প্রায় এক দশক ধরে সৌদি আরবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। এসময়ে দেশটিতে নানা সংস্কার করেছেন তিনি। সৌদি আরবকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ তাঁর নেতৃত্বকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। আগামী কয়েক মাস তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এমবিএস। ওই অভিযানের মধ্য দিয়ে তিনি জানান দেন, সৌদি আরব এখন নতুন নেতৃত্বের অধীনে চলছে। অথচ সেই হুতিদের হামলায় এবার রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর আক্রান্ত হয়েছে। এতে ১২ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ফ্লাইট বাতিল ও অন্য পথে চালাতে হয়েছে।
এই হামলা সৌদি জনগণের সঙ্গে সালমানের নেতৃত্বের যে সমঝোতা, তাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল—মানুষ তাঁকে সমর্থন ও আনুগত্য দেখাবে, বিনিময়ে রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও সংস্কার।
তবে সৌদি আরব শাসন করা সহজ নয়। দেশটির মানুষের গড় বয়স মাত্র ২৫ বছর। তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা অনেক, পাশাপাশি রয়েছে নানা অসন্তোষও। এমবিএস চেয়েছিলেন, সৌদি আরবকে এমন একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে, যেখানে মানুষ নিরাপদে থাকবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারবেন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ইরান আশপাশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, যার মধ্যে সৌদি আরবও ছিল। এতে দেশটির তেল অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলার হতে পারে।
এরপর হুতিরা দেখিয়েছে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও তাদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে একাধিকবার হামলা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম বিমানবন্দরেও আঘাত হানা হয়েছে। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তবে এতে কেউ হতাহত হননি।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। দেশটি মোট দেশজ উৎপাদনের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে। তারপরও বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো তিন দিক থেকে সৌদি আরবে হামলা চালাতে পারে। রাজনৈতিক কারণে দেশটির সামরিক বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে এবং কমান্ডব্যবস্থাও পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত নয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ইরান ও হুতিদের ব্যবহার করা ড্রোন তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সংখ্যায় বেশি। এসব ড্রোন ধ্বংস করতে সৌদি আরবকে পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রতিটি হামলা ঠেকাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সৌদি আরবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। কিছু স্কুলে অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।
এ পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও সতর্ক করে তুলতে পারে। চলতি মাসের শেষ দিকে সৌদি আরবে ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে বড় একটি বিনিয়োগ সম্মেলন হওয়ার কথা। আগের বছরগুলোর মতো এবারও প্রভাবশালী অতিথি ও বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। কারণ, বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন দেশে অর্থ ঢালতে চান না, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়েছে সৌদি আরব। গত বছর বিনিয়োগ বেড়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ ১৭ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ, দেশটির অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ করার যে প্রতিশ্রুতি মোহাম্মদ বিন সালমান দিয়েছেন, তা পূরণ করতে তাঁকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
সৌদি আরবের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনা এমবিএসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য নতুন শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি। বিশেষ করে তরুণদের জন্য আধুনিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি।
কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেলে এসব পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, সব তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মতো আর্থিক সক্ষমতাও সরকারের নেই। রাষ্ট্রের ওপর ইতোমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপ রয়েছে।
এ বছর সৌদি আরবের বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তেল অবকাঠামো ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে দেশটির অর্থনীতিও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমতে পারে। এর অন্যতম কারণ তেল খাতে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ কমার আশঙ্কা।
এদিকে, ব্যাংকঋণের বড় অংশ যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। আগস্টে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ বৃদ্ধির হার বেসরকারি খাতের তুলনায় তিন গুণ ছিল। এতে বেসরকারি খাতের বিকাশ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এমবিএসের একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। দেশকে আধুনিক করার জন্য নেওয়া সংস্কারগুলোও ধরে রাখতে হবে তাঁকে।
তাঁর নেতৃত্বে পুরুষ অভিভাবকত্বসংক্রান্ত কিছু আইন শিথিল করা হয়েছে। নারীরা গাড়ি চালানোর সুযোগ পেয়েছেন এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এসব পরিবর্তন এখন সৌদি সমাজে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
তবে সৌদি শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভেতরের ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। এমবিএসের সংস্কারগুলো একদিকে তাঁর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অন্যদিকে এসব পরিবর্তনের বিরোধিতাকারীদের একত্রিত হওয়ার কারণও হতে পারে।
সৌদি আরব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। তারপরও দেশটির শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে জনগণের সমর্থন ও সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আধুনিক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতির প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখা এমবিএসের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ‘অভিন্ন’। অর্থাৎ, এই অঞ্চলের একটি দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশগুলোর নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও একই বক্তব্য দিয়েছেন।
এটি ইঙ্গিত দেয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চাইছে।
এমবিএসের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও একটি পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। গত মাসে সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলে দেওয়া বার্ষিক ভাষণে তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বদলে অতীত ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের কথা বেশি তুলে ধরেন।
মরুভূমিতে নতুন ঝলমলে শহর গড়ার স্বপ্নের কথা না বলে তিনি দাবি করেন, তাঁর পরিবার তিন শতাব্দী ধরে শাসন পরিচালনায় ধারাবাহিক নীতি অনুসরণ করেছে। তিনি সেই ঐতিহ্যই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন।
বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর তরুণ নেতা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ বিন সালমান এত দিন আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনের প্রতীক হতে চেয়েছেন। কিন্তু নিজের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে এখন তাঁকে পূর্বসূরিদের মতো ঐতিহ্য ও শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতার ওপর বেশি জোর দিতে দেখা যাচ্ছে।
নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সংস্কার—এই তিন ক্ষেত্রেই এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে সৌদি যুবরাজ। পরিস্থিতি সামাল দিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারাই আগামী মাসগুলোতে তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
- মিহির শর্মা: ব্লুমবার্গের কলামিস্ট