ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণ
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক এখনো দৃঢ় থাকলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জনগণের মধ্যে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব বাড়ছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ভারতের প্রসঙ্গে বিতর্কিত মন্তব্য শেয়ার করলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এতে ভারতকে “হেলহোল” হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এটিকে “অজ্ঞতাপূর্ণ ও রুচিহীন” বলে আখ্যা দেয়।
কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারত ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত এখন এই সম্পর্ককে আগের মতো “আদর্শ” হিসেবে নয়, বরং বেশি বাস্তববাদী ও লেনদেনভিত্তিকভাবে দেখতে শুরু করেছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
কাশ্মীর ইস্যুতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি বড় ধরনের বিরোধ তৈরি করে। ভারত স্পষ্টভাবে জানায়, পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা দ্বিপাক্ষিক। তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
এছাড়া রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ২০২৫ সালে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ভারতের প্রতি “বৈরী পদক্ষেপ” হিসেবে দেখা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি, বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসা সীমাবদ্ধতা, এবং বৈশ্বিক সংকট (যেমন ইরান যুদ্ধ) ভারতের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। রুপির অবমূল্যায়ন, শেয়ারবাজারের পতন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
এর ফলে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে হতাশা বাড়ছে—যারা আগে ট্রাম্পের নীতির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
মিডিয়া ও জনমতের পরিবর্তন
ভারতের মূলধারার মিডিয়া ও জনপ্রিয় ইউটিউবারদের অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নিতেন, এখন সেখানে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে এবং ধীরে ধীরে ‘মার্কিন-বিরোধী’ অনুভূতি শক্তিশালী করছে।
ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমানে এই জনমতের পরিবর্তন দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করবে না। তবে সম্পর্কের ভিত্তি এখন আগের মতো আবেগ বা অনুপ্রেরণার ওপর নয়—বরং লাভ-ক্ষতি ও বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেক ভারতীয়র কাছে আর আদর্শ নয়, বরং এমন একটি শক্তি—যার সিদ্ধান্ত তাদের দৈনন্দিন জীবনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিই ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা নির্ধারণ করতে পারে।