Image description
খালেদা জিয়ার জানাজায় জনপ্লাবন দেখল বাংলাদেশ। ‘ভিড়’ বাংলাদেশে নতুন নয়। বিগত কয়েক মাসে গোটা বিশ্ব বারবার দেখেছে কীভাবে বারবার রাস্তায় নেমে পড়েছে বাংলাদেশের নানাপ্রান্তের মানুষ। ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। প্রাণ দিয়েছে। আবার প্রাণ নিয়েওছে। কিন্তু বছরের শেষ দিনে খালেদা জিয়াকে অন্তিম শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নামা মানুষ এবং খালেদার সন্তানের বোঝাপড়া যে দৃশ্যকল্প তৈরি করল তার গুরুত্ব উপমহাদেশের রাজনীতিতে অসীম। সমস্ত ঝুঁকি মাথায় রেখেই বলা যায়, এই মুহূর্তটিই হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট।

 

জুলাই অভ্যুত্থানে রাস্তার দখল নিয়েছিলেন অপশাসনে ক্লান্ত, দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ, অত্যাচারে রক্তাক্ত মানুষ। তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল নানা স্বার্থগোষ্ঠী, যা জুলাই আন্দোলনকে কালিমালিপ্তই করেছে, প্রশ্ন তুলেছে আন্দোলনকারীদের অভিসন্ধি নিয়ে। জুলাই আন্দোলন ক্রমে কোণঠাসা করেছে আওয়ামী লীগকে, দায়িত্বে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার, কিন্তু বাংলাদেশের মনের শুশ্রূষা হয়নি। বারবার, ক্ষুব্ধ বিমর্ষ মানুষ কার্যত টুলে পরিণত হয়েছে।
 
‘ভিড়ের’ আবেগকে ন্যূনতম সম্মান করেনি স্বার্থগোষ্ঠীগুলো; বরং একটা বড় অংশের মনের দখল নিয়ে, তাঁকে পরিচালনা করার চেষ্টা করে গিয়েছে। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর থেকে শুরু, দেশের বাইরে বসে থাকা ইনফ্লুয়েন্সাররা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন না করে, সেই আগুনে মশাল জ্বালিয়েছেন। এর সর্বশেষ উদাহরণ প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের দপ্তরে হামলা, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের হেনস্থা।

 

মনে রাখতে হবে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ক্ষেত্রে শুধু ভবন ভাঙচুর হয়নি, আটকে পড়েছিলেন বহু সাংবাদিক, তাঁদের মৃত্যু হতে পারত। অর্থাৎ হিংস্র মব সহনাগরিকের প্রাণের মূল্যের কথাও ভাবেনি। যে নূরুল কবীর হাসিনা জামানার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে কখনও পিছু পা হননি, তাঁকেও যখন হেনস্থা করা হলো তখন বোঝা গিয়েছিল এই জনতা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তাদের রিমোট আছে অন্য কারোর হাতে। তারা যেমন খুশি তেমন নাচায় ভাবতে নাচার জনতাকে। আর সরকার, সে যেন অক্ষম, ন্যুব্জ, অপারগ।

 

এই অবস্থা বাংলাদেশে বসবাসকারী এমনকী বাংলাদেশের বাইরে থাকা সচেতন, ধর্মনিরপেক্ষ, রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষদের বারবার বিড়ম্বনায় ফেলেছে।

 

নির্বাচনের প্রাক্কালে এনসিপির জামায়াত-ঝোঁক একাত্তরপন্থী কিন্তু হাসিনাশাহীর বিরোধী বহু মানুষের মনোবেদনার কারণ হয়েছে। পর্বত মূষিক প্রসব করেছে। এই বৃহত্তর শান্তিকামী বাংলাদেশি সমাজ প্রত্যক্ষ বিএনপি ক্যাডার নয় কিন্তু নেতৃত্বহীন শূন্যসময়ের শরিক। তারেক রহমানের এই শারীরিক উপস্থিতি সেই অভাব পূরণ করতে পারে।

 

এমন পরিস্থিতিতেই স্বদেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় কর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ রাখতেন। সভা করতেন। কিন্তু ১৭ বছরের অদর্শন। ১৮ মাস কারাবাসের পর সেদিন দেশ ছেড়েছিল এক যুবা। আর ফিরেছেন এক পরিণত মধ্যবয়স্ক নেতা। তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিলেন যাঁরা, আজ তাঁরাই দেশছাড়া।

 

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ঘিরে তাই উচ্ছ্বাস ছিল সংগত কারণেই। অপেক্ষা ছিল বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। তারেক রহমান দেশে ফেরার প্রাক্কালে তাঁর সমর্থকদের বিমানবন্দরের সামনে ভিড় করতে না করেন, বুঝিয়ে দেন বাংলাদেশ মানে ‘অনিয়ন্ত্রিত ভিড়’—এই ছবিটা বিশ্বমঞ্চে প্রদর্শিত হোক তা তিনি চান না।

 

পূর্বাচলে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে তাঁর বক্তৃতাতেও অভাবনীয় ভিড় হয়েছিল। তিনি স্বপ্নের কথা বললেন, পরিকল্পনার কথা বললেন। কিন্তু কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। যে মব নিয়ন্ত্রণে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, তার থেকে এই ভিড় সংযত অথচ উজ্জীবিত ছিল—মানুষ এই সমাবেশে এসেছিলেন ভালোবাসার তাগিদে, অপেক্ষার ঋতু পার করে। প্রথম জনসভায় তারেক রহমান ভাঙার নয় গড়ার ডাক দিয়েছেন। ইনক্লুসিভ বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরেছেন। অথচ ১৭ বছর দেশে ফিরতে না পারা মানুষটা চাইলেই প্রতিশোধের জিগির তুলতে পারতেন।

 

তারপর এল বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার এই মুহূর্ত। এই জানাজায় যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা সকলেই বিএনপি কর্মী ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তিম বিদায়ে এমন ছবি এই উপমহাদেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে। ২০০৯-২০২৪ খালেদা জিয়া অপমান সহ্য করেছেন, নিঃসঙ্গ জেলজীবন মেনে নিয়েছেন, তাঁর পারিবারিক বাসভূমিটিও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে খালেদা জিয়া দেশ ছাড়েননি—এই সমস্ত তথ্য-তত্ত্ব খালেদা জিয়ার পুত্রের চেয়ে কে ভালো জানে! ফলে, শোকের দিনে তিনি এই প্রতিটি ঘটনা উল্লেখ করে উপস্থিত মুহ্যমান জনতাকে আরও আরও উসকানি দিতেই পারতেন। যেমনটা গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে ঘটেছে বারবার।

 

কিন্তু সে পথে না হেঁটে মাত্র ৫৮ সেকেন্ডের বক্তব্যে তিনি বললেন, ‘খালেদা জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় আপনাদের কারও কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকলে আমি পরিশোধের ব্যবস্থা করব। তাঁর (খালেদা) কোনো ব্যবহারে, কোনো কথায় আপনারা আঘাত পেয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আল্লাহ যেন ওঁকে বেহেস্ত দান করেন।’ মাত্র ৫৮ সেকেন্ডের এই বক্তব্য আসলে এই উপমহাদেশের ক্ষমার রাজনীতির, অহিংস রাজনীতির দ্যোতনা বহন করছে। এই বক্তব্য ঐতিহাসিক আবার সময়ানুগ।

 

জেমস হুইলার, ভিনসেন্ট স্মিথ তাঁদের লেখায় দেখিয়েছেন, কলিঙ্গ যুদ্ধের রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন সম্রাট অশোক। অশোকের ধম্ম পরমতসহিষ্ণুতার কথা বলে। বলে ন্যায়পরায়ণতার কথা।

 

শ্রীচৈতন্যের মামার বাড়ি ছিল সিলেটে। শিক্ষাষ্টকে চৈতন্য বলছেন,
‘তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা

 

অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরি।’

 

(শিক্ষাষ্টক- ৩)
অর্থাৎ চৈতন্য বলেন, তৃণের মতো নিচু, গাছের মতো সহিষ্ণু হতে হবে। সমস্ত অভিমান অহং মুছে ফেলতে হবে।

 

১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চৌরিচৌরায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হলে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। পাশাপাশি ক্ষমাকে গান্ধী কখনও দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি। দেখেছেন মুক্তি হিসেবে।

 

এই উপমহাদেশের ইতিহাস জানেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাঁর করতলগত। তাই মায়ের জানাজায় রাজনীতি করার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি, এগিয়ে দিলেন ‘ক্ষমা’ শব্দটিকে। তাঁর এই আচরণ আসলে ডি-এসকেলেশনের বার্তা দেয়। ভারত-বাংলাদেশে অতি দক্ষিণপন্থী উগ্রবাদের বাড়বাড়ন্ত থেকে বাঁচার একমাত্র দাওয়াই: ডি-এসকেলেশন, এক পা এক পা করে পিছিয়ে আসা, উত্তেজনা প্রশমন।

 

নির্বাচনের প্রাক্কালে এনসিপির জামায়াত-ঝোঁক একাত্তরপন্থী কিন্তু হাসিনাশাহীর বিরোধী বহু মানুষের মনোবেদনার কারণ হয়েছে। পর্বত মূষিক প্রসব করেছে। এই বৃহত্তর শান্তিকামী বাংলাদেশি সমাজ প্রত্যক্ষ বিএনপি ক্যাডার নয় কিন্তু নেতৃত্বহীন শূন্যসময়ের শরিক। তারেক রহমানের এই শারীরিক উপস্থিতি সেই অভাব পূরণ করতে পারে। রোবট মবের ধস্ত বাংলাদেশ এমন নেতা চায় যিনি নিজে আগুনে পুড়বেন কিন্তু সমস্ত ক্ষতের মুখে রেখে দেবেন গোলাপের তোড়া।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘৃণাজর্জর রাজনৈতিক পরিবেশে কোনো লোকখ্যাপানো ইনফ্লুয়েন্সার নতুন দিন আনতে পারবে না। দিশা দেখাতে পারে একজন স্বল্পবাক মানুষই। অস্ত্রবিসর্জন আর ক্ষমার আদর্শকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে পারে নতুন বাংলাদেশ।

অর্ক দেব: সম্পাদক, ইনস্ক্রিপ্ট