সরদার ফরিদ আহমদ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ১০ অক্টোবরের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ হয়। পরদিনও বিমানবন্দরে হামলার খবর আসে। হামলা অব্যাহত। ইয়েমেনের হুতিরা এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। ঘটনাটি শুধু বিমানবন্দরে হামলা নয়। এটি সৌদি আরবের সামরিক শক্তি, নিরাপত্তা কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। বিপুল তেলসম্পদ রয়েছে তার। আধুনিক অস্ত্র কেনার সামর্থ্যও আছে। তারপরও ইয়েমেনের হুতিদের মতো একটি শক্তির হামলা ঠেকাতে দেশটি কেন হিমশিম খাচ্ছে? এর উত্তর শুধু অস্ত্রের হিসাব দিয়ে পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্ব এবং তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোও।
শক্তিশালী রাষ্ট্র, দুর্বল নিরাপত্তা
২০১৫ সালে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তখন বিন সালমান ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। লক্ষ্য ছিল হুতিদের পরাজিত এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধ দীর্ঘ হয়েছে। প্রাণহানি ঘটেছে। ইয়েমেনের মানুষ দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। কিন্তু হুতিদের নির্মূল করা যায়নি।
বরং সময়ের সঙ্গে তারা সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মতো তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র দিয়ে তারা সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারছে। এর অর্থ—ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান ও আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সামরিক কৌশলে ভুল থাকলে বিপুল ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
রিয়াদের বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা হলে শুধু প্রাণহানি ঘটে না। বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে। পর্যটন ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি আরব যে নিজেকে নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তার জন্য এ ঘটনা বড় আঘাত।
আমেরিকা কি নির্ভরযোগ্য মিত্র
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে। বিপুল অর্থ দিয়ে মার্কিন অস্ত্র কিনেছে। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর। বিন সালমানের হিসাব ছিল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সৌদি আরবকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই। থাকে স্বার্থ। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে নিজের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে। একইভাবে সৌদি আরবও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে নিজ নিরাপত্তার জন্য।
রিয়াদে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন সহায়তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আল-জাজিরার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংঘাতটি এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
সৌদি আরবের জন্য শিক্ষাটি পরিষ্কার। অন্য দেশের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নিজ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সম্পর্ককে নিজের নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি বানানো কৌশলগত ভুল।
ভিশন ২০৩০: স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাত
বিন সালমানের সবচেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সৌদি আরবকে বদলে দেওয়া। তার ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার লক্ষ্য জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। পর্যটন, বিনোদন, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিশ্ব অর্থনীতিতে সৌদি আরবের নতুন পরিচয় তৈরি করা।
এই পরিকল্পনার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। সৌদি সমাজে বিনোদন ও পর্যটনের সুযোগ বেড়েছে। নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা যে অপ্রয়োজনীয়, তা বলা যাবে না।
প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের মূল্য কত? বিশাল উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ‘নিওম’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভবিষ্যৎ নগরী ‘দ্য লাইন’ নিয়ে এখন আর্থিক ও বাস্তবায়নগত উদ্বেগ রয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনেও প্রকল্পটির আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যে উন্নয়ন জীবনমান উন্নত করার কথা, সেটি যদি অতিরিক্ত ব্যয় ও ঋণের বোঝা বাড়ায়, তবে তার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিলাসবহুল প্রকল্প, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন এবং বিনোদনশিল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তায় কতটা ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়নের সাফল্য শুধু আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে মাপা যায় না। মাপতে হয় মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত, তা দিয়ে।
আধুনিকায়ন কি রাজনৈতিক সংস্কারের বিকল্প
বিন সালমান সৌদি সমাজে নানা পরিবর্তন এনেছেন। কিন্তু সামাজিক পরিবর্তন আর রাজনৈতিক সংস্কার এক বিষয় নয়। বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো যায়। বিদেশি শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো যায়। সিনেমা হল চালু করা যায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা যদি এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত থাকে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ না বাড়ে, তবে আধুনিকায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ড এই শাসনব্যবস্থার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। খাসোগি ছিলেন সৌদি সরকারের সমালোচক। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার নেতার ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকে না। থাকে প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিতে। বিচারব্যবস্থা স্বাধীন কি না, প্রশাসন জবাবদিহির মধ্যে আছে কি না, সংবাদমাধ্যম সত্য প্রকাশ করতে পারে কি না—এসবও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব কোথায়
সৌদি আরবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মক্কা ও মদিনা মুসলমানদের পবিত্রতম দুই স্থান। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে দেশটির ধর্মীয় মর্যাদা অনন্য। এই মর্যাদা সৌদি আরবকে শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
কিন্তু সেই অবস্থান ধরে রাখতে শুধু অর্থ ও সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৈতিক নেতৃত্ব, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সংকটে কার্যকর ভূমিকা।
গাজায় ইসরায়েলি হামলা, লেবাননে সংঘাত এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার সময় সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রিয়াদের কৌশলের অংশ হতে পারে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সমন্বয় করতে না পারলে সৌদি নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় আছে। মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দাবি করলেই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, সংঘাত নিরসনে কার্যকর ভূমিকা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এতে বিন সালমান চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্বের মুসলমানদের একটি বড় অংশই তাকে ভিলেন হিসেবে দেখে।
ইতিহাসের সতর্কবার্তা
চতুর্দশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমা গ্রন্থে রাজবংশের উত্থান ও পতন বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর মতে, ক্ষমতার প্রতিষ্ঠাতারা সাধারণত কঠোর পরিশ্রম, সংহতি ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বিলাসিতা বাড়লে এবং শাসকগোষ্ঠী জনগণ ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সেই শক্তি ক্ষয় হতে পারে। এই বিশ্লেষণ সৌদি আরবের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তৈরি করে।
সৌদি রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশটির অর্থনীতি, রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, জনগণের আস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর। বিন সালমান ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন। এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে; কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের দায়ও তখন মূলত তার নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়।
সৌদি শাসকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তারা অকল্পনীয় ভোগবিলাসে জীবন কাটান; নৈতিকতার ন্যূনতম মূল্য নেই তাদের কাছে। আর এমনটি হলে পতন তো হবেই। যার নৈতিক বল থাকে না, সে কখনো সাহসী হয় না। বিন সালমানের অবস্থা একই হয়েছে। তার রয়েছে অনেক প্রাসাদ, কিন্তু নিরাপত্তা নেই।
পতন নয়, পরিবর্তনই সমাধান
সৌদি আরব ভেঙে যাবে, রাজতন্ত্রের অবসান হবে কিংবা বিন সালমানের পতন অনিবার্য, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না। দেশটির বিপুল সম্পদ রয়েছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে। সংকট মোকাবিলার সামর্থ্যও শেষ হয়ে যায়নি।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি উপেক্ষার সুযোগ নেই। ইয়েমেনের যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত, নিরাপত্তার দুর্বলতা, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সৌদি আরবকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
বিন সালমানের সামনে এখন দুটি পথ। প্রথমটি হলো, আরও সামরিক শক্তি ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা। দ্বিতীয়টি হলো, ভুল কৌশলের পর্যালোচনা, কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বাস্তববাদী হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়ানো।
সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—কোন পথটি বেছে নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর। কারণ কোনো রাষ্ট্রকে কেবল বাইরের শত্রু দুর্বল করে না। ভুল নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের আস্থা হারানোও একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিতে পারে।
মোহাম্মদ বিন সালমান যদি এই সত্য উপলব্ধিতে ব্যর্থ হন, তবে তার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হতে পারে পুরো সৌদি আরবকে।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন