বাংলাদেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নগুলো আবারও সামনে চলে এসেছে। গত এক দশক এবং তারও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা দেখেছি গভীর মেরূকরণ, পরস্পরবিরোধী বর্ণনা এবং রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা নিয়ে এক ধরনের অব্যাহত দ্বন্দ্ব। মিলিট্যান্ট বা জঙ্গি, চরমপন্থি বা রাষ্ট্রবিরোধী, মৌলবাদী, উগ্রবাদী প্রভৃতি তকমা ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় যে বর্ণনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি হাতিয়ার হিসেবেই নয়, বরং সমাজে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করার একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
গত সরকার, বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে একদিকে যেমন কিছুটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ছয় থেকে সাত শতাংশের মধ্যে ছিল; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা, যেমন Human Rights Watch ও Amnesty International বারবার গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে দেশে জঙ্গিবাদের হুমকি থাকলেও কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে তা কখনো হালে পানি পায়নি। বিশেষ করে স্বৈরাচারী হাসিনার সময় সবকটি জঙ্গি ঘটনাকে অনেকেই সরকারের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিদেশি প্রভুদের সহানুভূতি অর্জনের জন্য বানোয়াট সাজানো নাটক বলে মত প্রকাশ করেন। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, এই ‘জঙ্গি’ বর্ণনাটি কখনো কখনো অতিরঞ্জিতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে অনেক নিরপরাধ মানুষও বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বাহ্যিক নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিভাজন। রাজনৈতিক মতভেদ এখন অনেক ক্ষেত্রেই শত্রুতায় রূপ নিচ্ছে, যা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কোনো দেশের জন্য বাইরের হুমকির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। যখন যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘মিলিট্যান্ট’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ প্রভৃতির মতো স্পর্শকাতর শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে, সমাজের একটি অংশকে বিচ্ছিন্ন করে এবং প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেকোনো দাবি যেন প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, ব্যক্তিনির্ভর শাসন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, একই সঙ্গে আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে ভুয়া তথ্য মোকাবিলা করতে হবে; কিন্তু কোনোভাবেই ভয়ভীতি বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়। রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। মানুষকে সচেতন হতে হবে, যেকোনো বর্ণনাকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে তা যাচাই করতে হবে। গুজব, বিদ্বেষ ও বিভাজনমূলক রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে। দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। অতীতের অর্জন—অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা—এগুলো ধরে রাখতে হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখতে হবে। একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে উঠবে না ভয়, বিভ্রান্তি বা দমননীতির মাধ্যমে; বরং তা গড়ে উঠবে জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। এই দেশ কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর নয়, এটি জনগণের। তাই সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। মতভেদ থাকবে, কারণ সেটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই মতভেদ যেন বিভক্তিতে রূপ না নেয়। সমালোচনা থাকবে, কিন্তু তা যেন সত্য ও যুক্তির ভিত্তিতে হয়, তৈরি করা বর্ণনার ওপর নয়। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নির্ভর করছে আমাদের ঐক্যের ওপর। বিভক্তি নয়, ঐক্যই হতে হবে আমাদের শক্তি। তাহলেই আমরা আমাদের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকে সত্যিকার অর্থে রক্ষা করতে পারব।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি পাকিস্তানের একটি সুপরিচিত জঙ্গি সংগঠন, যা ২০০৭ সালে বিভিন্ন উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত হয়। এর কার্যক্রম মূলত পাকিস্তানের ভেতরে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। পাকিস্তান সরকার বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে, এই সংগঠন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয় পায় এবং কখনো কখনো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মদতও পেয়ে থাকে। পাকিস্তানকে চাপের মাঝে রাখার জন্য ভারত কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন এবং অতি সম্প্রতি আফগানিস্তানের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এটাও সত্য, আধুনিক জঙ্গি সংগঠনগুলো কেবল একটি ভৌগোলিক বা আদর্শিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রোপাগান্ডা চালায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। এই প্রবণতা শুধু টিটিপি নয়, বিশ্বজুড়ে বহু উগ্রপন্থি সংগঠনের মধ্যেই দেখা যায়। ফলে ‘অনলাইন র্যাডিকালাইজেশন’ এখন একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো সংবেদনশীল। বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদের হুমকি সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক জটিলতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আস্থার যে ধীর পুনর্গঠন শুরু হয়েছে, তা একটি দেশের সহ্য হচ্ছে না এবং তা বিভিন্নভাবে প্রতিহত বা ব্যাহত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বয়ান তৈরি সেই পরিকল্পনারই অংশ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ‘বর্ণনা’ বা narrative-এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, রাষ্ট্রগুলো সরাসরি সংঘাতের না গিয়েও তথ্যযুদ্ধ, কূটনৈতিক বার্তা এবং মিডিয়া প্রভাবের মাধ্যমে একে অপরের সম্পর্ককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তবে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলার আগে শক্ত প্রমাণ থাকা জরুরি। অন্যথায় তা নিজেই একটি নতুন বিভ্রান্তিকর বর্ণনায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠা বা ভেঙে যাওয়া যেন বাহ্যিক প্রভাব নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করে। একইভাবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বা হুমকি মূল্যায়ন করতে হবে পেশাদার গোয়েন্দা বিশ্লেষণের মাধ্যমে, জনমত প্রভাবিত করার বর্ণনার মাধ্যমে নয়। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া যেকোনো তথ্য, বিশেষ করে জঙ্গিবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ এ ধরনের তথ্য সহজেই বিভ্রান্তি, অবিশ্বাস ও অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে। সবশেষে, বাংলাদেশ যদি সত্যিই তার সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তাহলে তাকে একটি নীতিগত অবস্থান নিতে হবে, যেখানে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় ঐক্য হবে মূল ভিত্তি। অন্যের বর্ণনার ফাঁদে না পড়ে নিজেদের বাস্তবতা ও স্বার্থকে সামনে রেখে এগোনোর মধ্যেই রয়েছে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের পথ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকত