Image description
 

বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই এক ধরনের উৎসব। পোস্টারে ঢাকা পড়ে যায় গ্রামের মোড়, শহরের গলি। মাইকের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ভোরে, প্রার্থীর গাড়ির মিছিল চলে দুপুরে, বিকেলে চায়ের দোকানে জমে ওঠে আলোচনা—‘কে জিতবে?’, ‘কে হারবে?’, ‘কারা দৌড়ে এগিয়ে আছে?’। এই আলোচনার মাঝেই বহুবার শোনা যায় একটি কথা—‘ভোট নষ্ট করব না।’ প্রথমে শুনতে ভালো লাগে। মনে হয়, হ্যাঁ, ভোট নষ্ট করা ঠিক না। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই মানসিকতা আমাদের গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে বিষ খাইয়ে দিচ্ছে।

 

ধরা যাক, আপনি একজন সাধারণ ভোটার। আপনার একজন প্রার্থী আছে যাকে আপনি মন থেকে চান। তিনি হয়তো সৎ, পরিশ্রমী, মানুষের জন্য কাজ করতে চান। কিন্তু আপনার মনে হয়, তিনি জিতবেন না। হয়তো তিনি তত টাকা খরচ করতে পারেননি, হয়তো এত বড় বড় মিছিল করেননি, কিংবা তার দলে বড় নেতা নেই। তাই আপনি ভাবলেন, ‘আচ্ছা, আমি যদি তাকে ভোট দিই আর সে হেরে যায়, তাহলে আমার ভোট তো নষ্ট হবে। বরং যে জিতবে তাকেই দিই।’ এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় সমস্যার মূল। আপনি যার প্রতি বিশ্বাস রাখেন, তাকেই বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ভোট দিলেন—শুধু সে জিতবে ভেবে।

বরিশালের এক গ্রামের উদাহরণ দিই। কফিল উদ্দিন নামের এক কৃষক ছিলেন, সৎ মানুষ, এলাকার সবাইকে সাহায্য করেন। এইবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হলেন। গ্রামে সবাই জানে, কফিল উদ্দিন ভালো মানুষ, কারও ক্ষতি করেন না, বরং সবার জন্য কাজ করেন। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই কানাঘুষো শুরু হলো—‘কফিল ভাই তো টাকা খরচ করছে না, এত বড় বড় পোস্টার লাগাচ্ছে না, ও কি আর জিতবে?’ অনেকে ঠিক করল, ভোট দিলে জিতবে না বলে তাকে ভোট দেবে না। তারা ভোট দিল অন্য একজন ধনী প্রার্থীকে, যিনি নির্বাচনের সময় লুঙ্গি, শাড়ি, টাকা বিলিয়েছিলেন। ফলাফল হলো, তিনি ক্ষমতায় এসে রাস্তা সংস্কারের টাকা আত্মসাৎ করলেন। গ্রামের রাস্তা আগের মতোই কাদায় ভরা রইল, আর পাঁচ বছর পরে মানুষ হাহাকার করে বলল—‘আহা, যদি কফিল উদ্দিন জিতত!’ কিন্তু তখন আফসোস করে লাভ কী? কফিল উদ্দিন তো হেরে গেছেন, তার কারণ সেই সমর্থকরা যারা নিজেরাই তাকে ভোট দেয়নি।

 

শহরের চিত্রও আলাদা নয়। পুরান ঢাকার এক ওয়ার্ডে মোস্তাক ভাই থাকেন। তিনি সচেতন ভোটার। তার পছন্দের প্রার্থী ছিলেন একজন তরুণ কাউন্সিলর, যিনি দুর্নীতিমুক্ত এবং নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু মোস্তাক ভাই ভাবলেন, ‘সবাই তো পুরোনো কাউন্সিলরকেই ভোট দিচ্ছে, আমি কেন আলাদা হব? আমার ভোটে কিছু হবে না।’ তাই তিনি ভোট দিলেন সেই পুরনো কাউন্সিলরকেই। কয়েক বছর পরে দেখা গেল, পুরোনো কাউন্সিলর দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার, এলাকায় ড্রেনেজ নেই, রাস্তা ভাঙাচোরা, মাদক বেড়ে গেছে। মোস্তাক ভাই আফসোস করে বললেন—‘আমার ভোট আমি ভুল জায়গায় দিয়েছি।’

 

এখানে আসল কথা হলো—ভোট নষ্ট হয় কবে? অনেকেই ভাবে, প্রার্থী হারলে ভোট নষ্ট হয়। কিন্তু সত্যি হলো, ভোট নষ্ট হয় তখনই, যখন আপনি নিজের মন থেকে না চাওয়া কাউকে ভোট দেন। আপনি যদি নিজের বিবেক মেনে ভোট দেন আর সে প্রার্থী হেরে যায়, তবুও আপনি সৎ ছিলেন, মাথা উঁচু করে বলতে পারবেন—‘আমি আমার বিশ্বাসে ভোট দিয়েছি।’ কিন্তু জিতবে বলে ভুল মানুষকে ভোট দিলে, পরে সে যদি আপনাকে ঠকায়, তখন অনুশোচনার শেষ থাকে না।

আপনি হয়তো ভাবছেন, আমার এক ভোটে কি এমন হবে? ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে, কয়েক ভোটের ব্যবধানেই নির্ধারিত হয়েছে জয়-পরাজয়। অনেক সময় একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা একটি সংসদ আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে মাত্র এক বা দুই ভোট। তাই আপনার কিংবা আমার এক ভোটও ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

আমাদের সমাজে আরেকটি ভুল ধারণা খুব প্রচলিত—‘যে জিতবে তাকেই ভোট দিই’। এর ফলে যা হয়, তা হলো ভুল মানুষ বারবার জিতে যায়, আর সৎ, কর্মঠ, কিন্তু প্রভাবশালী নয় এমন প্রার্থীরা বারবার হেরে যায়। ধীরে ধীরে এই ভালো মানুষগুলো রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ায়। তারা ভাবে, মানুষ তাদের সুযোগই দেয় না। আর যারা দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে, তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, কারণ জানে—মানুষ শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই ভোট দেবে, জিতবে ভেবে।

আরেকটি সমস্যা হলো, ভোটের আগে প্রার্থীরা নানা রকম প্রলোভন দেয়। কেউ টাকা দেয়, কেউ উপহার দেয়, কেউ প্রতিশ্রুতি দেয়—‘ভাই, ভোটটা দেন, কাজ করে দেব।’ কিন্তু এ সবই সাময়িক। আজ যে টাকা পেলেন, কাল তা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ভুল মানুষকে ক্ষমতায় বসালে তার ক্ষতি আপনাকে পাঁচ বছর ভোগ করতে হবে। তাই ভোট বিক্রি করা মানে নিজের ভবিষ্যৎ বিক্রি করা।

যদি সবাই ভাবে, ‘আমার ভোটে কিছু হবে না,’ তাহলে কিছুই বদলাবে না। কিন্তু যদি সবাই নিজের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেয়, তাহলে পরিবর্তন আসবেই। নতুন, সৎ, কর্মক্ষম মানুষ সুযোগ পাবে। আমরা অনেক সময় ভাবি, দেশ আর বদলাবে না। কিন্তু পরিবর্তনের শুরু হয় একজন মানুষের সাহসী সিদ্ধান্ত থেকে।

নির্বাচনের দিন যখন ভোটকেন্দ্রে যাবেন, মনে রাখবেন—আপনার ভোট সিক্রেট ব্যালট। কেউ জানবে না আপনি কাকে ভোট দিয়েছেন। ভয় পাবেন না, লজ্জা পাবেন না, প্রলোভনে পড়বেন না। আপনার ভোট আপনার কণ্ঠস্বর। ভুল মানুষের হাতে এই কণ্ঠস্বর তুলে দেবেন না।

জিতুক বা হারুক—আপনি যেন বলতে পারেন, ‘আমি আমার বিবেক অনুযায়ী ভোট দিয়েছি।’ মনে রাখবেন, আজকের একটি ভুল ভোট আপনার জীবনের পরবর্তী পাঁচ বছর নষ্ট করে দিতে পারে। আর একটি সঠিক ভোট আপনার এলাকার, এমনকি আপনার দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

তাই পরের বার যখন ভোটের বুথে যাবেন, চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন—আমি কাকে বিশ্বাস করি? আমি কাকে চাই? যে নামটি আপনার মন বলবে, সেই নামেই সিল মারুন। এই সিদ্ধান্তই আপনাকে গর্বিত করবে, অনুশোচনামুক্ত রাখবে, আর হয়তো একটি সুন্দর ভবিষ্যতের পথ খুলে দেবে।

 

লে. কর্নেল (অব.) মাজহার