আমিনুল মজলিশ
নির্বাসিত জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরার পর বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেই আলোচিত উক্তি—‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ এখন আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং সরকারের কর্মপরিকল্পনার মূল ভিত্তি হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। বর্তমান সরকারের গৃহীত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার ও বিভিন্ন কার্ডের প্রবর্তনকে একটি অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নীতিনির্ধারকেরা।
লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে রাজধানীর পূর্বাচলে লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন—‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান; ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’। সেই বক্তৃতার শেষে তিনি সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের একের পর এক ‘কার্ড’ প্রবর্তন, বিশেষ করে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি ফুয়েল কার্ড ও হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ সেই কৌতূহলকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান সম্পাদক রেজাউল করিম রনি বলেন, তারেক রহমান যে প্ল্যানের কথা বলেছিলেন, তা হুট করে তৈরি হয়নি; এটি তার কয়েক দশকের চিন্তার ফসল।
তিনি বলেন, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এসব মূলত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি খাল খননের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন। এখনো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে, তবে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী আকারে।
যেকোনো বিষয়ে কার্ড প্রচলন নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম রনি বলেন, আমার মনে হয় কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডই হচ্ছে মূল। এর বাইরে যেসব কার্ড রয়েছে, সেগুলো সময়ের প্রয়োজনে চালু করা হয়েছে।
তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’ প্রসঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্য ও তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল বলেন, আমাদের পরিকল্পনা খুবই স্পষ্ট। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবার আগে বাংলাদেশ—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’; আর দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বেকারত্ব দূরীকরণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন।
তিনি বলেন, আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছি। খাল খনন কেবল মাটি কাটা নয়; এটি একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপ্লব। এর মাধ্যমে একদিকে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা যায় এবং বেকারত্ব কমানো সম্ভব হয়। স্বাস্থ্য খাতে শিগগিরই এক লাখ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
আজিজুল বারী হেলাল আরও বলেন, সুতরাং আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ কিংবা ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’, নির্বাচনী ইশতেহার এবং বিভিন্ন কার্ডের প্রচলন সবই একই সূত্রে গাঁথা।
এ প্রসঙ্গে সিনিয়র সাংবাদিক ও চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের দিক থেকে এটি ইতিবাচক। কিন্তু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ফারাক থাকে। এখানেও যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সুফল পাবে না।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। এই কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় শুরু হলে কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তার সুফল পায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এক সদস্য বলেন, এই ‘কার্ড ডিপ্লোম্যামি’র মাধ্যমে সব ধরনের সেবাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনাই সরকারের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার ভবিষ্যতে ‘এক ব্যক্তি, এক কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করছে। এর ফলে প্রত্যেক নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য রাষ্ট্রের কাছে সংরক্ষিত থাকবে এবং নাগরিকরাও নির্বিঘ্নে প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সুবিধা সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগে স্বচ্ছতা বজায় রাখাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তারা বলছেন, যদি এই কার্ড ব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত রাখা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের আলোচিত ‘প্ল্যান’-এর বাস্তব সফলতার প্রমাণ হিসেবেও বিবেচিত হবে।