Image description

সহিদুল আলম স্বপন

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের গণ্ডিতে আটকে নেই এই সম্পর্কের শিকড় প্রোথিত আছে ইতিহাসের গভীরে, রক্তের বন্ধনে, ভাষার মিলে এবং মুক্তিযুদ্ধের অবিনশ্বর স্মৃতিতে। তাই যখন পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত বিজেপি সরকার তাদের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এটি কি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা, নাকি রাজনৈতিক বার্তা? এটি কি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সেতু গড়ার পথ, নাকি বিভেদের নতুন দেয়াল তোলার উদ্যোগ?

ভারত বারবার বলে আসছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সম্পর্কের উন্নতি চায়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে চায়, আঞ্চলিক সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলতে বলতে তার সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া টেনে দেওয়া এই দুটি অবস্থান কি একসঙ্গে সত্য হতে পারে? কূটনীতির ভাষায় এই দ্বন্দ্বকে বলা হয় 'স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগুইটি', কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি স্রেফ স্ববিরোধিতা।

নিরাপত্তার যুক্তিটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, মানব পাচার এগুলো বাস্তব সমস্যা এবং যেকোনো রাষ্ট্রেরই সীমান্ত সুরক্ষার অধিকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাঁটাতারের বেড়া কি আদৌ এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে? পরিসংখ্যান বলছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া আছে, সেখানেও পাচার বন্ধ হয়নি বরং পাচারকারীরা আরও দুর্গম পথ ব্যবহার করতে শুরু করেছে। বেড়া কেবল বৈধ ও স্বাভাবিক মানবিক চলাচলকেই বাধাগ্রস্ত করে, অপরাধকে নয়।

পৃথিবীর অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে ভিন্ন এক চিত্র চোখে পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো শেনজেন চুক্তির আওতায় সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়ে পরস্পরের মধ্যে বাণিজ্য, মানুষের চলাচল এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় বহুগুণ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশ্বের দীর্ঘতম অরক্ষিত সীমান্ত বিদ্যমান, যা দুই দেশের সম্পর্ককে কেবল মজবুতই করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো সীমান্ত সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ কাঁটাতারের মধ্য দিয়ে যায় না।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যে দেশটি গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স এবং কৃষি খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত। এই দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যদি সত্যিকার অর্থেই অংশীদারিত্বের হয়, তাহলে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা ব্যবস্থা চালু করার কথা ভাবা উচিত। কাঁটাতারের বেড়া সীমান্তের দুই পারের মানুষকে কাছে আনে না, বরং তাদের মনে একটি অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করে।

এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কেবল প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক বার্তা যা বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। কিন্তু রাজনীতির হিসাব আর কূটনীতির হিসাব সবসময় এক হয় না। আজকের গ্লোবাল ভিলেজে যখন বিশ্ব পরস্পর নির্ভরশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সীমান্তে দেয়াল তোলা একটি পশ্চাৎমুখী চিন্তার প্রকাশ।

ভারতের উচিত কাঁটাতারের বেড়ার পাশাপাশি বরং তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সমাধান করা, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ করা, বাণিজ্য বৈষম্য দূর করা এবং ট্রানজিট ও যোগাযোগ সুবিধা বাড়ানো। এগুলোই হবে প্রকৃত বন্ধুত্বের ভাষা। শুধু বেড়া নয়, বরং বিশ্বাস এটিই দুই দেশের সীমান্তকে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ করতে পারে।

কাঁটাতারের বেড়া হয়তো একটি সমস্যার সাময়িক প্রতিক্রিয়া, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ইতিহাস সাক্ষী, দেয়াল দিয়ে সভ্যতা টেকে না, টেকে সেতু দিয়ে।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি