Image description

তানভীর অপু

বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকার উদ্দেশে এই যাত্রা ছিল আমার বহুদিনের স্বপ্ন পূরণের গল্প। পৃথিবীর অন্যতম সেরা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কে আবার যাওয়ার সুযোগ পাব, এমনটা ভাবতেই ভীষণ রোমাঞ্চ লাগছিল। এই ভ্রমণ প্রকৃতিকে তার সবচেয়ে সুন্দর আর বন্য রূপে কাছ থেকে দেখার এক বিরল অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশ থেকে প্রথমে আমি ভারতের মুম্বাইয়ে যাই। এরপর মুম্বাই থেকে আরেকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পৌঁছাই কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে। আফ্রিকার মাটিতে প্রথম পা রাখার সেই মুহূর্ত আজও স্পষ্ট মনে আছে। সেখান থেকে সড়কপথে যাই তানজানিয়ার আরুশা শহরে। সাফারি ভ্রমণের জন্য আরুশা যেন প্রবেশদ্বার। এখান থেকেই বিশ্বের বিখ্যাত সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক, এনগোরোঙ্গোরো কনজারভেশন এরিয়া এবং আরও অনেক অভয়ারণ্যের পথে যাত্রা শুরু হয়। এক রাত আরুশায় কাটিয়ে পরদিন ভোরেই আমরা সেরেঙ্গেটির উদ্দেশে রওনা দিই।

 

ছবি লেখকের সৌজন্যেছবি লেখকের সৌজন্যে

 

ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে আফ্রিকার আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, দূরে পাহাড়ের সারি, আর মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গ্রাম। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, যেন একেবারে অন্য এক পৃথিবীতে চলে এসেছি। যতই সেরেঙ্গেটির দিকে এগোচ্ছিলাম, ততই অনুভব করছিলাম আমরা শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির বিশাল রাজ্যে ঢুকে পড়ছি। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছে গেলাম পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও বিখ্যাত বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কে।

সেরেঙ্গেটির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অন্তহীন তৃণভূমি, অসংখ্য বন্যপ্রাণী আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। এই পার্ক পৃথিবীবিখ্যাত ‘গ্রেট মাইগ্রেশন’-এর জন্য পরিচিত হলেও সারা বছরই এখানে হাজার হাজার বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে। বিস্তীর্ণ সাভানা, সোনালি ঘাসের সমুদ্র, দূরে ছড়িয়ে থাকা একাকী অ্যাকাসিয়া গাছ।

পার্কে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের চোখে পড়তে শুরু করল অসংখ্য বন্যপ্রাণী। প্রথমে দেখা মিলল বিভিন্ন প্রজাতির হরিণের। কেউ দলবেঁধে ঘাস খাচ্ছে, কেউ আবার সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। একটু এগিয়ে বিশাল জেব্রার পাল। তাদের সাদা কালো ডোরাকাটা শরীর সবুজ সোনালি তৃণভূমির সঙ্গে যেন এক অপূর্ব বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। আরও কিছুদূর এগিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা জিরাফের দল চোখে পড়ল। লম্বা গলা উঁচু করে তারা গাছের পাতা খাচ্ছিল। তাদের ধীর, শান্ত আর রাজকীয় চলাফেরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম।

 

ছবি লেখকের সৌজন্যেছবি লেখকের সৌজন্যে

 

শুধু স্থলচর প্রাণীই নয়, সেরেঙ্গেটির আকাশও ছিল অসংখ্য পাখির কোলাহলে মুখর। কোথাও ঈগল আকাশে চক্কর দিচ্ছে, কোথাও শকুন দূরে বসে শিকারের অপেক্ষায়, আবার কোথাও রঙিন ছোট ছোট পাখি গাছের ডালে বসে গান গাইছে। চারপাশের প্রতিটি দৃশ্যই ছিল ছবির মতো সুন্দর। ক্যামেরায় যতই বন্দি করি না কেন, নিজের চোখে দেখার অনুভূতির সঙ্গে তার কোনো তুলনা হয় না।

এভাবেই দেখতে দেখতে কখন যে সারাটা দিন কেটে গেল, টেরই পাইনি। প্রতিটি মুহূর্তে ছিল নতুন কিছু দেখার আনন্দ। আমাদের গাইড বিভিন্ন প্রাণীর স্বভাব, তাদের জীবনযাপন আর এই বিশাল বাস্তুতন্ত্রের নানা গল্প শোনাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির বিশাল এক উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষে বসে বই নয়, সরাসরি প্রকৃতির কাছ থেকেই শিখছি।

 

 

বিকেলের দিকে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। ঠিক তখনই আমাদের গাড়ির ওয়্যারলেস সেটে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ভেসে এল। কাছাকাছি কোথাও একটি চিতাবাঘ দেখা গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির ভেতরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। গত বছর এই পার্কে এসে একটি পূর্ণবয়স্ক চিতা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাই এবারও সেই আশায় আমরা দ্রুত নির্দিষ্ট স্থানের দিকে রওনা দিলাম।

সাভানার বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মাঝখানে নিচু গর্ত বা ডিপ্রেশনের দিকে আমাদের গাড়ি এগিয়ে গেল। দূর থেকে প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। শুধু সোনালি ঘাসের ফাঁক দিয়ে মাথা দেখা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে সেখানে অনেক সাফারি গাড়ি এসে জড়ো হয়েছে। সবাই দূরবীন আর ক্যামেরা তাক করে চুপচাপ অপেক্ষা করছে।

 

ছবি লেখকের সৌজন্যেছবি লেখকের সৌজন্যে

 

আমরাও ধীরে ধীরে গাড়ি নিয়ে আরও কাছে গেলাম। তারপর চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠল, সেটি আজীবন মনে থাকবে।

ঘাসের আড়ালে বসে আছে একটি পূর্ণবয়স্ক মা চিতা। আর তাকে ঘিরে খেলছে চারটি ছোট্ট শাবক। একসঙ্গে চারটি শাবকসহ একটি মা চিতাকে এত কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কখনো শাবকগুলো মায়ের গায়ে উঠে খেলছে, কখনো নিজেদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করছে, আবার কখনো মায়ের বুকের কাছে এসে নিশ্চিন্তে বসে পড়ছে। আর মা চিতাটি এক মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক নয়। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সে যেন প্রতিনিয়ত সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।

 

 

সেই মুহূর্তে পুরো সাভানায় এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। এত পর্যটক, এত সাফারি গাড়ি, তবুও কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। সবাই নিঃশব্দে প্রকৃতির এই অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করছিল। শুধু ক্যামেরার শাটারের মৃদু শব্দ আর বাতাসে দুলতে থাকা ঘাসের সাঁই সাঁই আওয়াজ ভেসে আসছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজেই আমাদের সামনে তার সবচেয়ে সুন্দর একটি দৃশ্য মেলে ধরেছে।

আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, নিজের চোখে এমন দৃশ্য দেখছি। টেলিভিশনের নানা তথ্যচিত্রে বহুবার মা চিতা আর তার শাবকদের দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। অনেক বেশি জীবন্ত, অনেক বেশি আবেগময়। চোখ সরাতে ইচ্ছাই করছিল না।

 

সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কে 'গ্রেট মাইগ্রেশন'-এর সময়কার ছবি। সংগৃহীতসেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কে 'গ্রেট মাইগ্রেশন'-এর সময়কার ছবি। সংগৃহীত

 

মা চিতাটির চোখ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের তীক্ষ্ণ। চারপাশের প্রতিটি নড়াচড়া সে গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করছিল। একদিকে সে দুর্দান্ত একজন শিকারি, অন্যদিকে সন্তানদের প্রতি অসীম যত্নশীল এক মা। এই দুটি রূপ একসঙ্গে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ খুব কম মানুষেরই হয়। সেদিন সেই সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

আমি অনেক ছবি তুললাম, অনেকক্ষণ ভিডিওও করলাম। কিন্তু সত্যি বলতে, কোনো ক্যামেরাই সেই মুহূর্তের সৌন্দর্য আর অনুভূতিকে পুরোপুরি ধরে রাখতে পারে না। কিছু দৃশ্য শুধু হৃদয়ে গেঁথে থাকে, স্মৃতির পাতায় চিরদিনের জন্য অমলিন হয়ে যায়। এরই মধ্যে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের নিচে নামতে শুরু করেছে। শেষ বিকেলের লালচে আলো পড়েছে সাভানার সোনালি ঘাসে। সেই আলোয় মা চিতা আর তার চারটি শাবককে আরও অপূর্ব লাগছিল।

সেরেঙ্গেটির সেই দিনটি সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকবে। পৃথিবীর অনেক দেশ ঘোরা যায়, অসংখ্য সুন্দর জায়গা দেখা যায়। কিন্তু মা চিতার পাশে নিশ্চিন্তে খেলতে থাকা চারটি ছোট্ট শাবকের সেই দৃশ্য কোনো দিন ভুলতে পারব না। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন আফ্রিকার সেই সোনালি সাভানা, অস্তগামী সূর্যের আলো আর চিতা পরিবারের সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্ত আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে প্রকৃতির চেয়ে সুন্দর, রহস্যময় এবং বিস্ময়কর আর কিছুই হতে পারে না।