Image description

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশে বহুদিন ধরেই ঘনিয়ে উঠছিল যুদ্ধের কালো মেঘ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, অন্যদিকে ইরানের দৃঢ় প্রতিরোধ ও পারমাণবিক কর্মসূচি- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গও ভয়াবহ সংঘাতের জন্ম দিতে পারত। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ আর পর্দার আড়ালের আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ এলো এক অপ্রত্যাশিত মোড়- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি।

গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ফলে ১৪ দফা সমঝোতার মাধ্যমে টানা তিন মাসের সংঘাতের অবসান ঘটলো।

এই চুক্তি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা নয়; এটি বহু বছরের দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও শক্তির লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। দীর্ঘদিন ধরে একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা দুই রাষ্ট্র কেন হঠাৎ করে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হলো? এটি কি সত্যিই শান্তির সূচনা, নাকি বড় সংঘাতের আগে কৌশলগত বিরতি? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-এই দীর্ঘ টানাপোড়েনের শেষে আসলেই লাভবান হলো কে? ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র?

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তিতে উভয়পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান কূটনৈতিকভাবে বড় একটি সাফল্য অর্জন করেছে। কারণ দীর্ঘদিনের চাপের মধ্যেও তারা নিজেদের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি, বরং আলোচনার টেবিলে বসে কিছু শর্ত আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। এটি ইরানের কৌশলগত ধৈর্য ও দরকষাকষির ক্ষমতারই প্রতিফলন।

কী আছে চুক্তিতে?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া ১৪ দফা সমঝোতা মূলত যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক শিথিলতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ১৪ দফা চুক্তিগুলো হলো-
প্রথমত, চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, যা তাৎক্ষণিকভাবে সংঘাত থামানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির আওতায় শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রই নয়, লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলেও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা হবে।

দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। ইরান নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না এবং কিছু সংবেদনশীল কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হবে।

তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হতে পারে, যা ইরানের অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়ক হবে।

চতুর্থত, মানবিক সহায়তা ও বন্দি বিনিময় চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উভয় পক্ষই আটক নাগরিকদের মুক্তি এবং মানবিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

পঞ্চমত, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ইরান তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রভাব খাটিয়ে সংঘাত কমানোর চেষ্টা করবে, আর যুক্তরাষ্ট্রও তাদের মিত্রদের একই পথে উৎসাহিত করবে।

ষষ্ঠত, লেবানন ও অন্যান্য সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে শান্তি প্রক্রিয়া জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলবে।

সপ্তমত, নতুন করে সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যাতে যুদ্ধ আবারও শুরু না হয়।

অষ্টমত, নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়।

নবমত, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির রূপরেখা তৈরির আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দশমত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু রাখা হবে, যাতে চুক্তি লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমে।

একাদশত, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।

দ্বাদশত, প্রচার ও উত্তেজনামূলক বক্তব্য কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে, যাতে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত না হয়।

ত্রয়োদশত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে সহযোগিতা করার কথা বলা হয়েছে।

চতুর্দশত, চুক্তির অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্যালোচনা বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে এই ১৪ দফা চুক্তি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে সংঘাত বন্ধ করা যায় এবং ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব হয়। যদিও এর সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর, তবুও এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যুদ্ধে জয়ী ইরান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সমঝোতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যত আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তার বড় একটি অংশ ঘুরে ফিরে আসছে একটি প্রশ্নে- এই সংঘাতে শেষ পর্যন্ত জয়ী কে? বিশ্লেষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মতে, কৌশলগত দিক থেকে ইরানই এই সংঘাত থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হয়েছে।

দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সামরিক হুমকির মধ্যেও ইরান তাদের মূল অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি। বরং তারা ধীরে ধীরে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছে। এই বাস্তবতাই ইরানের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চুক্তির মাধ্যমে ইরান অন্তত আংশিকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তেল রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক লেনদেনে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ- সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি। দীর্ঘদিনের চাপের পর এই ধরনের অর্থনৈতিক খোলা দরজা ইরানের জন্য বড় অর্জন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, এই সমঝোতায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করেনি। বরং কিছু সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও তারা তাদের কৌশলগত সক্ষমতা ধরে রেখেছে। একইভাবে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। লেবানন, সিরিয়া বা অন্যান্য অঞ্চলে তাদের মিত্রদের অবস্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে, যা তাদের ভূরাজনৈতিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে।
সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের মূল লক্ষ্যগুলো- ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা, পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা কিংবা আঞ্চলিক প্রভাব কমানো-এই চুক্তির মাধ্যমে পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ফলে ইরান শুধু টিকে থাকেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কাতারের মতো দেশগুলো এখন ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে চলার নীতি বেছে নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই ইরানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এটি কোনো সরল সামরিক বিজয়ের গল্প নয়; বরং এটি কূটনৈতিক ধৈর্য, কৌশলগত অবস্থান এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের এক উদাহরণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, সরাসরি যুদ্ধ না করেও ইরান এই সংঘাত থেকে একটি ‘সফট বিজয়’ আদায় করতে পেরেছে- এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ।

উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছালেন। সমর্থকদের কাছে এটি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হলেও ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে ইরান কৌশলগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পর ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক শিথিলতা, তেল রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি এবং পুনর্গঠনের জন্য সম্ভাব্য অর্থায়ন- সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি নতুন করে গতি পেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের রাজনৈতিক স্বীকৃতি আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনে বিভক্তি

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর নিয়ে ওয়াশিংটনে অনেকেই সন্তুষ্ট নন। কেউ কেউ আবার করেছেন সমালোচনা। এমনকি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও দেখা গেছে বিভক্তি। কেউ কেউ দাঁড়িয়েছেন সমর্থনেও।

ট্রাম্পের সমালোচকদের দাবি, এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে ইরানের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে, যা যুদ্ধের আগেও ছিল না। তারা পরাশক্তির আঘাত সহ্য করতে পেরেছে; হরমুজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে ব্যাপক ছাড় পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমঝোতা স্মারকের সমালোচনাকারীদের ‘বোকা, মিথ্যাবাদী ও নির্বোধ’ বলে অভিহিত করেছেন।

আলজাজিরার খবর বলছে, রিপাবলিকান পার্টির অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ইরান যুদ্ধের বিষয়টি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিনিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- বিদেশের মাটিতে আর কোনো যুদ্ধে জড়াবে না যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের বিষয়কে যারা সমর্থন করেছেন, তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধে জড়ালেও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এটি থেকে সরে এসেছেন। তাঁর এ সরে আসাই প্রমাণ করে- তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রেসিডেন্ট।

এদিকে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি কাতারের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেছেন, দেশের ভেতরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। খবরে দেখা যাচ্ছে, ক্যাপিটল হিলের ভেতরে অনেকে ক্ষুব্ধ এ চুক্তি নিয়ে; বিশেষ করে রিপাবলিকান পক্ষের।

মাসগ্রেভ আরও জানান, আগামীতে ইরানের জব্দ থাকা তহবিল ছাড় নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠবে। তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহ পর্যন্ত ট্রাম্প ইরানকে মহাহুমকি, মহাশত্রু হিসেবে অভিহিত করছিলেন। সামনে ইরান সরকার তাদের তহবিল ছেড়ে দিতে বলবে। এখন যদি প্রেসিডেন্ট আদৌ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন, তাহলে তাঁকে এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যা দিয়ে তহবিলও ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হবে; এ জন্য তাঁকে রাজনৈতিক মাশুলও গুনতে হবে না।’

লেবাননের সঙ্গে সমঝোতা হবে কী?
সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হয়ে গেলেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে লেবানন ঘিরেই। ইসরায়েল এ চুক্তির স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলোর মধ্যে নেই। যদিও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরান যুদ্ধের সূত্রপাত, তখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালিয়েছিল।

২ মার্চ থেকে চলছে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, যা ইরান যুদ্ধের আবহেই শুরু হয়। সে সময় থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় তিন হাজার ৯১২ জন প্রাণ হারিয়েছে; আহত হয়েছে ১১ হাজার ৮৭৩ জন। শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই লেবাননে হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল লেবাননে একজন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যার জন্য পুরো ভবন ধসিয়ে দিচ্ছে। এতে বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।

ওয়াশিংটন ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধি দলকে আলোচনায় বসিয়ে যুদ্ধ অবসানের চেষ্টাও করেছে। সেখান থেকে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত এলেও ইসরায়েল মাঠে তা মানেনি। বরং ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীরা বলেছেন, সেখানে ইসরায়েলি অভিযান চলমান থাকবে।

আলজাজিরার খবর বলছে, ইসরায়েলের লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো ইচ্ছা নেই। ট্রাম্প যে বিষয়ে সম্মত হয়ে থাকুন না কেন, তা তারা মানবে না। সম্প্রতি তারা নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের দখলকৃত এলাকা ইসরায়েল নিজেদের ‘বাফার জোন’ হিসেবে দেখিয়েছে।
রয়টার্সকে দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লেবাননে সেনা রাখার জন্য ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই দুই কর্মকর্তার একজন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। সেই কর্মকর্তা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাকে ‘একরোখা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল পিছু হটছে না। অন্য কর্মকর্তা বলেছেন, পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে ট্রাম্প ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে তাদের কিছু করতে বাধ্য করেন কিনা, সেটির ওপর। ফলে লেবানন ইস্যুর কী হবে- সে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ ইসরায়েলের
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা এবং দেশটির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উচ্চাকাক্সক্ষাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দমন করতে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিয়ে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্ধারণ করেছিলেন, তা কার্যত ভেস্তে গেছে।

গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নানা সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো পরিস্থিতি এখানে ঘটেনি, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা নসাৎ করে টিকে গেছে। মূলত অব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে এবং সৌদি আরব চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন ও নেতানিয়াহুর বিপর্যয়
ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর জন্য বড় বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে সরে আসা ছিল রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং নিজের দলের ভেতরেই তিনি বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থবিরতা ট্রাম্প পরিবারের ওপরও আর্থিক প্রভাব ফেলছিল। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ট্রাম্প দ্রুত একটি ভেনেজুয়েলা-শৈলীর বিজয় চেয়েছিলেন, কিন্তু ইরান সহজে আত্মসমর্পণ না করায় তিনি এই পথ থেকে সরে আসেন।

ইসরায়েলের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। চ্যানেল ১৩-এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের পর অঞ্চলটিতে মার্কিন সমর্থনে ইসরায়েল শীর্ষ সামরিক শক্তি থাকার বদলে ইরান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে হিলারি হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেল লিখেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই চুক্তি নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা।

ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না এবং চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনাটি তিনি পছন্দ করেননি।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকায় ইসরায়েলি নীতি নির্ধারকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। উগ্র-ডানপন্থি এবং বিরোধী দলগুলো এখন ইসরায়েলকে ‘এককভাবে’ চলার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা আভিগডোর লিবারম্যান ইসরায়েলকে একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ফোর্স তৈরি এবং মোসাদকে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে একক মনোযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এমনকি নেতানিয়াহুর মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক ইয়িনন মাগাল মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

কৌশলগত পরিবর্তন ও ওয়াশিংটনে প্রভাব
গাজা, দক্ষিণ লেবানন এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের দখলকৃত ভূমি এবং আবুধাবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি টিকে থাকলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন হারানো নেতানিয়াহুর জন্য বড় ক্ষতি। ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের সামরিক মিত্র হিসেবে নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আইপ্যাক-এর মতো ইসরায়েলি লবিং গ্রুপগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসরায়েলি লবি মার্কিন কংগ্রেসে ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (এনডিএএ) এবং ইন্টেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (আইএএ)-এর মাধ্যমে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালার সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে কংগ্রেসকে বাইপাস করে অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা যায়।

গাজা পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কী
আঞ্চলিক ক্ষেত্রে ধাক্কা খাওয়ার পর নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা আরো জোরদার করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল পুরো গাজা পুনর্দখল করলেও হামাস বা হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ মেনে নেবে না। গাজার সামাজিক কাঠামো সমস্ত নিপীড়ন সত্ত্বেও ভেঙে পড়েনি। নেতানিয়াহু যদি গাজায় পুনরায় আক্রমণ চালান, তবে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি পণ্য ও ব্যবসা বর্জনের ডাক তীব্র হবে, যা ইসরায়েলের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করা কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের এই সম্প্রসারণবাদী নীতি শেষ পর্যন্ত তাদের সামরিক ক্ষমতার সীমানায় পৌঁছে দিয়েছে এবং এটি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তির প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের আশঙ্কার পর এই সমঝোতাকে আন্তর্জাতিক নেতারা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি যুদ্ধ থামানোর চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাময় সূচনা।

ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতারা এই চুক্তিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের যে চেষ্টা চলছিল, তারই ফল এই সমঝোতা। তারা আশা করছেন, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত শান্তি প্রক্রিয়ার পথ খুলে দেবে। এছাড়া চীন ও রাশিয়াসহ বড় শক্তিগুলোও এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধ নয়, বরং সংলাপই আন্তর্জাতিক বিরোধ সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এই চুক্তি সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এই সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে উত্তেজনা কমানো বিশ্বশান্তির জন্য অত্যন্ত জরুরি। তারা উভয় পক্ষকে চুক্তির শর্ত মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সবাই যে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট, তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। তবুও সামগ্রিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়াকে তারা স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই চুক্তি বিশ্বনেতাদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে-সংঘাত নয়, কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত পথ দেখায়। এখন নজর থাকবে, এই সমঝোতা কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।
শীর্ষনিউজ/