও।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেটা বলা হয়—রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। যদিও কথাটা নীতিহীন।
মাস কয়েক আগের কথা। জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করে বিবৃতি দিলেন নাহিদ ইসলাম। জবাবে কিছুটা নরম ভাষায় উত্তর দেয় জামায়াত। তখন জামায়াতের এক শীর্ষ নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—এটা কেন? তিনি বলেছিলেন, এনসিপির সঙ্গে সমঝোতার জন্য। আমার অবশ্য তখন মনে হয়েছিল, এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা অসম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়েছে।
জোট রাজনীতি এখন শ্বাসরুদ্ধকর একটি সময় পার করছে।
পুরো ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই কি ১১ দলীয় জোট ভেঙে যাবে? নাকি ইরানের রেজিমের মতো এটা টিকে থাকবে?
এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে খুব শিগগিরই।