Image description

বাংলাদেশে কিছুদিন আগেও ‘ফ্যাসিবাদ’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দই বেশি আলোচিত ছিল। সেই জায়গা এখন ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ বা ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে যে, এই কালচারাল ফ্যাসিস্ট আসলে চেনা যায় কীভাবে?

বর্তমান দুনিয়ায় ফ্যাসিবাদের লক্ষণ বহুবিধ, বৈচিত্র্যময়। ইতালি, জার্মানির ৭০/৮০ বছর আগেকার হিসাব এখন পাল্টে গেছে অনেকটাই। ফলে ফ্যাসিবাদের লক্ষণও বদলে গেছে, বদলাচ্ছে। তাই কালচারাল ফ্যাসিস্ট চিনতে হলে, ফ্যাসিস্ট চিনতে হয় আগে। সেটি চেনা গেলে কালচারাল ফ্যাসিস্ট চেনাটা সহজ হয়ে যায়।

 

কালচারাল ফ্যাসিজম চেনার আগেও তাই ফ্যাসিজম চেনা দরকার। ফ্যাসিজমের লক্ষণ নিয়ে নানা বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন। এখানে আমরা উল্লেখযোগ্য কিছু লক্ষণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার চেষ্টা করব। এক্ষেত্রে উমবের্তো একো’র রচনায় চোখ বোলানো হবে। এই বিখ্যাত দার্শনিক ও সাহিত্যিক মুসোলিনির দেশেরই মানুষ এবং মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘উর-ফ্যাসিজম’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। ওই বছর দ্য নিউইয়র্ক রিভিউয়ের ২২ জুন সংখ্যায় এটি প্রকাশিতও হয়েছিল। এর আগে একই বছরের এপ্রিল মাসে উমবের্তো কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে এই ডিসকোর্স নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এই বক্তব্যে উমবের্তো একো ইতালির ফ্যাসিবাদ নিয়ে যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন, ঠিক তেমনি ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থাকে চেনার সুবিধার্থে কিছু লক্ষণ বা চিহ্নের উল্লেখ করেছিলেন।

 

নব্যফ্যাসিবাদের এখনকার যুগে সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে স্প্রিঙ্গার নেচারে। শিরোনাম হলো–‘ফ্যাসিস্ট কালচারাল প্র্যাকটিসেস ইন দ্য টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’। গবেষণাটি করেছেন ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পারা-এর ইমানুয়েল জাগুরি তোরিনো, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের আইএসইউ বরবা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটির ট্রেসি এম সিহান। এই তিন গবেষক মিলে একুশ শতকের কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রকৃতি এবং এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। এবং এই গবেষণাপত্রে সেই চিহ্নিতকরণের কাজটি মূলত করা হয়েছে উমবের্তো একো’র উল্লেখ করা ওইসব লক্ষণ বা চিহ্নের ওপর ভিত্তি করেই। আমরা ক্রমে সেই আলোচনাতেই যাব।


উমবের্তো একো’র দেখানো লক্ষণগুলো কী

‘উর-ফ্যাসিজম’-এ ফ্যাসিবাদ চেনার মোট ১৪টি বৈশিষ্ট্যের কথা উমবের্তো লিখেছিলেন। সেগুলো হলো:

১. ফ্যাসিস্টরা বরাবরই ঐতিহ্যের চেতনাধারী হন, ঐতিহ্যের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। একো বলেছেন, ফ্যাসিবাদের চেয়ে অনেক বেশি পুরনো মতবাদ হলো ঐতিহ্যবাদ। তার কথায়, “প্রতিটি ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের সিলেবাস ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই প্রধান ঐতিহ্যবাদী চিন্তকদের খুঁজে পাওয়া যাবে।” এই বৈশিষ্ট্যের কারণে ফ্যাসিস্টদের শেখার প্রক্রিয়ায় কোনো উন্নতি আসে না। কারণ একোর মতে, এক্ষেত্রে সত্য সবার জন্য একবারই উচ্চারিত হয় এবং এ দিয়ে বোঝানো অস্পষ্ট বার্তাকেই বারংবার নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।

 

২. আধুনিকতাকে বর্জনের চিহ্ন দেখা যায় পুরোপুরি। ঐতিহ্যবাদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই এটি হয়। একো বলেছেন, “জ্ঞানের মাধ্যমে আলোকিত হওয়া, যুক্তির যুগকে ফ্যাসিস্টরা আধুনিক ভ্রষ্টাচারের শুরু হিসেবে মনে করে থাকে।” ফলে বারবার উচ্চারিত হতে থাকে ‘যুক্তিতে মুক্তি মেলে না’ ঘরানার বক্তব্য। সেদিক থেকে ফ্যাসিজমে যুক্তি পাত্তা পায় না একেবারেই। তাই অযৌক্তিকতার তুমুল ব্যবহারও ফ্যাসিজমের একটি অন্যতম লক্ষণ।

 

৩. এই অযৌক্তিকতার চর্চার কারণে দেখা দেয় প্রতিক্রিয়াশীলতা। এক্ষেত্রে সত্যিকারের মৌলিক ক্রিয়ার দেখা মেলে না। শুধুই একটি ঘটনা ঘটেছে বলেই আরেকটি ঘটনা ঘটানো হয়। উমবের্তো একো বলেছেন, “যেকোনো ক্রিয়ামূলক কর্মকাণ্ড তার নিজস্বতায় সুন্দর হয়ে ওঠে। এটি সম্পাদন করতে হয় পূর্ববর্তী কোনো কাজের প্রতিফলন ব্যতিরেকে।” আর এরই অভাব প্রকট হয়ে ওঠে ফ্যাসিজমে। এ ব্যবস্থায় বুদ্ধিজীবী মহলের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তৈরি করা হয়। অপছন্দের বুদ্ধিজীবীদের ‘মাথামোটা’সহ আরও নানা অপমানজনক উপাধি দেওয়া হয়ে থাকে ফ্যাসিস্টদের পক্ষ থেকে। ফ্যাসিস্টদের নিয়োগকৃত বুদ্ধিজীবীরা তখন আধুনিক সংস্কৃতি ও উদারনৈতিক অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করতেই সবটা সময় ব্যয় করে থাকেন।

 

৪. ফ্যাসিজমের নীতির সঙ্গে একমত না হলেই বিশ্বাসঘাতক বলে ডাকা হয়। কখনও কখনও বিরোধী পক্ষ বা বিরোধী পক্ষের দোসর প্রভৃতিও ব্যবহার করা হয়। এক কথায়, ফ্যাসিজমে দ্বিমতের কোনো স্থান নেই। ফ্যাসিস্টরা ভিন্নমত সহ্যই করতে পারেন না। ধরুন, কেউ একজন ভিন্ন মত প্রকাশ করল, সঙ্গে সঙ্গে তাকে অমুক পক্ষের লোক বা সমর্থক বা অন্যান্য উপাধি দিয়ে কোণঠাসা করে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কথায় কথায় বলে দেওয়া হয়–‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

৫. ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে আধুনিকতা চর্চার অন্যতম উপায় বলে মনে করা হয়। যখন ভিন্নমত প্রকাশিত হতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজে, মানুষে মানুষে বৈচিত্র্যের সহাবস্থান থাকে। আর এই বৈচিত্র্যকে একেবারেই মেনে নিতে পারে না ফ্যাসিস্টরা। এরা ভিন্নমত বা ভিন্ন ধরনের সবাইকেই আগন্তুক হিসেবে বিবেচনা করে। সেই হিসাবে সব আগন্তুককেই এরা মুছে ফেলতে চায়। এই প্রবণতাও ফ্যাসিজমের লক্ষণ বলে মনে করেন উমবের্তো একো। সেদিক থেকে বর্ণবাদও ফ্যাসিজমের লক্ষণ বটে।

 

৬. ফ্যাসিজমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো–এটি সামাজিক হতাশাকে উপজীব্য করে চলে। উমবের্তো একো বলেছেন, “ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিজমের অন্যতম সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো হতাশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে আবেদন উত্থাপন করা। এই শ্রেণিটি অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অপমানের শিকার হওয়ার কারণে সামাজিকভাবে হতাশ থাকে। সামাজিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপের কারণেও এরা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে।” অর্থাৎ, সামাজিকভাবে হতাশ একটি শ্রেণিকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে লড়াইয়ে টেনে আনার চেষ্টা করে ফ্যাসিস্টরা। একই সঙ্গে ব্যক্তির হতাশাকেও লড়াইয়ের অস্ত্র বানানোর চেষ্টা চলে।

 

৭. ষড়যন্ত্র ফ্যাসিজমের অন্যতম লক্ষণ। এই ব্যবস্থায় সব সময়ই ‘ষড়যন্ত্র চলছে’ বা ‘হচ্ছে’ বা ‘হবে’-সংক্রান্ত আলোচনা ফ্যাসিস্টদের মুখ থেকে শোনা যেতে থাকে। এটি ফ্যাসিস্ট মনোকাঠামোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ফ্যাসিজমের অনুসারীরা সর্বদাই ষড়যন্ত্রের ঘেরাটোপে নিজেদের বন্দী রাখতে ভালোবাসেন এবং অন্যদেরও বন্দী করতে চান।

 

৮. ফ্যাসিস্টরা ফ্যাসিজমের শত্রুকে একই সঙ্গে সবল ও দুর্বলরূপের সাধারণের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করে। এই বিতর্কটি সব সময়ই জারি থাকে। কখনো আসে প্রতিপক্ষ বা ফ্যাসিজমের শত্রুকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার তত্ত্ব। আবার তার খানিক পরেই বলা হয় প্রতিপক্ষের জুজুর ভয়াল রূপের গল্প।

৯. ফ্যাসিজমে শান্তি নিখোঁজ হয়ে যায়। এমনকি বিজ্ঞপ্তি দিয়েও তাকে খুঁজে পাওয়ার উপায় থাকে না। কারণ, ফ্যাসিস্টরা সব সময় সাধারণ মানুষকে সংগ্রামমুখর করে রাখার কাজ চালিয়ে যায়। তাদের লড়াই আর শেষ হয় না! এ বিষয়ে একো আরও বলেছেন, “ফ্যাসিজমে জীবনের জন্য সংগ্রাম নয়, বরং সংগ্রামের জন্য জীবনের যাপন হয়। এতে শান্তি পাচার হয়ে যায় শত্রুর সাথে। এটি খারাপ, কারণ জীবন তখন একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধে পরিণত হয়।” এই প্রক্রিয়ায় শত্রুপক্ষ পরাজিত হলেও সংগ্রাম কখনোই থামে না।

 

১০. ফ্যাসিজমে একটি শাসব্যবস্থাকে উৎখাত করা হয়, বল দিয়ে। কিন্তু তাতে সব পুরনো হাওয়া হয়ে যায় না। অভিজাততন্ত্র তবু টিকে থাকে এবং নতুন রূপে ফিরে আসে। এর কারণ হলো ফ্যাসিস্টরা নিজেরাই নতুন অভিজাততন্ত্রকে জনতার সামনে হাজির করে। সেই সঙ্গে তৎকালীন দুর্বল শ্রেণিকে প্রচণ্ডভাবে অবজ্ঞা করা হয়। ফলে সমাজ আর সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না। এ বিষয়ে উমবের্তো একো বলেছেন, “যেকোনো প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের ক্ষেত্রেই অভিজাতবাদ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ফ্যাসিজমে জনতুষ্টিবাদী অভিজাতবাদকে ব্যাপক সমর্থন দেওয়া হয়। ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায় থাকা নেতা জানেন যে, যে ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেন, সেটি গণতান্ত্রিক উপায়ে তার হাতে আসেনি, বরং এসেছে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। নেতা এও জানেন যে, তার দলের শক্তির ভিত্তি আসলে জনগণের দুর্বলতা। এই গণেরা এতই দুর্বল যে তাদের প্রয়োজন একজন শাসক। আবার ফ্যাসিস্ট সংগঠনের কাঠামো অনেকটা সামরিক বাহিনীর মতো করে হয়। সেখানে যেকোনো স্তরের প্রত্যেক নেতাই তার অধীনস্তদের অবজ্ঞা করে থাকে। ওই অধীনস্তরা আবার তার অধীনস্তদের অবজ্ঞা করে, হেলা করে। আর এর ফলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে গণঅভিজাতবাদের ধারণা।”

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

১১. ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায় সব সময়ই নায়ক খোঁজা হয়। হিরোইজম এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ফ্যাসিস্টরা সর্বদা কাউকে না কাউকে নায়ক হিসেবে গণের সামনে হাজির করার চেষ্টা করে। এটি হয় নানা প্রক্রিয়া। কখনো বলা হয়, ‘এই ব্যক্তি ছাড়া এটা হতো না’ বা ‘অমুককে ছাড়া মুক্তি মিলত না’ ইত্যাদি ইত্যাদি। একোর মতে, ফ্যাসিজমের প্রধান রীতিগুলোর একটি হলো হিরোইজম। এক ব্যক্তিকে সবার ওপরে, সবাইকে ছাড়িয়ে স্থাপন করা হয় ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায়। একই সঙ্গে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থায় মৃত্যুকে ব্যবহার করা হয়। যে সমাজ ফ্যাসিস্ট নয়, তাতে মৃত্যুর বিষয়টিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলা হলেও একে মর্যাদার সঙ্গে বরণ করে নেওয়ার কথা প্রচার করা হয়। অন্যদিকে ফ্যাসিজমে প্রতিষ্ঠিত নায়ক মৃত্যুকে কামনা করে, এটি হয় পরম আকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়। এক কথায়, ফ্যাসিজমের নায়কেরা মৃত্যুর জন্য অধৈর্য হয়ে ওঠে। আর এই ধৈর্যশীলতার অভাবের কারণে আরও অনেক মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

 

১২. পুরুষের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ফ্যাসিজম। যখনই পৌরুষের শক্তি প্রদর্শনের বাড়বাড়ন্ত পরিলক্ষিত হবে, জেন্ডারভিত্তিক পরিচয়ের কারণে অন্য কোনো ব্যক্তিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলবে, তখনই ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছে বলে বুঝতে হবে। বিশেষ করে নারীদের প্রতি অবজ্ঞা, তাদের নিচু করার মানসিকতা দেখানো এবং তাদের সমানাধিকারে খড়গ নেমে আসবে–তখনই সতর্ক হতে হবে। কারণ এগুলো ফ্যাসিজমের লক্ষণ।

 

১৩. উমবের্তো একো মনে করেন, নির্বাচিত বা বাছাই জনতুষ্টিবাদ ফ্যাসিজমের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। গণতন্ত্রে সাধারণত নাগরিকের নিজস্ব অধিকার থাকে। কিন্তু ফ্যাসিজমে নাগরিক বোধ করেন যে, তার নিজস্ব অধিকারই আক্রান্ত হয়েছে। নিজের অধিকারই হারিয়ে ফেলেন একজন নাগরিক, ভয় পান। তখন ‘জনগণ’ নামক একটি অস্পষ্ট সত্তাকে সামনে এনে ফ্যাসিস্টরা বলতে থাকে যে, ‘জনগণ এটি চেয়েছে’, ‘এটি জনমতের প্রতিফলন’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃহৎ একদল মানুষের কখনো সাধারণ ইচ্ছা থাকতে পারে বলে মনে করেন না উমবের্তো একো। তাঁর মতে, ফ্যাসিস্ট নেতারা জনতার ইচ্ছা বোঝার মেশিনে পরিণত হন এবং যেকোনো কিছুই ‘জনগণের ইচ্ছা’ বলে চালিয়ে দেন। একো বলেন, ‘টিভি বা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় একই গোষ্ঠীর কিছু মানুষের আবেগীয় প্রত্যুত্তরকেই জনতার কন্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপন ও গ্রহণ করে নেওয়া হতে পারে।’

 

১৪. ফ্যাসিজমে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিবোধের চর্চাকে সীমিত করে ফেলার চেষ্টা উদগ্রভাবে চলে। এ ব্যাপারে উমবের্তো একো বলেছেন, ‘জার্মানির নাৎসি বা ইতালির ফ্যাসিস্ট ধারা অনুসরণ করলে আমরা দেখব যে নিম্নমানের শব্দমালা ও খুবই প্রাথমিক বাক্যরীতি ব্যবহারের চল ছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিবোধের চর্চাকে সীমিত করা।’

 

একুশ শতকে কালচারাল ফ্যাসিস্ট কারা?

এখন যাওয়া যাক স্প্রিঙ্গার নেচারে প্রকাশিত গবেষণায়। ‘ফ্যাসিস্ট কালচারাল প্র্যাকটিসেস ইন দ্য টুয়েন্টি–ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ শীর্ষক গবেষণাটিতে তিন গবেষক একুশ শতকের কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রকৃতি এবং এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। মূলত এসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়েই কালচারাল ফ্যাসিস্টদের চিহ্নিত করা সম্ভব। এসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার সাথে সাথে সেসবের কারণে কি কি ফলাফল তৈরি হয়, সেগুলোও বর্ণনা করা হয়েছে। আর এই সব কিছুরই মূল ভিত হলো উমবের্তো একো’র দেওয়া ফ্যাসিবাদের ১৪ লক্ষণ।

 

গবেষকদের মতে, কালচারাল ফ্যাসিস্টরা প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে বাধা দেয়। বরং সমাজ ও দেশে থাকা প্রাচীন ধ্যান, ধারণার ভিতকেই আরও শক্তিশালী করা হয়। বৈচিত্র্যময় ধারণা ও আদর্শের গলা টিপে ধরে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। এবং এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আইন প্রতিষ্ঠারও দাবি জানানো হতে থাকে। যেসব রাজনৈতিক নেতারা এসবের পক্ষে থাকে, তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত করতে ভোটও চায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।

map screenshot

কালচারাল ফ্যাসিস্টরা গভীর চিন্তাকে পাত্তা দিতে চায় না। উল্টো গভীর চিন্তাভাবনা বা বিশ্লেষণকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে মনযোগ দিতে বলে অবৈজ্ঞানিক ও অগভীর চিন্তায়। বিশেষ করে যৌক্তিকতা, প্রমাণাদি, নথিপত্র—এসব কোনোভাবেই পছন্দ করে না কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।

 

প্রচলিত সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা এবং সংস্থাকে ভালো চোখে দেখে না কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। এসবকে কোণঠাসা করার জন্য নিন্দামন্দ করা জারি রাখে তারা। ভাষাগত ও শরীরী, দুই ধরণের আক্রমণই চালানো হয়, হুমকি দেওয়া হয় নিয়মিত বিরতিতে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্তির বদলে কুযুক্তির চর্চা শুরু করতে চায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। শিক্ষা কারিকুলাম সেই অনুযায়ী বদলে দেওয়ার দাবি ওঠে। একই সাথে যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিরোধী যেকোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

 

কালচারাল ফ্যাসিস্টরা কোনো কাজ করার আগে চিন্তা করাকে ‘বদভ্যাস’ বলে মনে করে। বরং শুধুই ক্রিয়ার বিপরীতে একটি প্রতিক্রিয়া হাজির করার চেষ্টা করে। স্বাভাবিকভাবে সেই প্রতিক্রিয়া হয় অনিয়ন্ত্রিত এবং একে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে রাখার ও ফেলার চেষ্টাও চালায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। কারণ তাতেই তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়। সেই সাথে কোনো জটিল সমস্যার গুরুত্ব কমিয়ে দিতে এর সবচেয়ে অযৌক্তিক, অবাস্তব ও হাস্যকর সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।

 

‘ফ্যাসিস্ট কালচারাল প্র্যাকটিসেস ইন দ্য টুয়েন্টি–ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ শীর্ষক এই গবেষণাটিতে তিন গবেষক কাজ করেছেন। এরা হলেন, ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পারা–এর ইমানুয়েল জাগুরি তোরিনো, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের আইএসইউ বরবা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটির ট্রেসি এম. সিহান। এই তিন গবেষক বলছেন, কালচারাল ফ্যাসিস্টরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম তাদের দুই চোখের বিষ। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং সেসব সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য একটি অনিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা চালায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। এর বদলে শুনতে চায় কেবলই নিজেদের পক্ষের কথা এবং সেই পথেই সব সংবাদমাধ্যমকে চলতে বাধ্য করতে চায়। সেই সাথে নিজেদের পক্ষে চালায় প্রপাগান্ডার মিছিল।

 

কালচারাল ফ্যাসিজমের অনুসারীরা সব সময় উত্তেজনা টিকিয়ে রাখতে চায়, সংঘাতের আশঙ্কা জিইয়ে রাখতে চায়। এই উত্তেজনা ও সংঘাতের আবহ সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা, উসকানি দেয়। দেশ ও সমাজে চরম মেরুকরণ জারি রাখার চেষ্টা চলে। বৈচিত্র্যময় আদর্শের বিরোধিতা করা হয় প্রবলভাবে। তথ্যের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়, তথ্য যেন সবাই না পায় সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলে। প্রতিষ্ঠানিক অস্থিরতা যেন কখনো মিটে না যায়, তার জন্যও কাজ করা হয়।

 

ধীরে ধীরে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়ার কাজ করে কালচারাল ফ্যাসিজমে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা। এরা শিক্ষাব্যবস্থাকে এত দুরবস্থায় ফেলতে চায়, যেন ভবিষ্যতে কোনো ‘নেতা’ তৈরি হতে না পারে। এতে মেধার যে শূন্যতা তৈরি হয়, তাতেই রাজত্ব করতে চায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। একইসাথে বর্তমানের মেধাবীদেরও দূর করার কাজ চলে।

 

ফ্যাসিবাদে ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্যর শিকার মানুষদের প্রতি এক ধরণের প্রবল বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়। কালচারাল ফ্যাসিস্টরা এসব বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে চান এবং তার জন্য সমর্থন উৎপাদনের চেষ্টা করেন প্রতিনিয়ত। বৈষম্যের শিকার মানুষদের আরও বেশি প্রান্তিক করে ফেলতে প্রয়োজনীয় ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করা হয়। অহরহ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটানো হয় এবং সেসবের সমর্থনে নানা বক্তব্য ছড়ায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। এভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে গুরুতর ঘটনা থেকে নামিয়ে লঘু করার চেষ্টা চলে। বিপক্ষকে সব সময় আক্রান্ত করার হুমকিতে রাখা হয়।

 

গবেষকেরা বলছেন, ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গভেদে কখনোই সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা হতে দিতে চায় না কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। বিশেষ করে নারী ও পুরুষের মধ্যে সব সময় পার্থক্য ও বৈষম্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। পুরো ব্যবস্থাকে ‘পুরুষসর্বস্ব’ করে তোলা হয়। একেবারেই নারীবিরোধী একটি সমাজ ও দেশ তৈরির স্বপ্ন দেখে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা এবং সেটি নির্মাণের জন্য প্রাণপণ কাজ করে। সম্পদের অধিকার ও অর্থকরী কর্মকাণ্ড থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার তোড়জোড় চলে। নারীদের কেবলই ঘরে বন্দী করে ফেলার জন্য নানামাত্রিক ‘তত্ত্ব’ দেওয়া হয় বিরতিহীনভাবে। এর জন্য প্রয়োজনে আইন বদলানোর চেষ্টা হয়, এমনকি বিদ্যমান আইন বাতিলের দাবি তোলা হয়। সেই সাথে যেকোনো বিবেচনায় (ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ) সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সব সময় হুমকিতে রাখা হয়, হুমকি দেওয়া হয় এবং আক্রমণ চালানোর উদাহরণ তৈরি করা হয়। তারা মানুষই না—এমন একটা ধারণা ছড়ানোর কাজ চলে। এবং এইসব কাজগুলো করে কালচারাল ফ্যাসিস্টরাই।

যে কোনো সমাজে নানা স্তর থাকে। সেইসব স্তরের ভিত্তিতেই মাত্রাভেদে ক্ষমতার বন্টন হয়। ফলে সব স্তরীভূত সমাজেই কোন স্তরে ক্ষমতা বেশি থাকে, কোথাও কম। কেউ শাসিত হয়, কেউ শাসন করে। কালচারাল ফ্যাসিস্টরা এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চায়, বৈধতা দিতে চায়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সুযোগ–সুবিধা দিতে মরিয়া থাকে তারা। নিজেদের মতো ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয় এবং সপক্ষে প্রচার চালায়। একুশ শতকে এক্ষেত্রে প্রচারের প্রধান মঞ্চ বানানো হয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকেই। তাই এটিই এখনকার যুগে কালচারাল ফ্যাসিস্টদের অন্যতম প্রধান চারণভূমি।

 

গবেষকেরা বলছেন, ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ ভাব তৈরির চেষ্টা করে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। ফলে সশস্ত্র হওয়ার বা থাকার একটি তাড়না তৈরি করা হয়। এতে করে দেশ ও সমাজে এ সংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। সেই সাথে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ভিত দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে সহিংস হয়ে ওঠার উসকানিও দেওয়া হয়। ভিন্ন মতের কাউকেই সহ্য করে না কালচারাল ফ্যাসিস্টরা, আঘাত করতে চায়, দমন করতে চায়। এই আঘাত ও দমন কার্যক্রম যেমন ‘রিয়েল ওয়ার্ল্ডে’ চালানো হয়, তেমনি চলে ‘ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে’ও। সেই সাথে নিজেদের পক্ষে যায় এমন সব ধরণের সহিসংতাকে উৎসাহ জোগায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।

 

fascism

কালচারাল ফ্যাসিস্টরা সমাজ ও দেশে ‘সিলেক্টিভ পপুলিজম’–এর চর্চা করে প্রবলভাবে। সমষ্টির ধারণাও অনেকসময় ভুল হয়। তবে সেই ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পথে হাঁটে না কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। উল্টো সেই ভুলের চুলার আগুনে হাওয়া দেওয়া হয়। প্রতিদিনের জীবনে সৃষ্টি হওয়া নিরাপত্তাহীনতার বোধকে আরও প্রবল করে তোলার চেষ্টা চলে। অর্থনীতিকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করার পথে এগিয়ে নেয় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।

 

গবেষকদের মতে, কালচারাল ফ্যাসিস্টরা প্রপাগান্ডা চালানোয় পটু থাকে। অসত্য তথ্যের চর্বিতচর্বণ তাদের প্রিয় কাজ। পছন্দের ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির জন্য মিথ্যার ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে সেটিকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। সুচিন্তিত প্রক্রিয়ায় ফেক নিউজের প্রসার বাড়ায় তারা। সংবাদ, তথ্য বা বিশ্লেষণের সেই অংশটিই শুধু গ্রহণ করা হয়, যেটি তাদের পক্ষে যায়। আর বিপক্ষে গেলেই শুরু হয়ে যায় ‘দেখে নেওয়া’র হুমকি।

 

মোদ্দা কথা, ওপরের সব কাজের মাধ্যমে সব কিছুতে শুধুই নিজেদের ‘রাজত্ব’ কায়েম করতে চায় কালচারাল ফ্যাসিস্টরা। ফ্যাসিবাদের বাহক হিসেবে তারা পুরো দেশ ও সমাজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। সেই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালায়। এভাবেই কায়েম হয় ফ্যাসিবাদী শাসন।

 

যাক, অনেক কথা হলো। আশা করা যায়, এতক্ষণে এতটুকু অন্তত বোঝা যাচ্ছে যে, কারা আসলে কালচারাল ফ্যাসিস্ট। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কার্যকলাপ সম্পর্কেও নিশ্চয়ই স্পষ্ট একটি ধারণা পাওয়া গেছে। এবার মিলিয়ে দেখা শুরু করুন তাহলে। কে জানে, এই অবসরে অনেককেই হয়তো নতুন করে চেনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে!

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

 
অর্ণব সান্যাল