গণপূর্ত বিভাগে (পিডব্লিউডি) মেহেরপুর জেলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটানো, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বদলি বাণিজ্য এবং রহস্যজনক ক্ষমতার জোরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জামাল উদ্দীনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের ভাষ্য, কার্যত পুরো মেহেরপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগটি দীর্ঘদিন ধরে তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় ঠিকাদার ও পিডব্লিউডি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসডি জামাল বিভিন্ন সময়ে অন্য ঠিকাদারের নামে কাজ দেখিয়ে বাস্তবে নিজেই সেই কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। সদর উপজেলার রাজনগর গ্রামের দুলাল (ছদ্মনাম) নামের এক ঠিকাদারের মাধ্যমে এসব অনিয়ম করে থাকেন তিনি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক পৌর মেয়র মাহফুজুর রহমান রিটনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি মেহেরপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। এমনকি তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একবার তার বদলি হলেও, মন্ত্রীর ভাই ঠিকাদার সরফরাজ হোসেন মৃদুল এবং ভগ্নিপতি ঠিকাদার বাবলু বিশ্বাসের সুপারিশে সেই বদলি আদেশ বাতিল হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, গাংনী শহরে স্বজনদের নামে তিনি পাঁচতলা ভবনসহ অন্তত দুটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সন্ধানী স্কুলের পাশেই অবস্থিত তার একটি পাঁচতলা বাড়ি। এছাড়া ঠিকাদারদের কাজের বিল উত্তোলনের সময় বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে বিলের পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত আদায় করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পালের দায়িত্বকালীন সময়ে প্রতিবছর এসডি জামাল তার নিজ ভাগনে রাজিবুর রহমান পিন্টুর নামে অফিসিয়াল ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। মেহেরপুর শহরের মতিন হার্ডওয়্যার, কামাল হার্ডওয়্যার ও মিশু ইলেকট্রনিক্সসহ বিভিন্ন দোকান থেকে কম দামে মালামাল কিনে ভাউচারে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত বাড়ির বিভিন্ন সংস্কারকাজের মালামাল কিনে তিনি সরকারি ভাউচারের মাধ্যমে সেই বিল পরিশোধ করেছেন বলেও দপ্তর সংশ্লিষ্টরা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
পিডব্লিউডির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগ আমলে মেহেরপুর-২ আসনের সাবেক দুই সংসদ সদস্যের সঙ্গে সখ্যর সূত্রে এবং সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রীর নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে এসডি জামাল মেহেরপুরের গণপূর্ত বিভাগে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন।
বর্তমানে তিনি একাই জেলা গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল), উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) এবং সহকারী প্রকৌশলী এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিজ পদের প্রভাব খাটিয়ে জেলা জজ আদালত ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন মামলার আসামিদের জামিনের তদবির করতেন তিনি। গাংনী উপজেলায় স্থায়ী ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও তিনি মেহেরপুর জেলা পিডব্লিউডিতে একই কর্মস্থলে টানা ১৪ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন।
২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিজ এলাকা গাংনীর লোকজনের নামে পিডব্লিউডির প্রায় ৩৫টি ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আর অনুসন্ধানে জানা গেছে, লাইসেন্সপ্রাপ্তদের মধ্যে মুদি দোকানি ও পান বিক্রেতাও রয়েছেন।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে তার অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, এই এসডি জামালের কারণে এক ঠিকাদারের সংসার ভেঙে গেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে বদলি হয়ে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলীরা মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে যোগদান করলে তাদের চাপে রাখতে গাংনী উপজেলার নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিককে ব্যবহার করতেন তিনি। আবার নিজের পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পেলে নামধারী ও ফেসবুক লাইভ ভিত্তিক সাংবাদিকদের কাজের স্পটে পাঠিয়ে চাঁদাবাজি করানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এসডি জামাল উদ্দিন সব অভিযোগ অস্বীকার করে কালবেলাকে বলেন, নতুন লাইসেন্স হলে সরকার রেভিনিউ পায়, সরকারের আয় বাড়ে। নতুন লাইসেন্স হলে তো অসুবিধার কিছু নেই। লাইসেন্স যশোর সার্কেল অফিস থেকে পাস হয়ে আসে। আমি অফিসে বর্তমান পদে মাত্র এক বছর আছি। প্রমোশন পাওয়ার পর ঢাকায় বদলি হয়েছি, পরে আবার এখানে এসেছি। এখানে একই পদে দীর্ঘদিন আছি- এভাবে এ কথা তো কেউ বলতে পারে না।
মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী আমাদের দপ্তরে প্রত্যেক কর্মকর্তা তিন বছর দায়িত্ব পালন করলে বদলি হন। জামাল স্থানীয় হওয়ায় হয়তো প্রভাবশালীদের সহযোগিতা পেয়েছেন। তিনি ২০১৩ সাল থেকে একই কর্মস্থলে ছিলেন। ২০২০ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান। এরপর থেকে চলতি দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও একটি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি অতিসম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি, তাই নৈতিকতা সংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হক মুঠোফোনে কালবেলাকে বলেন, জামাল উদ্দিন দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় তার একটি আলাদা প্রভাব তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে, এটা সত্য। বর্তমানে নির্বাচনকালীন সময় হওয়ায় তাকে বদলি করা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচন শেষে এক মাসের মধ্যেই তাকে অন্যত্র বদলি করা হতে পারে।
মেহেরপুর গাংনী উপজেলা তার স্থায়ী ঠিকানা হলেও জামাল উদ্দিন ২০১৪ সালের ১ জুলাই মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত একই স্থানে কর্মরত থাকার পর বদলি আদেশ জারি হলেও তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর ভাই ও ভগ্নিপতির সুপারিশে তা বাতিল হয়। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে ২০২১ সাল থেকে অদ্যাবধি তিনি একই কার্যালয়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।