Image description
 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে ‘নতুন অধ্যায়’-এর ভাষা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আবেগে ইতিহাসের অধ্যায় বা রাষ্ট্রের মান বদলায় না। রাষ্ট্রের মান বিচার হয় ফলাফলে—স্লোগানে নয়, শাসন-রেকর্ডে এবং ক্ষমতার বলয় নিয়ন্ত্রণ করা মানুষদের কর্মে। সেই মানদণ্ডে দাঁড়ালে ২০০১-২০০৬ সময়কালের অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যৎ কল্পনা করা বাস্তবসম্মত নয়। এই লেখা কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রনায়কের অতীত ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতার সংক্ষিপ্ত পারফরম্যান্স অডিটও বটে।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যে শাসনব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল, সেটিকে কেবল একটি নির্বাচিত জনবান্ধব সরকারব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বাস্তবে রাষ্ট্র তখন এক ধরনের দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামোতে পরিচালিত হচ্ছিল। সাংবিধানিক নির্বাহী ক্ষমতা ছিল সরকারের হাতে, কিন্তু নীতিনির্ধারণ, নিয়োগ, টেন্ডার, লাইসেন্স ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বহু সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতো একটি অঘোষিত কেন্দ্র থেকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ছিল রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিকীকরণ—যেখানে আইন ও প্রক্রিয়ার বদলে ব্যক্তিগত নৈকট্য শাসনের মুদ্রা হয়ে ওঠে।

২০০১ থেকে ২০০৫—টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় থাকার অভিজ্ঞতা কোনও দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি একটি শাসন-ব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল।

এক হিসাবে দেখা যায়, ২০০১-০৬-এ ১০০-তে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ২০, যেখানে হাজারো সমালোচনা সত্ত্বেও ২০০৯-২০২৪ সময়কালে সর্বনিম্ন স্কোর ছিল ২০। ওই ২০০১-০৬ সময়ে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু নৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, অর্থনৈতিকভাবেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই জায়গা থেকে তুলনামূলক বাস্তবতা বোঝা জরুরি। ২০০৯-২০২৪ সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ডেলিভারি সক্ষমতা যে স্কেলে পৌঁছেছে, সেটি একটি কঠিন বেইজলাইন তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ডেটা অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি পার ক্যাপিটা ২০২৪ সালে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। দুই দশক আগে এই সূচক ছিল কয়েকশত ডলারের স্তরে। একই সময়ে সামগ্রিক জিডিপি ভলিউম প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এর অর্থ এই নয় যে সব কিছু নিখুঁত ছিল; এর অর্থ হলো মানুষের আয়-সামর্থ্য, বাজারের আকার এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্কেল উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। ক্ষমতায় যেতে চাইলে এই বেইজলাইন অতিক্রম করতে হবে—এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎ খাতে তুলনাটি আরও স্পষ্ট। ২০০৯ সালে গ্রিডভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের নিচে; ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা পঁচিশ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। নীতির মান, জ্বালানি মিশ্রণ বা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্মম—শিল্প, নগর ও সেবা খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এখন ন্যূনতম প্রত্যাশা। ভোটার শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করবে, ঘর, কারখানা আর শহর চলবে কিনা। এই প্রশ্নে উত্তর না থাকলে অতীতের সমালোচনাও কাজে আসে না।

ভৌত অবকাঠামোতেও একই বাস্তবতা। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগে একটি গুণগত পরিবর্তনের সিগন্যাল দিয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেল চালু হওয়া নগর পরিবহনে সক্ষমতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এগুলো প্রতীকী সাফল্য নয়; এগুলো রাষ্ট্রের স্কেলড ডেলিভারির প্রমাণ। তারেক রহমান যদি রাষ্ট্রনায়ক হতে চান, তাকে দেখাতে হবে—তিনি এই স্কেল ছাড়িয়ে যেতে পারেন।

কিন্তু অর্থনীতি ও অবকাঠামোই সব নয়। রাষ্ট্র টিকে থাকে আইনশৃঙ্খলা ও নৈতিক কর্তৃত্বে। ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে সহিংসতা, ভাঙচুর ও মব-চাপের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়। একই সময়ে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগও সামনে আসে, বিশেষত পরিবহন ও স্থানীয় বাজারঘেঁষা এলাকায়। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে—এবং জনআলোচনায় বিএনপি-সংশ্লিষ্টদের দিকেও প্রশ্ন উঠেছে। আইনের চূড়ান্ত রায় আদালত দেবে; কিন্তু রাজনীতিতে নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

এসব বাস্তবতা আমাদের তাত্ত্বিক জায়গায় নিয়ে যায়। ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস রবিনসনের ভাষায়, যে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কল্যাণের বদলে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সম্পদ আহরণের যন্ত্রে পরিণত হয়, সেটি এক্সট্রাকটিভ ইনস্টিটিউশনের ফাঁদে পড়ে। অ্যান্টোনিও গ্রামশির ভাষায়, নৈতিক নেতৃত্ব হারালে সমাজে হেজিমনি সংকট তৈরি হয়—আর তখন সহিংসতা ও চরমপন্থা সামাজিকভাবে জায়গা পায়। ২০০১-২০০৬ সময়কাল তাই কেবল অতীত নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার প্রতীক ধ্বংসের অভিযোগ বিশেষভাবে গুরুতর। ধানমন্ডি ৩২-এর মতো জাতীয় স্মৃতি-স্থাপনা ঘিরে ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। জনপরিসরে এমন ধারণাও শক্ত হয়েছে যে এসব ঘটনার পেছনে বিএনপির। সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত বিচার তদন্তে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হতে চাইলে একটি ন্যূনতম দায়িত্ব থাকে—জাতির স্মৃতি ও প্রতীক রক্ষা করা। মব-চাপ, চাঁদাবাজি আর প্রতীক ধ্বংস কোনোভাবেই “রাজনীতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া” নয়; এগুলো রাষ্ট্রভাঙার পদ্ধতি।

এই জায়গায় নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিকে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক। দ্য প্রিন্স–এ তিনি ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল নিয়ে নির্মম বাস্তববাদ দেখিয়েছিলেন; কিন্তু একই সঙ্গে একটি স্পষ্ট সতর্কতাও দিয়েছিলেন; সেটি এই, যে শাসক রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতীক, ইতিহাস ও জনবিশ্বাসকে ভেঙে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায়, সে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে ফেলে। ম্যাকিয়াভেলির ভাষায়, ভয় দিয়ে শাসন করা যায়, কিন্তু ঘৃণা উৎপাদন করলে শাসন টেকে না। স্বাধীনতার প্রতীক ধ্বংস, মব-চাপকে প্রশ্রয়, কিংবা চাঁদাবাজির মাধ্যমে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—এসব হয়তো স্বল্পমেয়াদে ক্ষমতার ভ্রম তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের বৈধতা ক্ষয় করে। রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার শর্ত এখানেই—ক্ষমতার কৌশল আর রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার নৈতিক সীমার পার্থক্য বোঝা।

একই সঙ্গে, গফম্যানের নাট্যতাত্ত্বিক সমাজবিশ্লেষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গফম্যান দেখিয়েছিলেন যে ক্ষমতা কেবল নীতি দিয়ে নয়, পারফরম্যান্স দিয়েও টিকে থাকে—কে কীভাবে নিজেকে জনসমক্ষে উপস্থাপন করে, আর পর্দার আড়ালে কী ঘটে, সেই দ্বৈততার ওপর শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘শুদ্ধ রাজনীতি’, ‘সংস্কার’, বা ‘নতুন অধ্যায়’—এই ফ্রন্ট-স্টেজ ভাষার সঙ্গে যদি ব্যাক-স্টেজে মব-চাপ, চাঁদাবাজি, কিংবা প্রতীক ধ্বংস চলতে থাকে, তবে সেই পারফরম্যান্স দ্রুত ভেঙে পড়ে। গফম্যানের ভাষায়, দর্শক একসময় বুঝে ফেলে—এটি অভিনয়, বাস্তবতা নয়।

রাষ্ট্রনায়ক হতে চাইলে তারেক রহমানকে তাই শুধু ভাষা নয়, পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে। ফ্রন্ট-স্টেজ ও ব্যাক-স্টেজ এক না হলে রাজনৈতিক বৈধতা টেকে না।

এখানে আবার ফিরে আসা যায় নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির নির্মম বাস্তববাদের কাছে। দ্য প্রিন্স-এ তিনি দেখিয়েছিলেন, দীর্ঘমেয়াদে সেই শাসকরাই টিকে থাকে যারা সবসময় মনের কথা মুখে বলে না, এবং মুখে যা বলে, মনে তা বিশ্বাসও করে না। এটি কোনও নৈতিক উপদেশ নয়; এটি ক্ষমতার বাস্তব ব্যাকরণ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে এই কৌশল তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন কৌশল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়—যখন মুখে “সংস্কার”, “শুদ্ধ রাজনীতি” বা “নতুন অধ্যায়” বলা হয়, আর বাস্তবে মব-চাপ, চাঁদাবাজি বা প্রতীক ধ্বংস চলতে থাকে। ম্যাকিয়াভেলি ক্ষমতার টিকে থাকার কৌশল ব্যাখ্যা করেছিলেন, রাষ্ট্র ধ্বংসের লাইসেন্স দেননি। তাই প্রশ্নটা আজ আর কৌশলের নয়—প্রশ্নটা হলো, এই দ্বৈত ভাষা কি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখছে, না ভেতর থেকে ক্ষয় করছে। গফম্যান দেখিয়েছেন এই দ্বৈততা কীভাবে অভিনয়ে ধরা পড়ে, আর ম্যাকিয়াভেলি দেখিয়েছেন—এই অভিনয় কখন ক্ষমতার কৌশল থেকে রাষ্ট্রের সংকটে রূপ নেয়।

তাই প্রশ্নটি ক্ষমতার নয় শুধু; প্রশ্নটি জাতি গঠনেরও। তারেক রহমানের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কোনও ইশতেহার নয়—জাতি গঠন। কারণ যৌথ ইতিহাস ছাড়া রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মাঝে লুকায়িত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিটি দেশে বিভাজনের কেন্দ্র হিসেবে ১৯৭১-এর ইতিহাস ও রাষ্ট্রের প্রতীক নিয়ে দ্বন্দ্বকে মিথ্যা বয়ানে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। তারেক রহমানকে এ চ্যালেঞ্জটি মোকাবিলা করতে হবে সততার সাথে। রাজনৈতিক কারণে ইতিহাস বিকৃতির পথ থেকে তারেক রহমানকে বের হয়ে সততার পথে হাঁটতে হবে।

এই কাজের জন্য তাঁর আওয়ামী লীগঘেঁষা কোনও ইতিহাস মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। এমনকি আমাদের সরকারিভাবে প্রণীত “স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস” বিষয়ক গ্রন্থমালাও পড়ার দরকার নেই; শত্রুপক্ষের বয়ানগুলোই যথেষ্ট তাঁকে প্রকৃত ইতিহাস বলার জন্য। পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা অথবা তখনকার বয়ান, যেমন- নিয়াজী, টিক্কা, রাজা, গুল, সালিক, ইত্যাদি সামরিক ব্যক্তিবর্গের রচনা, ইয়াহিয়ার বিভিন্ন সময়ের বয়ান যেগুলো সামাজিক মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভুট্টোর স্মৃতিকথা, হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট, পাকিস্তানের শ্বেতপত্র, সেসময়ের বিখ্যাত সব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যেমন বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, লন্ডন টাইমস, সানডে টাইমস, সিডনি মর্নিং হ্যারল্ড, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়েচে ভেলে—এগুলো একটু নাড়াচাড়া করে দেখতে পারেন। সবখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃত। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই স্বীকৃতির সবচেয়ে শক্ত দলিলটি রয়েছে তারেক রহমানের নিজের পিতার “একটি জাতির জন্ম” লেখা প্রবন্ধে। এটি ১৯৭৪-এ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়।

সঠিক ইতিহাস চর্চা তারেক রহমানের সামনে খুলে দিতে পারে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার দুয়ার। মনে রাখতে হবে, এই স্বীকৃতি কোনও রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ নয়; এটি রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম শর্ত। প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক দেশকে বিভাজিত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ রাখতে ভূমিকা রাখে। যারা স্বাধীনতার ইতিহাস ও নায়কদের অপমান করে তারা কিন্তু জিয়াউর রহমানের পরিচয়কেও অপমান করে। সুতরাং তারেক রহমানকে সেই অপমানের রাজনীতি থেকে বের হতে হবে।   

সুতরাং এটির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত আরেকটি বিষয়—স্বাধীনতাবিরোধী ও রাজাকার দর্শনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ। যত উন্নয়ন পরিকল্পনাই থাকুক, যদি দেশের বড় একটি অংশ মনে করে যে নেতৃত্ব স্বাধীনতার মূল স্রোতের বাইরে অবস্থান করছে, তবে সেই শাসন নৈতিক বৈধতা পাবে না; তাঁর সকল পরিকল্পনা এই জনগোষ্ঠীর বিরোধিতার কারণে একসময় ব্যর্থ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে রাজনীতিতে অযথা ভারতবিরোধিতার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে ন্যায্য দরকষাকষি রাষ্ট্রনীতির অংশ; কিন্তু আবেগী ভারতবিদ্বেষ নীতি নয়—এটি ব্যর্থতা ঢাকার শর্টকাট পদ্ধতি।

সবশেষে উন্নয়নের প্রশ্নে একটি নির্মম সত্য মানতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা রাজনৈতিক ত্রুটি ও বিতর্ক থাকলেও আয়-স্কেল, বিদ্যুৎ সক্ষমতা ও বড় অবকাঠামো সংযোগে একটি বেইজলাইন দাঁড়িয়ে গেছে। ক্ষমতায় যেতে চাইলে তারেক রহমানকে শুধু সেই বেইজলাইন ধরে রাখলেই চলবে না; তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আর সেটি সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন তিনি বিদ্বেষ, মব-রাজনীতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান নেবেন এবং সবার আগে জাতি গঠনের ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করবেন।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলে রাষ্ট্র আবারও মূল্য দেবে। আর যদি এটি ইতিহাস সংশোধনের মুহূর্ত হয়, তবে শুরুটা করতে হবে সত্য স্বীকার দিয়ে—ক্ষমতা দিয়ে নয়। বাংলাদেশ আর পরীক্ষাগারের রাষ্ট্র হতে পারে না।

 

ড. শ্যামল দাস

লেখক: অধ্যাপক, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র।