Image description

২৭ অক্টোবরের সংসদীয় নির্বাচন ছিল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা ভাবারও সুযোগ তৈরি করেছে এই নির্বাচন।

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ছিল ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এরপর থেকে দেশটির জনপরিসরের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে সরকারের নিরাপত্তাব্যর্থতা, পরবর্তী যুদ্ধগুলো এবং জবাবদিহির প্রশ্ন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও চলছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। নির্বাচনের ফল শুধু কোন দল সবচেয়ে বেশি ভোট পেল, তার ওপর নির্ভর করবে না। কে সরকার গঠনের জন্য দরকারি জোট তৈরি করতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরেই ইসরায়েলের রাজনীতিতে এই জোট গঠনের বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখে আসছে।

 

নয়াদিল্লির জন্য মূল প্রশ্ন হলো, ভারত-ইসরায়েল সহযোগিতার পেছনের স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কি এতটাই শক্তিশালী যে ইসরায়েলে সরকার বদলালেও সম্পর্কের অগ্রগতি বজায় থাকবে?

নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুই দেশের অংশীদারত্বকে দৃশ্যমান করেছে। তবে এই সম্পর্কের ভিত্তি শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ নয়। ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিরক্ষা, কৃষি, পানিব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে ভারত ও ইসরায়েল সহযোগিতা বাড়িয়েছে। এই দীর্ঘদিনের সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই বাস্তব কিছু কারণ তৈরি করেছে। ফলে বর্তমান নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যা-ই হোক, সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থ দুই পক্ষেরই আছে।

 

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই সম্পর্কের গভীরতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ যৌথভাবে বারাক-৮ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে। এটি দেখায়, দুই দেশের সহযোগিতা শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলে তৈরি আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং তামির ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ভারতে যৌথভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনাও দুই দেশ খতিয়ে দেখছে।

 

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল ভারত। এ সময়ে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রির ২৯ শতাংশ গেছে ভারতে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ভারতীয় উদ্যোগের মধ্যেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা আছে। ২০২৬ সালের জুনে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আমির বারাম ভারত সফর করেন। তিনি ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ প্রকল্পসহ প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকেও সই করে।

 

তবে এসব অগ্রগতি নিশ্চিত করে না যে ইসরায়েলে নতুন সরকার এলে প্রতিটি প্রকল্প বা উদ্যোগ আগের মতোই চলবে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার যে প্রতিষ্ঠিত যোগাযোগব্যবস্থা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ নেতাদের সামনে এগোনোর একটি ভিত্তি দিতে পারে।

 

 

ইসরায়েলে অন্য কোনো নেতা সরকার গঠন করলে দেশটির কূটনীতির ধরন ও অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর মতো ঐতিহ্যগত পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন করে জোর দিতে পারে।

 

 

তাই ইসরায়েলে সরকার বদলালে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব কঠিন হয়ে পড়ার কথা নয়। বাণিজ্য ও ব্যবসা থেকে শুরু করে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং চলমান কার্যক্রম গড়ে তুলেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও এসব কার্যকর সম্পর্ক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে নতুন ইসরায়েলি সরকার কিছু নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার, প্রকল্পের সময়সীমা কিংবা চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের চ্যালেঞ্জ হবে, শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বড় বড় ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে এই ধারাবাহিকতাকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া।

 

অর্থনৈতিক সম্পর্কও দুই দেশের অংশীদারত্ব ধরে রাখা ও আরও বিস্তৃত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির ইসরায়েল সফরের সময় দুই সরকার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে। সেই চুক্তির আলোচনা এখন অগ্রসর পর্যায়ে আছে। সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি হিসেবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সই হওয়া ভারত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কার্যকর হয়েছে। বাণিজ্য সহজ করতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতীয় রুপি ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরে।

 

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯৩ কোটি ডলার। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা সফল হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য আরও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হতে পারে, আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। তাই ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ যেকোনো সরকারেরই উচিত হবে, উপযুক্ত সময়ে পারস্পরিক লাভজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা শেষ করে চুক্তিটি সই করার চেষ্টা করা।

 

ইসরায়েলে অন্য কোনো নেতা সরকার গঠন করলে দেশটির কূটনীতির ধরন ও অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর মতো ঐতিহ্যগত পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন করে জোর দিতে পারে। গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে এমন পরিবর্তন মানেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে সরে আসা নয়। প্রচলিত অংশীদারত্বের বাইরেও সম্পর্ক ধরে রাখার প্রয়োজন ইসরায়েলের আছে। অন্যদিকে ভারতের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নানা ক্ষেত্রে ইসরায়েলি দক্ষতা ও প্রযুক্তির মূল্য আছে। নতুন নেতৃত্বকে নয়াদিল্লির সঙ্গে নিজস্ব কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সেই কাজের ভিত্তি দিতে পারে।

 

ভারতের অবস্থান ঠিক করার ক্ষেত্রে বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখবে। পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ আছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সমুদ্রপথ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় এক কোটি ভারতীয় নাগরিকের কল্যাণ। একই সঙ্গে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আছে, আর ইরানও দেশটির দীর্ঘদিনের অংশীদার।

এ বছর ইসরায়েল ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে যে উত্তেজনা দেখা গেছে, তা আরও বাড়লে ভারতের এসব স্বার্থ চাপের মুখে পড়তে পারে। তখন বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (আইএমইইসি) এবং ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত আই২ইউ২ কাঠামোর মতো যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে এই দুটি প্রকল্পেই কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কোনোটিকেই পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি।

 

এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংলাপ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের পথ সমর্থন করে যেতে পারে। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানও এর মধ্যে পড়ে। বৈচিত্র্যময় একটি অঞ্চলে ভারতের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজন থেকেই এমন অবস্থানের গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে বৃহত্তর কূটনীতির বিকল্প হিসেবে দেখতে হবে। অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সম্পর্ক একাধিক খাতজুড়ে বিস্তৃত এবং আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।

 

সব মিলিয়ে, কিছু সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তা থাকলেও ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কে ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি। নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হলে পরিচিত রাজনৈতিক যোগাযোগের পথটি অক্ষুণ্ণ থাকবে। নতুন সরকার এলে অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসতে পারে এবং সম্পর্ক গড়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে দুই দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার সম্ভাবনা এবং কৃষি, পানিব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, শিক্ষা অংশীদারত্ব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান স্বার্থের মিল ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি জোগাবে।

 

ইসরায়েলের নির্বাচন ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে। কিন্তু যে স্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এই সম্পর্ককে টিকিয়ে রেখেছে, শুধু নির্বাচনের কারণে সেগুলো মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে, সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়া এবং একই সঙ্গে অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক নমনীয়তা বজায় রাখা।

 

(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)