গ্রামের আট চালা টিনের ঘর। কাঠের ফ্রেমে টিনের দেয়াল। সেই দেয়ালের সঙ্গে ঝুলে আছে একটি ফটোফ্রেম। উজ্জ্বল মুখ। সোনালি পাড়ের গোলাপি শাড়ি। চোখ শান্ত, কিন্তু লক্ষ্যে স্থির। নব্বইয়ের দশকে আমরা যারা বেড়ে উঠেছি, তাদের এই ছবিটির সঙ্গে পরিচয় আছে। সেই ছবির পরিচয়ের সীমানা পেরিয়ে যখন তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ হলো, তখন তিনি অসুস্থ; ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে প্রহসনের মামলায় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু প্রায় বিনা চিকিৎসায় শরীর বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে। পুত্র হারানো, অসুস্থ শরীরের একজন নারী, যিনি তখনও চিন্তা করছেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে।
২০২৪-এর ডিসেম্বর। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ সংগঠনের পক্ষ থেকে বিজয় দিবসের স্বাধীনতা কনসার্ট আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আয়োজনের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসভবনে। আমাদের প্রত্যেকের কুশল জানতে চাইলেন। তারপর উপস্থিত সবাই একে একে সংক্ষেপে পরিস্থিতি বর্ণনা করলেন। তিনি শান্ত থেকে সবার কথা শুনলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর মনে হলো- কিছু মানুষ শুধু কথা দিয়ে নয়, নীরবতা দিয়েও আপনাকে ভালোবাসা শোনান। খালেদা জিয়া সম্ভবত সেই বিরল মানুষদের একজন।
২.
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর দেখা দেয় নিউমোনিয়া। এর সঙ্গে রয়েছে কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের পুরনো সমস্যা। ফলে পরিস্থিতি এমন- একটি রোগের চিকিৎসা দিতে গেলে আরেকটির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাকে ‘অত্যন্ত সংকটময়’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির নেতারা বলছেন, গত দুই দিনে তাঁর অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্ভব হলে দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা করছেন। এদিকে খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তাঁর সুস্থতা কামনা করে শুক্রবার সারাদেশে মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মোনাজাত করেছে বিএনপি। লন্ডনে অবস্থানরত বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান সার্বক্ষণিক খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর রাখছেন। জুবাইদা রহমান খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের একজন সদস্য। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান শাশুড়ি খালেদা জিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে আছেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন সরকার নির্বাহী আদেশে তাঁর সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। এরপর ছয় মাস পরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল সরকার। যদিও চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি।
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। গত ৮ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান। চার মাস পর ৬ মে তিনি দেশে ফেরেন।
তবে এ দফায় খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁর জন্য সারাদেশে দোয়ার আয়োজন করছে বিএনপি। জুমার নামাজ শেষে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে খালেদা জিয়ার জন্য বিশেষ দোয়ায় অংশ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। সেখানে তিনি খালেদা জিয়ার অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় বলে উল্লেখ করেন।
৩.
কী সরকার প্রধান, কী বিরোধী দলের প্রধান হিসেবে; এমনকি সংসদে না থেকেও খালেদা জিয়া দলের ভেতরে ও বাইরে একটি আপসহীন ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা এখন পর্যন্ত অনতিক্রম্য। সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি পুরোপুরি সফল ছিলেন কিনা, এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক হতে পারে। ইতিহাস সেটি বিচার করবে। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর সাহসী ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। সবাই স্বীকার করবেন যে, এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার তুলনা এখন পর্যন্ত তিনি নিজেই।
আমাদের দেশের বৈরী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক নেতারা একে অপরকে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন বাক্যবাণে জর্জরিত করেন। এমনকি অতীতের ঘটনা টেনে প্রয়াত নেতাদের বিরুদ্ধেও বিষোদ্গার করতে পিছপা হন না। এসব দেখে খালেদা জিয়া যখন বিরোধী দলে ছিলেন, তখন একবার সংসদে জাতীয় নেতাদের নিয়ে অহেতুক বিতর্ক না করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের সরকারি দল আওয়ামী লীগ সেটা গ্রহণ করেনি। আওয়ামী সরকারের আমলে যেভাবে খালেদা জিয়াকে গালাগাল করা হয়েছে, স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাতে তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের সমীহ ও ভালোবাসা আরও বেড়েছে। তাঁর শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও নোংরা কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা শেখ হাসিনা। একজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে পরিহাস করাকেও দেশের সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে ক্ষমতায় থাকতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জনপ্রিয়তা যাচাই করা কঠিন। এখানে এক দল নেতাকর্মী সব সময় বন্দনায় মুখর থাকেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র রয়েছে, নেতানেত্রীর মহিমা প্রচারের জন্য। এখানে নেতানেত্রীদের প্রকৃত জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ পাওয়া যায় সম্ভবত তাঁরা বিরোধী দলে থাকলে। এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া এই চক্রটি অতিক্রম করেছেন ভালো করে। দেখা গেছে জনপ্রিয়তায় নীতি এই মাপকাঠি অতিক্রম করেছেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রথম ধাপ হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের জন্য দেশবাসী অপেক্ষা করছে। এমন সময়ে দেখা গেল বিএনপি ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হচ্ছে সবচেয়ে সমীহের সঙ্গে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে দল হিসেবে বিএনপি যে লড়াইয়ে শামিল হতে চলেছে, সেখানেও অগ্রভাগে রয়েছেন খালেদা জিয়া; খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা এবং আপসহীনতা সঙ্গী করেই বিএনপি এগিয়ে যেতে চাইছে।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রচারে একটা গান বাজানো হতো। সেটা অনেকটা এরকম- ‘কোটি কোটি মানুষের মুখে মুখে স্লোগান/খালেদা জিয়া বাংলার কোরাজান/আন্দোলন-রাজপথে অটল-তুলনাহীন/স্বৈরাচার উৎখাতে আপসহীন’। মারিয়া কোরাজান ছিলেন ফিলিপাইনের রাজনীতিবিদ। দেশটির একাদশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এশিয়া মহাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন তিনি। ১৯৮৬ সালের সাধারণ জনগণের ভোটে তিনি ক্ষমতাসীন সাবেক স্বৈরশাসক ফার্দিন্যান্দ মার্কোসকে গদিচ্যুত করার পাশাপাশি ফিলিপাইনে গণতন্ত্র সুসংহত করেছিলেন। আমরা মনে করতে পারি, একানব্বইয়ে খালেদা জিয়ার প্রায় একক আপসহীন চরিত্র বিএনপিকে নির্বাচনী বৈতরণী সফলভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশের মানুষের মনে খালেদা জিয়ার যে আপসহীন ছবিটি আঁকা আছে, সেটি কখনও মুছে যাওয়ার নয়।
এহ্সান মাহমুদ : নির্বাহী সম্পাদক, আমাদের সময়; কথাসাহিত্যিক
মতামত লেখকের নিজস্ব