Image description

মুফতি সাইফুল ইসলাম

মুসলিম ইতিহাসে মদিনা শুধু একটি নগরীর নাম নয়। এটি একটি সভ্যতার নাম। ইসলাম মক্কায় মানুষের হৃদয়ে ঈমানের বীজ বপন করেছিল, আর মদিনায় সেই ঈমান পেয়েছিল সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক রূপ। হিজরতের পর মদিনা হয়ে উঠেছিল নবীজি (সা.)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইসলামী সমাজের কেন্দ্র। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মসজিদ, এখানেই গড়ে উঠেছিল ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত, এখান থেকেই বিকশিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের ইসলামী কাঠামো। আর এই নবগঠিত সমাজের প্রাণকেন্দ্রে ছিল একটি শিক্ষাকেন্দ্র, যা ইতিহাসে আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত।

ইসলামের প্রথম শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলতে গেলে অবশ্যই মক্কার দারুল আরকামের কথা স্মরণ করতে হয়। নবুয়তের প্রথম দিকে দারুল আরকাম ছিল ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববী এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুফফা ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও মানবসম্পদ তৈরির এক অনন্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাই মদিনার সুফফাকে ইসলামের প্রাচীনতম আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর অন্যতম এবং পরবর্তী মাদরাসা-ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ আদিরূপ বলা যায়।

মদিনায় ইসলামের সূচনা

মদিনায় ইসলামের আগমন আকস্মিকভাবে ঘটেনি। ইয়াসরিবের কিছু মানুষ মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রথম আকাবার বাইআতের পর মদিনায় ইসলামের দাওয়াত বিস্তারের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসআব ইবন উমাইর (রা.)-কে শিক্ষক ও দাঈ হিসেবে পাঠান। তিনি মদিনায় গিয়ে কোরআন শিক্ষা দিতে থাকেন এবং মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেন।

মুসআব (রা.)-এর এই ভূমিকা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তার কোরআনের শিক্ষাদান ও দাওয়াতের মাধ্যমে মদিনার বহু বিশিষ্ট মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। উসাইদ ইবন হুদাইর (রা.) ও সা‘দ ইবন মু‘আয (রা.)-এর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ মদিনার সামাজিক বাস্তবতাকে দ্রুত পরিবর্তন করে দেয়। ইবন ইসহাক ও ইবন হিশামের সীরাতের বর্ণনায় মুসআব (রা.)-এর এই দাওয়াতি ভূমিকার বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়।

এরপর দ্বিতীয় আকাবার বাইআতের মাধ্যমে মদিনার মানুষের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। আনসাররা তাঁকে নিজেদের শহরে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অবশেষে হিজরত সংঘটিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পৌঁছালে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

মসজিদে নববী: ইবাদত, শিক্ষা ও সমাজ নির্মাণের কেন্দ্র

মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রথম কাজ ছিল মসজিদ নির্মাণ। মসজিদে নববী শুধু নামাজের স্থান ছিল না; এটি ছিল ইসলামী সমাজের প্রশাসনিক, বিচারিক, সামাজিক, সামরিক, দাওয়াতি ও শিক্ষাকেন্দ্র। এখানেই মানুষ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআন ও সুন্নাহ শিখত, বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করত এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থার শিক্ষা গ্রহণ করত।

পবিত্র কোরআন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে শিক্ষা ও তাযকিয়ার কথা উল্লেখ করেছে:

 هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ

‘তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।’ (সুরা জুমুআহ, আয়াত : ২)

এই আয়াতের বাস্তব প্রয়োগ আমরা মদিনার মসজিদে নববীতে দেখতে পাই। সেখানে শিক্ষা ছিল নবীজির মিশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইসলামের প্রাচীন আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র সুফফা

মসজিদে নববীর এক পাশে একটি ছাউনিযুক্ত স্থান ছিল, যা ইতিহাসে সুফফা নামে পরিচিত। সেখানে অবস্থান করতেন এমন কিছু সাহাবি, যারা নিজেদের জীবনকে জ্ঞানার্জন ও ইসলামের শিক্ষায় নিবেদিত করেছিলেন। তাদের বলা হতো আহলুস সুফফা বা আসহাবে সুফফা।

আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি দীর্ঘ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থেকে হাদিস শিক্ষা ও সংরক্ষণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিপুলসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেন। তার মতো আরও বহু সাহাবি সুফফায় থেকে নবীজি (সা.)-এর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা (রা.)-এর জীবনযাপনের কঠোরতার কথা উঠে এসেছে। তিনি বর্ণনা করেছেন, ক্ষুধার তীব্রতায় কখনো কখনো তিনি মসজিদের মেঝেতে এমনভাবে পড়ে থাকতেন যে, লোকেরা তাকে মৃগীরোগী মনে করত। (সহিহ বুখারি, কিতাবুর রিকাক; হাদিস : ৬৪৫২) এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, আহলুস সুফফার জীবন ছিল আরাম-আয়েশের জীবন নয়; বরং জ্ঞান ও দ্বীনের জন্য আত্মনিবেদনের জীবন।

সুফফার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এখানে শিক্ষা ছিল জীবনের সঙ্গে যুক্ত। শুধু তথ্য মুখস্থ করা নয়, কোরআন শেখা, তা বোঝা, আমল করা, চরিত্র গঠন এবং সমাজে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া ছিল এই শিক্ষার লক্ষ্য।

মাদ্রাসার ধারণার আদিরূপ

আজকের অর্থে ‘মাদ্রাসা’ বলতে আমরা সাধারণত পৃথক ভবন, শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক কাঠামোসমৃদ্ধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুঝি। মদিনার সুফফা সে অর্থে আধুনিক মাদরাসা ছিল না। কিন্তু শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, আবাসিক ব্যবস্থা, নিয়মিত পাঠদান এবং জ্ঞানকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার দিক থেকে এটি পরবর্তী ইসলামী মাদরাসা-ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের শুধু নিজের কাছে শিক্ষা দিতেন না; তাঁদের বিভিন্ন গোত্র ও অঞ্চলে শিক্ষক হিসেবে পাঠাতেন। মুসআব ইবন উমাইর (রা.) মদিনায় গিয়েছিলেন ইসলাম শিক্ষা দিতে। আবার মদিনা থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে কোরআন ও ইসলামের শিক্ষক পাঠানোর ঘটনা ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে বিস্তৃত করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

 خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং তা শিক্ষা দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)

এই হাদিস ইসলামী শিক্ষার দর্শনকে সংক্ষেপে তুলে ধরে। এখানে জ্ঞান অর্জন এবং জ্ঞান বিতরণ দুটিই মর্যাদাপূর্ণ কাজ।

শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়জীবন গঠনের শিক্ষা

মদিনার শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর সামগ্রিকতা। এখানে শিক্ষা মানুষের আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও তৈরি করত। একজন সাহাবি কোরআন শিখতেন, নামাজ শিখতেন, হালাল-হারাম জানতেন; একই সঙ্গে তিনি প্রতিবেশীর অধিকার, ব্যবসায়িক ন্যায়নীতি, পারিবারিক দায়িত্ব, যুদ্ধ ও শান্তির নীতি এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের আদবও শিখতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ছিল মানুষকে কেবল ‘জ্ঞানী’ বানানো নয়; বরং সৎ, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

এই কারণে মদিনার মাদরাসা ছিল মূলত একটি ‘মানুষ তৈরির প্রতিষ্ঠান’। এখান থেকে এমন মানুষ তৈরি হয়েছিল, যারা পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম, কোরআন, হাদিস, ন্যায়নীতি ও সভ্যতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেন।

নারীর শিক্ষাও ছিল এই ধারার অংশ

মদিনার নববী শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীশিক্ষা। নারীরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতেন এবং তিনি তাদের শিক্ষার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, নারীরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আবেদন করেছিলেন যেন তিনি তাঁদের জন্য পৃথক একটি দিন নির্ধারণ করেন, যাতে তারা তার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। তিনি তাদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে শিক্ষা দেন। (বুখারি, হাদিস : ১০১)

এটি প্রমাণ করে, ইসলামের প্রথম যুগের শিক্ষা কেবল পুরুষকেন্দ্রিক ছিল না। জ্ঞানার্জনের অধিকার ও প্রয়োজন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই স্বীকৃত ছিল।

সুফফা থেকে বিশ্বসভ্যতার পথে

সুফফার শিক্ষার্থীরা পরবর্তীকালে ইসলামের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন। আবু হুরায়রা (রা.), আবু যার আল-গিফারি (রা.), সাহল ইবন সা‘দ (রা.)-সহ বহু সাহাবির জীবন ইসলামী জ্ঞানচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের মাধ্যমে হাদিস, কোরআনের ব্যাখ্যা, নবীজির জীবনাচরণ ও ইসলামী জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে যায়।

পরবর্তীকালে মদিনা হয়ে ওঠে তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে হাদিস, ফিকহ, কিরাআত ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের সমৃদ্ধ ধারা। এভাবেই সুফফার শিক্ষার বীজ ধীরে ধীরে বৃহৎ ইসলামী জ্ঞানসভ্যতায় পরিণত হয়।

মদিনার মাদরাসার সবচেয়ে বড় শিক্ষা

আজকের পৃথিবীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসংখ্য, জ্ঞানের পরিমাণও অভূতপূর্ব। কিন্তু জ্ঞান ও চরিত্রের মধ্যে দূরত্বও কম নয়। মদিনার নববী শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা শুধু তথ্য অর্জনের নাম নয়। শিক্ষা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করবে, চরিত্রকে সুন্দর করবে এবং তাকে সমাজের জন্য কল্যাণকর মানুষে পরিণত করবে।

মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যে শিক্ষাবিপ্লব শুরু হয়েছিল, তার কেন্দ্র ছিল মসজিদে নববী এবং সুফফা। এখানে কোরআনের আয়াত উচ্চারিত হয়েছে, হাদিস শেখানো হয়েছে, মানুষ গড়ে উঠেছে এবং সেই মানুষগুলোই পরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের আলো বহন করেছে।

তাই মদিনার সুফফাকে শুধু একটি পুরোনো ছাউনির নাম হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এটি ছিল এমন এক শিক্ষাদর্শনের প্রতীক, যেখানে ইবাদত ও শিক্ষাজ্ঞান ও চরিত্রব্যক্তি ও সমাজ, দুনিয়া ও আখিরাত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।

মক্কায় ইসলাম মানুষকে ঈমানের ডাক দিয়েছিল; মদিনায় সেই ঈমানকে জ্ঞান, চরিত্র, সমাজ ও সভ্যতার রূপ দেওয়া হয়েছিল। আর সেই রূপান্তরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল মসজিদে নববীর সুফফা। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও তার শিক্ষা স্পষ্ট: একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন করতে হলে শুধু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ যথেষ্ট নয়প্রয়োজন এমন শিক্ষাযা মানুষ তৈরি করে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

[email protected]