Image description

আলফাজ আনাম

নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ গোপন করে অন্য দলের রাজনীতি করার ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। আবার ডান ও বাম উভয় দলের নেতাদের দলবদল করে বড় দলে যোগদানের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। তবে আদর্শিক কারণে অন্য দলে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন সবচেয়ে অগ্রগামী। বামপন্থি নেতাদের পরিচয় গোপন করে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো বড় দলে যোগ দেওয়ার ঘটনা এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘এন্ট্রিজম’ হিসেবে পরিচিত। কৌশলগত কারণে সাধারণত এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কমিউনিস্ট পার্টির লোক ছিলেন বলে অনেকে মনে করেন।

গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এবং আশির দশকে অনেক মস্কোপন্থি বাম নেতা তাদের আগের পরিচয় আড়ালে রেখে বা আগের দল ত্যাগ করে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এ যোগদানগুলোকে আওয়ামী লীগে ‘কমিউনিস্ট অনুপ্রবেশ’ হিসেবে দেখা হতো।

বিএনপি যখন গঠিত হয়, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাম ও ডান—উভয় মেরু থেকে নেতাদের টানার কৌশল নিয়েছিলেন। অনেক কট্টর বামপন্থি নেতা তাদের পরিচয় আড়ালে রেখে বা আদর্শ বদলে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মতো বামপন্থি নেতাকে যেমন দলে নিয়েছিলেন, তেমনি শাহ আজিজুর রহমানের মতো মুসলিম লীগ নেতাকেও দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

তাত্ত্বিকভাবে বামপন্থিদের মধ্যে একটি কৌশল প্রচলিত ছিল, বিপ্লব সফল করতে হলে বড় দলগুলোর ভেতরে ঢুকে সেগুলোকে ভেতর থেকে প্রভাবিত করতে হবে। অনেক বামপন্থি কর্মী বা মধ্যম সারির নেতা পরিচয় গোপন রেখে বা নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মূলধারার দলে ঢুকে পড়েন। তারা দলের নীতিনির্ধারণে সমাজতান্ত্রিক বা বাম ঘরানার চিন্তাধারা প্রবেশ করানোর চেষ্টা করতেন। তবে বামপন্থি অনুপ্রবেশকারীদের অনেকে যখন ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন, তখন আদর্শের চেয়ে দলের মধ্যে প্রভাব ধরে রাখা কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখা হয়ে ওঠে রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।

সরাসরি সক্রিয় রাজনীতি না করলেও বামপন্থি বুদ্ধিজীবীরা অনেক সময় বড় দলগুলোর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন, যারা তাদের পুরোনো বামপন্থি পরিচয় সামনে আনেন না। বাংলাদেশে বামপন্থিদের এই অন্য দলে মিশে যাওয়াকে অনেক সময় রাজনৈতিক ভাষায় ‘কমিউনিস্টদের ডালপালা বিস্তার’ হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে বড় দলগুলোর ভেতরের আদর্শিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। কিন্তু এই নেতারা অতীতে আওয়ামী লীগ ও বর্তমানে বিএনপির মধ্যে শক্তিশালী বাম ব্লক তৈরি করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত দলের মধ্যে একটি প্রভাবশালী ক্ষমতা বলয় তৈরি করে। তারা ঠিক করেন কে কোন পদে বসবেন, কারা মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হবেন। এর ফলে বাম ধারার বাইরে অথবা ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা অনেক যোগ্য নেতা বঞ্চিত হন। অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। এবারের ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রিসভা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগে এর প্রতিফলন দেখা গেছে।

সাবেক বাম নেতাদের পুরোনো আদর্শভিত্তিক বিভাজন নিয়ে তেমন সমালোচনা হয় না। এর বড় কারণ হলো বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাম প্রভাব থাকায় তারা বিষয়গুলো কখনো সামনে আনেন না।

কমিউনিস্ট পার্টির মতো ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। এটিও উপমহাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক দলের একটি। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের পরিচয় গোপন করে অথবা দল বদল করে অন্য দলে যোগ দেওয়ার ঘটনা চোখে পড়ে না। অন্তত দলের প্রথম সারির কোনো নেতা এখন পর্যন্ত দল বদল করে অন্য দলে যোগ দেননি। যদিও দলটি নানা সময় ভাঙনের মুখে পড়েছে, কিন্তু তারা আরেকটি দল গঠন করেছে। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর দলের অনেক নেতা আত্মগোপনে থাকলেও অন্য দলে অনুপ্রবেশ করেননি। তবে জিয়াউর রহমান যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের উদ্যোগ নেন, তখন ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ পরে জামায়াতে ইসলামী নামে দলটি রাজনীতি শুরু করে। আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কমিউনিস্টদের মতো অন্য দলে অনুপ্রবেশের কৌশল জামায়াতে ইসলামীর নেই বলে মনে হয়।

 

গুপ্ত-ও-নির্মূলের-রাজনীতি

 

৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়—এই ছাত্র সংগঠনের নেতাদের কেউ কেউ ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ছাত্রশিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেই ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উত্তপ্ত। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের পক্ষ থেকে শিবিরের বিরুদ্ধে গুপ্ত রাজনীতির তীব্র অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একসঙ্গে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন করেছে, একসঙ্গে জেলে গেছে, লুকিয়ে থেকেছে। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে দুজন শিবির নেতা নিহত হয়েছিলেন। সেই শিবিরের নেতাদের এখন ছাত্রদল চিনতে পারছে না; তারা হয়ে গেছে গুপ্ত। বিচিত্র এক ক্ষমতার রাজনীতি!

শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় ভিন্নমতাবলম্বী ছাত্ররা অবস্থান করতে পারত না। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বহু নেতা-কর্মী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অনেকের শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি টানতে হয়েছে; এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়েছে। অনেককে দেশ ছাড়তেও হয়েছে। এমনকি ছাত্রলীগের হাতে এই দুই সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

হাসিনার দুঃশাসনের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্যে তেমন কোনো তৎপরতা ছিল না। এরপরও যেসব ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোয় অবস্থান করতেন, তারা পরিচয় গোপন করে অবস্থান করতেন। পরিচয় প্রকাশ হওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাদের ওপর নিপীড়ন নেমে আসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি টেনে আনা। লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিচয় গোপন করা আর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য ভিন্ন দলের মিছিল-সমাবেশে যাওয়া—দুই বিষয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

ছাত্রশিবিরের যেসব নেতার বিরুদ্ধে গুপ্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তারা যদি ছাত্রলীগের রাজনীতি ধারণ করতেন, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করার কোনো কারণ ছিল না। আবার নির্বাচিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রদল বা অন্য ছাত্র সংগঠন কার্যক্রম চালাতে পারছে না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তাহলে কেন এই অস্থিরতা?

আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ছাত্রদল এক ধরনের হীনম্মন্যতাজনিত সংকটের মধ্যে পড়েছে। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের নিপীড়নমূলক শাসনে ছাত্রদলের স্বাভাবিক কার্যক্রম না থাকায় নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ গড়ে ওঠেনি। বছরের পর বছর একই ব্যক্তি ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ফলে ছাত্রদের মধ্যে তারা কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। এমনকি সাধারণ ছাত্রদের আকৃষ্ট করার মতো কর্মসূচি নেই। স্বাভাবিকভাবে এই স্থানটি পূরণ করছে ছাত্রশিবির।

জাতীয় নির্বাচনের পর ছাত্রদলের সংকট আরো গভীর হয়েছে। বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিরোধী ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র প্রভাব সরকারের জন্য বড় ধরনের হুমকি। বিএনপির ভেতরে বাম ধারার নেতা ও কৌশলবিদরা এ বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা করছেন। তারা মনে করেন, যেকোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শামিল হলে তা বড় আকারে দানা বাঁধতে পারে। বিএনপি নেতাদের এ ধরনের চিন্তার প্রভাব পড়ছে ছাত্রদলের ওপর। তারা একধরনের চাপ অনুভব করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা আছে তাদের মধ্যে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও অস্থির হয়ে উঠছে।

জাতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে খুব তিক্ত সম্পর্ক আছে, তা নয়। নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ আনা হলেও তা জোরালো ছিল না; বরং নির্বাচনে কিছু অনিয়মের প্রশ্ন সামনে আনার চেষ্টা হয়েছিল। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু সভা-সমাবেশ ছাড়া মাঠের রাজনীতিতে তেমন কোনো উত্তাপ নেই। এর মধ্যে আমরা রাজনীতিতে কিছু সুবাতাস দেখেছি। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের দুই নেতার বাসায় গেছেন। বিরোধী দলের ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়েছেন। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের দেওয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংসদে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু এই পরিবেশ কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখন সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত কোনো ছোট দল নয়, দেশের প্রধান বিরোধী দল, যে দলের নেতৃত্বাধীন জোট ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। প্রধান বিরোধী দলকে যদি নির্মূল করার নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে—দেশে কি বিরোধী দল থাকবে না? কিছু সরকারপন্থি উগ্র আলোচক বিরোধী দলের রাজনীতিকে তুলনা করছেন জার্মানির ইহুদিদের ভূমিকার সঙ্গে। হিটলারের ইহুদি নিধনের মতো বিরোধী দলকে নিধনের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। সরকারকে কি তাহলে হিটলারের মতো ফ্যাসিস্ট হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? এসব বক্তব্য দেশের রাজনীতিকে শুধু উত্তপ্ত করবে না, আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির মধ্যপন্থার রাজনীতি প্রশ্নের মুখে পড়বে।

বিএনপি বিরোধী দলবিহীন বা একদলীয় শাসনের রাজনীতির পথে যেতে পারবে—দলটির অতীত ইতিহাস তা বলে না। এ ধরনের বক্তব্যের মূলে রয়েছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশন। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হয়তো স্টালিনের চিন্তাভাবনা দিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বিএনপিতে এলেও তিনি হয়তো আগের মতাদর্শ অনুসরণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার জন্য শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির চেয়েও গুপ্ত মতাদর্শ লালন করে নির্মূলের রাজনীতির ডাক দেওয়া আরো বেশি ভয়ংকর।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নির্মূল’ শব্দটি নতুন নয়। ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে গঠন করা হয় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই কমিটির আন্দোলনের ফল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের শুধু ফাঁসিতে ঝুলতে হয়নি, বিএনপি ক্ষমতার রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছিল।

১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়। কিন্তু তা সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট ছিল না। জামায়াত অনেকটা নিঃশর্ত সমর্থন দিলে বিএনপি সরকার গঠন করে। এর এক বছরের মাথায় গঠন করা হয় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এই কমিটি গঠনের আইডিয়া এসেছিল রাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের মাথা থেকে, যার সঙ্গে আরো কিছু লেখক-সাংবাদিক জড়িত ছিলেন। সেইসঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অগোচরে তার কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

এরপর জামায়াতের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। জামায়াত নেতারা মনে করলেন, বিএনপি যেখানে তাদের রাজাকার আর ’৭১-এর পরাজিত শক্তি বলে কোণঠাসা করছে, তাহলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পার্থক্য কী? কী লাভ হলো বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে—এমন প্রশ্ন তুললেন কোনো কোনো নেতা। এর মধ্যে খবর এলো শেখ হাসিনা নিজেই নাকি জাহানারা ইমামকে পছন্দ করেন না। জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। এরপর একসঙ্গে ’৯৩ সালে সংসদ বর্জন। চরম বেকায়দায় পড়া বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে; এরপর তারা কেয়ারটেকার সরকারের দাবি মেনে নেয় এবং সেই কেয়ারটেকার সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেয়। পরে ’৯৬ সালের জুনে আরেকটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পুনর্জীবন পায়।

’৯২ সালে যারা গণআদালত গঠন করেছিল, তাদের ভাবশিষ্যদের অনেকে এখন প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো একই পরিকল্পনার অংশ কি না, এমন প্রশ্নও তোলা যেতে পারে। প্রশাসনে ‘গুপ্ত খেদাও’ শুরু করতে গিয়ে অর্ধেকের কাছাকাছি জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। এমনকি আওয়ামী মন্ত্রীদের পিএসরা পর্যন্ত মাঠ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন, এমন খবর সংবাদপত্রে এসেছে। কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা নেই, এমন অনেক ধর্মভীরু ও সৎ অফিসার বাদ পড়ছেন। বিএনপির ভেতরে একপক্ষ অন্যপক্ষকে এখন ‘গুপ্ত’ ট্যাগ দিয়ে কোণঠাসা করছে।

এর প্রভাব কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে। সংসদে দুই রহমান যতই মধুর আলাপ করুক না কেন, মাঠপর্যায়ে সংঘাত তীব্র রূপ নেবে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বিরোধী দলের ওপর সরকারের দেওয়া নির্দেশনার বাইরে গিয়ে নিপীড়ন চালাবে। মাঠপর্যায়ের চাপে বিরোধী দলের নেতা শেষ পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার রাজনীতি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হতে পারেন।

এছাড়া সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলেও ভোটের বিশ্লেষণ কিন্তু অন্য রকম চিত্র দেখায়। বিএনপি এবার ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের ভোট যদি ১৮ বা ২০ শতাংশ পেয়ে থাকে তাহলে বিএনপির প্রকৃত সমর্থকদের ভোট এসেছে ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ। অপরদিকে জামায়াত-এনসিপির ভোট ৩৮ শতাংশ। যারা সবসময় বিএনপিকে ভোট দেয়, এমন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোটার জামায়াত-এনসিপিকে ভোট দিয়েছে। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কখনো বিএনপির জন্য মাঠে সরব হবে না।

সামনে এই সরকারকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না। বেশি দামে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কিনে এই ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সামনে তেলের পর বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। এমনকি আরো এক দফা জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের সঙ্গে সহযোগিতা ও সহাবস্থান ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন হবে। শুধু বিদ্যুৎ ও সার নিয়ে যে ধরনের সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, তা মোকাবিলা করা হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে নির্মূলের রাজনীতি নয়, এখন দরকার সৌহার্দ্য ও সমঝোতার রাজনীতি।

 

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ