১) শায়খুলহিন্দ থেকে শায়খুল হাদীস:
আমি যখন গত দুবছর আগে জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুনির কাসেমী সাহেবের অনুরোধে সেখানে খণ্ডকালীন বুখারী শরীফের দরস দেওয়ার জন্য নিয়োজিত হয়েছিলাম তখন এক আশ্চর্যজনক ও ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হই । শিক্ষাবর্ষের শেষে খতমে বুখারীর জন্য বারিধারার মুহ্তামিম হযরত মাওলানা মুনির কাসেমী এবং মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী গিয়েছিলেন দেওবন্দে হযরত আরশাদ মাদানি হাফিজাহুল্লাহকে খতমে বুখারীর দাওয়াত দেওয়ার জন্য । তখন আরশাদ মাদানি হাফিজাহুল্লাহর সাহেবজাদাহ ক্ষুব্ধ স্বরে একটি অভিযোগের কথা শোনান । বলেন "আপনারা নাকি বারিধারা মাদ্রাসায় এমন একজন ব্যক্তিকে শায়খুল হাদিস হিসেবে নিয়োগ করেছেন, যার বাবা হযরত (হুসাইন আহমাদ) মাদানী রহিমাহুল্লাহকে গালাগালি করতেন এবং তাকফীর করতেন" । অর্থাৎ আমার আব্বাজান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহর ব্যাপারে আরশাদ মাদানী হাফিজাহুল্লাহর কান ভারি করা হয়েছিল এমন এক জঘন্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে । এমন ভয়ংকর কথা শুনে তো মুনির কাসেমী সাহেব ও হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী সাহেব স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। হযরত আরশাদ মাদানি হাফিজাহুল্লাহর সাহেবজাদাকে তারা এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে, হযরত! যার ব্যাপারে এই জাতীয় অভিযোগ করা হয়েছে তিনি এবং তার বাবা কখনোই হযরত মাদানি রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে কোন কটু কথা বা বিরূপ মন্তব্য করেননি। বাংলাদেশের কোন আলেম এমন কথা বিশ্বাসও করবে না । তিনি বাংলাদেশের সুপরিচিত শায়খুল হাদীস ।
তখন আরশাদ মাদানি হাফিজাহুল্লাহ সেই অভিযোগ উপেক্ষা করে বারিধারা মাদরাসার খতমে বুখারীর দাওয়াত গ্রহণ করেন ।
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহিমাহুল্লাহ এবং তার সন্তানদের ব্যাপারে কেমন তরো মিথ্যাচার ও ভয়ংকর রকমের অপবাদ আরোপ করা হয়ে থাকে, উপরোক্ত ঘটনা তার একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত । অথচ শায়খুল হাদীস সাহেব হযরত মাদানী রহিমাহুল্লাহর প্রতি বিস্ময়কর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য লালন করতেন ।
শায়খুল হাদীস রহিমাহুল্লাহ দুইবার বুখারী শরীফ পড়েছেন । প্রথমবার বুখারী শরীফ পড়েন হযরত যফর আহমদ উসমানী রহিমাহুল্লাহর নিকট ঢাকা বড়কাট্রা মাদ্রাসায় । আর দ্বিতীয় দফা পড়েন জামিয়া ইসলামিয়া ডাভেল মাদ্রাসায় শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহিমাহুল্লাহর নিকট। শায়খুল ইসলামের নিকট বুখারী পড়ার পরে তাঁর বাসায় এক বছর থেকেছেন বুখারীর শরাহ লেখার কাজে । সে বছর দারুল উলুম দেওবন্দের দাওরায়ে তাফসীরে ইদরীস কান্ধলভী রহিমাতুল্লাহি আলাইহের নিকট পড়েছেন আর সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে হযরত মাদানী রহিমাহুল্লাহর বুখারীর দরসেও বসেছেন ।
মাদানী রহিমাহুল্লাহর প্রতি তার ভক্তি ও আনুগত্যের দৃষ্টান্ত একটি বিষয়ের মাধ্যমে অনুধাবন করা যায় । হযরত শায়খুল হাদিস তারাবীহের ক্ষেত্রে নাবালেগের ইমামতি করার অনুমতি দিতেন । পরিবারের ছোট ছোট হাফেজ ছেলেদের হিফজ ইয়াদের সুবিধার্থে বড়দের তত্ত্বাবধানে তারাবীহের ব্যবস্থা করতেন এবং নিজেও নাবালেগের পিছনে ইকতিদা করতেন । নাবালেগের ইমামতি নিয়ে প্রশ্ন এলে দলিল হিসেবে হযরত মাদানী রহিমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি দিতেন । তিনি বলতেন যে, আমি দেখেছি হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ একজন নাবালেগ ছেলের পিছনে তারাবীহের ইকতিদা করেছেন । কারণ সেই ছেলেটি ছিল হযরত শায়খুল হিন্দ রহিমাতুল্লাহি আলাইহের নিসবতের।
এই ছিল হযরত মাদানী রাহিমাহুল্লাহর প্রতি হযরত শায়খুল হাদিসের ভক্তি এবং আনুগত্যের ধরন । অথচ এই সময়ে এসেও হযরত আরশাদ মাদানীর মতো মহান ব্যক্তির কান ভারি করতে শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহর উপর এমন জলজ্যান্ত মিথ্যা অপবাদ প্রচার করতে একটি বিশেষ অঙ্গনের নিন্দুকেরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি ।
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার জন্য একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দিচ্ছি । ১৯৮৬ সালে যখন জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া তার প্রথম পর্বে জামিয়া মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া নামে কার্যক্রম শুরু করে, তখন হযরত শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহিমাহুল্লাহর সাথে যতজন শিক্ষক ছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন তার ছাত্র ও শিষ্য। শুরু থেকেই জামিয়া রাহমানিয়া দ্বীনি অন্যান্য খিদমাতের পাশাপাশি ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনেও ভূমিকা পালন করে । তখন শায়খের ছাত্রদের মধ্যে কারোও তাতে দ্বিমত ছিল না । কিন্তু এক সময় কালের পরিক্রমায় একান্ত ছাত্র শিষ্যরাও আস্তে আস্তে বড় বড় মাশায়েখে পরিণত হলেন এবং রাজনীতি ইস্যুতে হযরত শায়খুল হাদিসের সাথে সুস্পষ্ট বিরোধে জড়ালেন । আর এই বিরোধের উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যাপকভাবে তারা হযরত হাকিমুল উম্মত থানবী রহিমাহুল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ধৃতি বলতে থাকতেন । একদিন হযরত শায়খুল হাদিস রহিমাহুল্লাহ তার এককালের সেই শাগরেদদেরকে জবাবে বললেন যে, হযরত থানবী এবং হযরত মাদানী রহিমাহুমাল্লাহর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মতভিন্নতা রয়েছে । আমরা তাদের উভয়ের উস্তাদ শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহর আদর্শ অনুসরণ করবো । অর্থাৎ হযরত শায়খুল হাদিস রহিমাহুল্লাহ তার জীবনে রাজনীতি বিষয়ে প্রধাণত হযরত শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহর আদর্শের অনুসারী ছিলেন । আমরাও সেই ধারাটাকেই শক্তভাবে ধারণ করে আছি । আমাদের রাজনীতি বুঝতে হলে হযরত শায়খুল হিন্দকে বুঝতে হবে, অধ্যয়ন করতে হবে এবং তার সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে ।
২) ওলামায়ে ইসলাম ও ওলামায়ে হিন্দ:
৪৭ ও ৭১ এর পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের ওলামা অঙ্গনে মাদানী ও থানবী উভয় ধারার চমৎকার সমন্বয় হয় । জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের আলেমগণকে নিয়ে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামপন্থী আলেমগণ স্বাধীন বাংলাদেশে ঐক্যবদ্ধ কাজ শুরু করেন । সেখানে মুখ্য নেতৃত্বে থাকেন হযরত হাফেজ্জী হজুরের খাস শাগরেদ শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক । সুন্দরভাবেই চলছিল দুই ধারার আলেমদের সমন্বিত কার্যক্রম । কিন্তু হযরত হাফেজ্জী হজুর রহমতুল্লাহি আলাইহের মধ্যপ্রাচ্য সফরকে কেন্দ্র করে ওলামায়ে হিন্দপন্থীদের কারো কারো আক্রমণাত্মক বাক্যবানে জর্জরিত হন হযরত হাফেজ্জী হুজুর ও তার অনুসারীবৃন্দ। কিন্তু হযরত হাফেজ্জী হজুর এবং তার অনুসারীগণ কখনই কঠোর ভাষায় এর প্রতিউত্তর করেননি। বাংলাদেশে দেওবন্দী আলেমদের ঐক্যের যে অন্তরায় এটি তার অন্যতম কারণ । পরবর্তীতে বিষয়টি আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে । পূর্বসূরীদের মধ্যে কঠোরতা সত্বেও ইখলাস ছিল, কল্যাণকামিতা ছিল । কিন্তু পরবর্তী কিছু অনুসারী এতটাই উগ্র ও খারেজি মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে যে, তাদের বিষাক্ত জবান থেকে হাফেজ্জী হজুর শায়খুল হাদিস মুফতি আমিনী কেউই রক্ষা পায়নি । আমি ও আমরা তো নস্যি!
রাজনীতিতে আমি প্রায় তিন যুগ ধরে কমবেশি সম্পৃক্ত আছি। দীর্ঘ এই সময় ধরে রাজনীতিতে নিজের পথ চলার জন্য আমাদের পূর্ববর্তী আকাবির ওলামায়ে কেরামের পাশাপাশি সমকালীন আলেমদের মধ্যে থেকে অনেককেই বিশেষভাবে আমি অধ্যয়ন ও অনুসরণ করার চেষ্টা করি। তার মধ্যে অবশ্যই প্রথম জন হলেন আমার আব্বাজান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহ।
আব্বাজানের রাজনৈতিক জীবন বেশ দীর্ঘ। পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে জীবনের প্রায় অন্তিম সময় পর্যন্ত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনকারী দলের প্রধান হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন । কিন্তু কখনোই নিজে সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি । ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যখন আলেম উলামাদের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা হল তখন হাফেজ্জী হুজুর রহমতুল্লাহ আলাইহির প্রস্তাব ছিল যে, মাওলানা আজিজুল হককে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হোক । কিন্তু আব্বাজান সম্মত হননি । তিনি কখনোই নিজে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি ।
তবে আমি ইতিমধ্যেই জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি।
আমি আমার রাজনীতিতে বর্তমানে পাকিস্তানের কায়েদে জমিয়ত মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবকে অন্যতম অনুসরণীয় বলে মনে করি । তার রাজনীতির বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস আমার অধ্যয়নে আছে । কীভাবে সাধারণ পর্যায় থেকে একটি দলকে কৌশলী পন্থায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করেছেন । বিষয়টি আমাকে আপ্লুত করে । তাই যারা আমাদের রাজনীতিকে ক্রিটিক করেন তাদের সহজি করনার্থে আমি মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের রাজনীতি এবং তার জোট-লিয়াজোঁর ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর আহ্বান করবো ।
৩) জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষাপট:
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা যে অবস্থান গ্রহণ করেছি, তা হঠাৎ আবেগের বশবর্তী হয়ে, কোনো বিশেষ ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিংবা সাময়িক কোনো ব্যক্তিস্বার্থের বিবেচনায় গ্রহণ করিনি। বরং দীর্ঘ আলোচনা, রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা, সাংগঠনিক পরামর্শ, অতীত অভিজ্ঞতা এবং দেশের সামগ্রিক কল্যাণের বিবেচনায় আমরা আমাদের অবস্থান নির্ধারণ করেছি।
আমাদের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভূমিকা রেখেছে এবং যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে উপনীত হয়েছি, সেগুলো আলোচনায় থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের যথার্থতা বুঝতে হলে শুধু তার চূড়ান্ত অবস্থান দেখলেই হবে না; সেই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনের প্রেক্ষাপট, যুক্তি, পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও বুঝতে হবে। সেই বিবেচনা থেকেই আমাদের অবস্থানের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ ও চিন্তাভাবনা জনসমক্ষে তুলে ধরতে চাই।
৪) দেওবন্দি ধারার রাজনৈতিক ঐক্যের উদ্যোগ:
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশে সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের, বিশেষ করে আমীরে হেফাজতের আগ্রহ ছিল দেওবন্দী ধারার সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা।
সে অনুযায়ী তিনি বারবার রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিবও চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার জন্য আহ্বান করেন। কিন্তু নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামের এই ঐক্যের আহ্বানকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং সেই ডাকে সাড়া দেয়নি। ফলে পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিকল্প উপায়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
একপর্যায়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনার একপর্যায়ে জমিয়তের নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন উত্থাপন করেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরবর্তী গন্তব্য কী হবে?
জমিয়তের নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে তাঁদের অবস্থানও স্পষ্ট করেন। তাঁরা জানিয়ে দেন, বিদ্যমান দুই বড় রাজনৈতিক পক্ষ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার কোনো পরিকল্পনা থাকলে জমিয়ত সেই পরিকল্পনার সঙ্গে নেই।
অন্যদিকে, নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে জমিয়ত তাতে অংশ নিতে আগ্রহী।
এভাবে জমিয়ত শুরুতেই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে নেয়। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তৎকালীন মনোভাব ছিল বিএনপির প্রতি অত্যন্ত বিরোধিতাপূর্ণ। এই কঠোর বিএনপিবিরোধী অবস্থান ধীরে ধীরে তাদেরকে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
একপর্যায়ে দেওবন্দী ধারার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে পেছনে রেখেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের চরমোনাই সফর, সেখানে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সদলবলে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—এসব ঘটনা দুই দলের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রকাশ্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
মাঠপর্যায়ে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে থাকে। উভয় দলের কর্মীরা পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতীককে একসঙ্গে ধারণ করে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তাদের শিল্পিরা ঐক্যের সুমহান গানের সুর ধরেন।
এভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তখনো বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করছিল।
৫) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সামনে তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোন পথে এগোলে বাংলাদেশের রাজনীতি, ইসলামপন্থী রাজনীতি এবং আলেম সমাজের রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য অধিকতর কল্যাণকর ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হবে?
আমরা বিষয়টিকে কেবল কোনো একটি দলের সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্ন হিসেবে দেখিনি। বরং এর সঙ্গে জড়িত ছিল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা, আমাদের নিজস্ব সাংগঠনিক অগ্রগতি এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই বিবেচনা থেকে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়ো করিনি। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছি।
প্রথমে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নির্বাহী পরিষদে বিষয়টি আলোচনা করা হয়। সেখানে অধিকাংশ নির্বাহী সদস্যের মতামত একটি নির্দিষ্ট দিকের প্রতি ইতিবাচক ছিল।
এরপর মজলিসে শূরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় দুই শতাধিক দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের সামনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ ও বিকল্পগুলো তুলে ধরে আলোচনা করা হয়। কিন্তু আমরা শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মতামতের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইনি। কারণ একটি বৃহৎ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তৃণমূলের অভিজ্ঞতা, মতামত ও উপলব্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সে কারণে পরবর্তী পর্যায়ে সংগঠনের সর্ববৃহৎ ফোরাম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। সেখানে দেশের সব অঞ্চলের এবং প্রায় সকল থানা ও উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এই অধিবেশনে প্রায় দেড় হাজার দায়িত্বশীল উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সামনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিকল্পগুলো তুলে ধরে মতামত ও পরামর্শ চাওয়া হয়।
উপস্থিত দায়িত্বশীলদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিলেন দেওবন্দী ধারার আলেম। অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় দেওবন্দী ধারার আলেম সমাজের একটি বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বশীল অংশের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে।
আমরা বিভিন্ন সম্ভাব্য পথের সুবিধা-অসুবিধা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব বিবেচনা করেছি। এরপর সর্বশেষ পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত নির্বাচনী ঐক্যে অংশগ্রহণ করাই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও আমাদের অনুসৃত ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য অধিকতর কল্যাণকর হবে।
সুতরাং, এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির একক ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। এটি প্রায় দেড় হাজার দায়িত্বশীলের পরামর্শ, সাংগঠনিক আলোচনা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের যথার্থতা মূল্যায়নের সময় এই প্রক্রিয়াটিকে অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
৬) নির্বাচনী আসন বণ্টন নিয়ে আমাদের কৌশল ও অতীত অভিজ্ঞতা:
ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী জোট গঠনের আলোচনা যখন আসন বণ্টনের পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একটি বাস্তবতাভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করে।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা ছিল, জোটের আলোচনায় নিজেদের বাস্তব সক্ষমতা ও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক বেশি আসন দাবি করলে অনেক সময় এমন আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা থাকে না । এতে শুধু নির্বাচনী ফলাফলই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক সম্ভাবনাও ধ্বংস হয় ।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, জোট গঠনের আলোচনায় অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘ প্রার্থীতালিকা উপস্থাপন করব না। বরং যেসব আসনে আমাদের বাস্তব সাংগঠনিক ভিত্তি, গ্রহণযোগ্যতা ও নির্বাচনী সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেসব আসনকে অগ্রাধিকার দেব।
সে অনুযায়ী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রাথমিকভাবে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫টি আসনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করে। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের শক্তিশালী আসনগুলোতে নির্বাচন করা এবং জোটের অংশীদারদের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানো।
আমরা প্রথমে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে বিষয়টি সমন্বয়ের চেষ্টা করি এবং আমাদের প্রার্থী তালিকা তাদের কাছে হস্তান্তর করি।
কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সামনে তাদের নিজেদের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে।
একপর্যায়ে তাদের মধ্যকার এই আলোচনা জটিল আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ৫০ নাকি ১০০ আসন- এ নিয়ে দরকষাকষির মতো বিভিন্ন প্রশ্নে তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত আসন বণ্টন নিয়ে তাদের পারস্পরিক সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
এদিকে, ইসলামপন্থী দলগুলোর একটি সম্মিলিত নির্বাচনী জোট গঠনের আলোচনা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা দেশের মানুষের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও মানসিকতা তৈরি করেছিল। অনেকেই ইসলামপন্থী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। এমন একটি পরিস্থিতিতে, নির্বাচনী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা দরকার। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দরকষাকষি চলছিল। ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রায় পৌণে তিনশ আসনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আসনসংক্রান্ত দাবির একটি বড় অংশ নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমন্বয়ের অগ্রগতিও হয়ে গিয়েছিল। সে কারণে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে বিপুলসংখ্যক আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়নি।
ফলে কিছু আসনের বিষয়ে সমন্বয় তখনো চলমান থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সীমিতসংখ্যক ৭০টির মত আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যখন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় , তখন তাদের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
৭) শুধু দুটি দলের সমঝোতা কেন আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না:
১১-দলীয় নির্বাচনী জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের পর তারা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে।
আমরা তাদের কাছে আমাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরি। আমরা বলি, যেভাবে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে দলীয়ভাবে প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অবস্থান বিবেচনা করতে হলে এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যাবে না।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। কিন্তু আমরা তাদের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ আসনেও মনোনয়নপত্র জমা দেইনি।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের এই পর্যায়ে শুধু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতা হলে দলীয় ভোটের অনুপাত ও সামগ্রিক নির্বাচনী বাস্তবতার বিবেচনায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য তা ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।
আমাদের সামনে তখন শুধু তাৎক্ষণিক নির্বাচনী সমঝোতার প্রশ্ন ছিল না; বরং দলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ইসলামপন্থী রাজনীতিতে আমাদের নিজস্ব অবস্থান সংরক্ষণের প্রশ্নও ছিল।
সেই সামগ্রিক বিবেচনা থেকেই আমরা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু দ্বিপক্ষীয় নির্বাচনী সমঝোতায় আবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে বৃহত্তর নির্বাচনী ঐক্যে থাকার সিদ্ধান্তে অটল থাকি।
আমাদের এই সিদ্ধান্তটি ছিল নির্বাচনী বাস্তবতা এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বিবেচনায় নেওয়া একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
এই সময়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ দায়িত্বশীল দেশের একজন শীর্ষ আলেম ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে তাদের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করেন, ওই মুহূর্তে নির্বাচনী সমঝোতা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির জন্য এবং সামগ্রিক ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও নায়েবে আমীরের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করা হয়।
কিন্তু ততক্ষণে পীর সাহেব চরমোনাই অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে রাজি হননি।
এভাবেই নির্বাচনের সেই পর্যায়ে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে যায়। আমাদের মূল্যায়নে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্জিত রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কিংবা কোনো একটি পক্ষের প্রতি অনমনীয় মনোভাবের পরিবর্তে বাস্তবতা, দূরদর্শিতা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। নির্দিষ্ট পক্ষকে অবধারিত ধরে নিলে নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে।
৮) জুলাই বিপ্লব, জুলাই সনদ ও গণভোট: আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ভিত্তি:
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের পেছনে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা ছিল ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও অভিপ্রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন।
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের সামনে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে আমরা মনে করেছি, কেবল নির্বাচনী সমীকরণ কিংবা দলীয় স্বার্থের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ যথেষ্ট নয়। বরং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা, জুলাই সনদের প্রস্তাবনা, গণভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আমাদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কয়েকটি বিষয়:
প্রথমত, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেই অভিপ্রায় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কী?
দ্বিতীয়ত, জুলাই সনদ এবং এর প্রস্তাবনাগুলোর প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোভাব কী?
তৃতীয়ত, জুলাই সনদ-সংক্রান্ত গণভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও ভূমিকা কী ছিল?
চতুর্থত, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে কোন রাজনৈতিক দল কী ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেছে?
আমরা মনে করেছি, এসব প্রশ্ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই রাজনৈতিক জোট নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের সময় এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমরা চেয়েছি, এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে, যা শুধু তাৎক্ষণিক নির্বাচনী সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জুলাই বিপ্লবের অভিপ্রায় বাস্তবায়ন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের অবস্থান ও যুক্তি ব্যাখ্যা করার জন্য আমি ইতিমধ্যে ‘জুলাই কেন আমাদের লড়াই?’ নামে একটি পুস্তিকাও লিখেছি।
অতএব, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে যথাযথভাবে বুঝতে হলে এই পুস্তিকায় উত্থাপিত বক্তব্য, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জুলাই সনদ ও গণভোটসংক্রান্ত আমাদের বিবেচনাগুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আমরা চাই, আমাদের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হোক, যুক্তিতর্ক হোক। কিন্তু সেই সমালোচনা যেন বাস্তব তথ্য, দ্বীনী ও রাজনৈতিক যুক্তি এবং কল্যাণের আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
৯) গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান:
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা করা হচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা সমালোচনাকে অস্বাভাবিক মনে করি না। বরং আমরা মনে করি, যুক্তিনির্ভর সমালোচনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করতে এবং ভুলত্রুটি সংশোধন করতে সহায়তা করে।
আমার প্রত্যাশা ছিল, আমি ব্যক্তি মামুনুল হক নয়, বরং আমাদের দলের পক্ষ থেকে যে রাজনৈতিক অবস্থান উপস্থাপন করেছি এবং তার পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছি, সেগুলো নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হবে।
কেউ যদি মনে করেন, আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল, তাহলে তিনি আমাদের যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করতে পারেন। আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার দুর্বলতা তুলে ধরতে পারেন। জুলাই বিপ্লব, জুলাই সনদ, গণভোট, নির্বাচনী বাস্তবতা কিংবা ইসলামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের প্রশ্নে আমাদের মূল্যায়নের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা অনেক ক্ষেত্রে যুক্তিনির্ভর সমালোচনার পরিবর্তে গায়ের জোর, ব্যক্তির নাম কিংবা প্রভাবের মাধ্যমে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি।
"জুলাই কেন আমাদের লড়াই?"-এ উপস্থাপিত বক্তব্যগুলোর কোনো যৌক্তিক সমালোচনা কেউ করেছে?
আমরা মনে করি, রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পরিচিতি, জনপ্রিয়তা কিংবা প্রভাবকে যুক্তির বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো উচিত নয়। একজন ব্যক্তি যত বড় নেতা বা যত সম্মানিত ব্যক্তিত্বই হোন না কেন, তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও সিদ্ধান্তও যুক্তির আলোকে পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
একইভাবে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতো একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সিদ্ধান্তও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার ভুলগুলো তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরা হোক। আমাদের মূল্যায়নে অসংগতি থাকলে তা চিহ্নিত করা হোক। আমাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার বিপরীতে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হোক।
আমরা এসব আলোচনাকে স্বাগত জানাই।
কিন্তু কোনো দলের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা, ব্যক্তির নাম ও প্রভাব ব্যবহার করে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা কিংবা যুক্তির পরিবর্তে আবেগনির্ভর আক্রমণ চালানো সুন্দর চিন্তা নয়।
তাই আমরা সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে কার্যকরভাবে সমালোচনা করতে চাইলে আমাদের উত্থাপিত যুক্তিগুলোর যথাযথ বিশ্লেষণ করুন। আমাদের সিদ্ধান্তের বিপরীতে যুক্তি উপস্থাপন করুন। আমরা কেন এই অবস্থান নিয়েছি, তার বিপরীতে আপনারা কেন ভিন্ন অবস্থানকে অধিকতর সঠিক মনে করেন, তা তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করুন।
১০) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের উদারনৈতিক জোটনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোট রাজনীতির ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে চায়।
আমাদের কাছে জোট রাজনীতি শুধু নির্বাচনের সময় কয়েকটি দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগির বিষয় নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক বিকাশ, নিজস্ব রাজনৈতিক ধারার অগ্রগতি, নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমরা মনে করি, কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব স্বকীয়তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে তাকে উদারনৈতিক ও বাস্তবতাভিত্তিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে হবে।
সেই বিবেচনায় আমরা বিদ্যমান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কোনো একটির ব্যাপারে আগাম এমন অনড় সিদ্ধান্ত নিতে চাই না যে, শুধু তাদের সঙ্গেই আমরা নির্বাচনী জোট করব, কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে কোনো পরিস্থিতিতেই জোটে যাব না।
আমাদের বিবেচনায়, এ ধরনের চূড়ান্ত ও একপাক্ষিক অবস্থান অনেক সময় রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক কল্যাণের পথকে সংকুচিত করে দেয়। পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে কোনো পক্ষের প্রতি স্থায়ী অনুরাগ কিংবা স্থায়ী বিরাগ পোষণ করা দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল নয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এ ধরনের অনমনীয় অবস্থানকে অনেক ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী বলে মনে করে।
আমরা বরং মনে করি, একটি রাজনৈতিক দলকে তার মৌলিক আদর্শ ও নীতিগত অবস্থানে দৃঢ় থাকতে হবে; কিন্তু সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা, উদারতা ও বাস্তবতাবোধের পরিচয় দিতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একটি বিষয়ে মতৈক্য থাকলেই সব বিষয়ে একমত হতে হবে, এমন নয়। আবার কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেই সব ধরনের রাজনৈতিক সহযোগিতার পথ বন্ধ করে দিতে হবে, এমনটিও নয়।
রাজনীতিতে আদর্শগত অবস্থান ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। আদর্শের প্রশ্নে আপস না করেও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা ও সমঝোতার সুযোগ থাকতে পারে।
আমরা মনে করি, এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি রাজনৈতিক দলকে তার নিজস্ব স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়।
১১) আমাদের রাজনৈতিক পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা:
জোট রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ নতুন কোনো চিন্তা নয়। বরং আমাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের অনুসৃত রাজনৈতিক নীতি থেকেও আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি।
এ ক্ষেত্রে আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করি কায়েদে ইসলাম হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ.
খতিবে আজম হযরত মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ., শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এবং মুফতি আমিনী রহ. প্রমুখের রাজনৈতিক ভূমিকা ও অভিজ্ঞতাকে।
একই সঙ্গে পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব, কৌশল এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তাঁর ভূমিকা থেকেও আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি।
আমাদের দৃষ্টিতে, এসব ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য কখনো সমঝোতা, কখনো সহযোগিতা, কখনো বিরোধিতা এবং কখনো স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। কোন পরিস্থিতিতে কোন পথ গ্রহণ করা উচিত, সেটি নির্ধারণ করতে হয় বাস্তবতা ও সামগ্রিক কল্যাণের বিবেচনায়।
আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা গ্রহণ করি যে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি অন্ধ আনুগত্য কিংবা কোনো পক্ষের সঙ্গে সব পরিস্থিতিতে সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা একটি রাজনৈতিক দলের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করতে পারে। বরং আদর্শিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বাস্তবতাবোধ এবং দূরদর্শিতার সমন্বয়ের মাধ্যমেই একটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জোটনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা এই শিক্ষাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছি।
১২) আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মূল কথা:
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে বুঝতে হলে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, আমাদের সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা নেওয়া হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের পরামর্শ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনার প্রক্রিয়া।
দ্বিতীয়ত, আমরা দেওবন্দী ধারার রাজনৈতিক ঐক্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করি। কিন্তু ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু আবেগ কিংবা সাময়িক ঘনিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়। ঐক্যের লক্ষ্য, রাজনৈতিক গন্তব্য, নির্বাচনী কৌশল এবং অংশীদারদের পারস্পরিক সৌহার্দও থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, নির্বাচনী আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে আমরা বাস্তবতাভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করেছি। নিজেদের প্রকৃত সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে সীমিতসংখ্যক আসনে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে আমাদের সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সম্ভাবনার সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়।
চতুর্থত, জুলাই বিপ্লবের অভিপ্রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ, গণভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে আমরা আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছি।
পঞ্চমত, আমরা মনে করি, একটি রাজনৈতিক দলকে তার আদর্শে দৃঢ় থাকতে হবে, কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে উদারতা, বাস্তবতাবোধ ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। কোনো পক্ষের সঙ্গে আগাম স্থায়ী জোট কিংবা স্থায়ী বিরোধিতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে দেশের সামগ্রিক কল্যাণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া অধিকতর যুক্তিসংগত।
ষষ্ঠত, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে কেউ সমালোচনা করতে পারেন। আমরা গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও বিশ্লেষণনির্ভর।
আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণিত হয় তার পেছনের যুক্তি, বাস্তবতা ও পরিণতির আলোকে—কোনো ব্যক্তির প্রভাব, পরিচিতি কিংবা সামাজিক চাপের মাধ্যমে নয়।
১৩) উপসংহার:
বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই সময়ে আমাদের দায়িত্ব হলো শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, ইসলামপন্থী রাজনীতির বিকাশ, আলেম সমাজের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সেই বিবেচনা থেকেই তার রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করেছে।
আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি দীর্ঘ আলোচনা, সাংগঠনিক পরামর্শ, রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কল্যাণের বিবেচনায় গৃহীত অবস্থান। আমরা সেই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে প্রস্তুত, গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করতে প্রস্তুত এবং দেশের সামগ্রিক কল্যাণের স্বার্থে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংলাপে অংশ নিতে প্রস্তুত।
এটাই আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মূল কথা।
বিঃদ্রঃ পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীগণ লিখিত এই বক্তব্যটিকে প্রিন্ট করে কিংবা পুস্তিকা আকারে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে পারেন।