প্রবাসী বাংলাদেশিদের কেউ কারাবন্দী হয়ে পড়লে সেটা কেবল তার বিপদ হিসেবে থাকে না; তখন পরীক্ষা উপস্থিত হয় স্বদেশের সঙ্গে তার সম্পর্কের। কী অভিযোগে আটক, মামলা কোন পর্যায়ে, আইনজীবীর সহায়তা পাচ্ছেন কিনা—এসব জানা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব তার দেশের রয়েছে বৈকি।
সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী থাকার খবর তাই নিছক পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের কনস্যুলার সেবার সক্ষমতা আর অভিবাসন ব্যবস্থার জবাবদিহিও। হালে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে প্রশ্নটি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলাটির রায় ও সংশ্লিষ্ট নথি চাওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। তবে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এসব পেয়েই বা কী হবে? বিদেশি কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের মামলা নিবিড়ভাবে অনুসরণ, গুরুদণ্ডের ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং পরিবারকে নির্ভরযোগ্য তথ্য জোগানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এখন সেই প্রশ্ন বরং বেশি করে সামনে আনা দরকার।
বাংলাদেশ কনস্যুলেটের নথি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দীদের তালিকায় আলোচিত দুজনের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও ছিল পৃথক। এই অসংগতি দুটি প্রশ্ন সামনে আনে—মামলায় প্রকৃত অভিযোগ কী ছিল আর বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দণ্ড বিষয়ে কখন ও কীভাবে অবহিত হয়?
বিদেশে আটক ব্যক্তির কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশনে নির্দেশনা রয়েছে। আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে জানানোর নিঃশর্ত বাধ্যবাধকতাও নেই। অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশি কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কিনা, সেই সুযোগ মিলেছিল কিনা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কনভেনশনের অধীনে কী দায়িত্ব পালন করেছে—এসব যাচাই ছাড়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের কাজ অনুমাননির্ভর অভিযোগ তোলা নয়; বরং প্রমাণ সংগ্রহ, অসংগতির ব্যাখ্যা চাওয়া এবং প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো।
বাংলাদেশ পক্ষের নিজস্ব দায়িত্বের প্রশ্নটি কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের গুরুদণ্ডের তথ্য শনাক্ত করা যায়নি কেন, এর নিবিড় পর্যালোচনা দরকার। সংশ্লিষ্ট মিশনের হাতে কী তথ্য ছিল, কোন পর্যায়ে হালনাগাদ হয় এবং তথ্যের ঘাটতি দেখা দিলে অনুসন্ধানের নির্ধারিত পদ্ধতি ছিল কিনা—এসব যাচাই ছাড়া কাউকে দায়ী করা যাবে না। প্রশাসনিক পর্যালোচনার প্রয়োজন অবশ্য অনস্বীকার্য।
সবচেয়ে জরুরি হলো, বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে সুসমন্বিত নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা। সৌদি আরবসহ শ্রমগন্তব্য দেশগুলোয় আটকদের নাম, আটকের তারিখ, অভিযোগ, মামলার পর্যায়, দণ্ড, আপিলের সুযোগ এবং কনস্যুলার যোগাযোগের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। গুরুতর মামলার জন্য পৃথক সতর্কতাব্যবস্থাও প্রয়োজন, যাতে কোনো মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটলে মিশন দ্রুতই তা শনাক্ত করতে পারে।
এজন্য শুধু তথ্যভান্ডার যথেষ্ট নয়। দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল, আরবি ভাষায় দক্ষ কর্মকর্তা, মামলার তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং আইনি সহায়তার বাজেট থাকতে হবে। নির্ভরযোগ্য অভিবাসী অধিকার সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা যায়। সরকার প্রতি ছয় মাসে বিদেশে আটকদের নিয়ে সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট স্বজনদের জানাতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদন কোথায় জনবল, অর্থ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো দরকার, সেটা নির্ধারণেও সহায়ক হবে।
সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের সবার পরিস্থিতি এক নয়। কেউ অভিযোগের মুখোমুখি, কেউ বিচারাধীন, কেউ সাজাপ্রাপ্ত। তাদের সবাইকে অপরাধী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অভিযুক্তদের যথাসম্ভব সুরক্ষার দায়ও সরকারকে নিতে হবে। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এ-সংক্রান্ত নথি পাওয়া দিয়ে সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে না। ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি মামলায় পড়লে সেটা সম্পর্কে সময়মতো জানা, সে ক্ষেত্রে আইন ও রীতিসম্মত সহায়তা জোগানো এবং ওই সময়টায় তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সেই সাফল্য।