মোস্তফা কামাল
দেশের অর্থনীতির কোনো খাত কিংবা সূচকে সামান্যতম স্বস্তির খবর নেই। তার ওপর বৈশ্বিক সংকটের অনিবার্য তোড়ে মানবতার বিপর্যস্ত অবস্থা।
এর মধ্যেই হামে প্রতিদিন শিশুমৃত্যুর মিছিল। বড় রকমের প্রাকৃতিক ঝড়ের পূর্বাভাস।
এই উড়োজাহাজগুলো ডেলিভারি আসতে লাগবে পাঁচ বছর। আলোচনা আছে এয়ারবাস লিজ নেওয়ার সমান্তরাল পরিকল্পনা নিয়েও।
এ নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড়ে ব্যস্ত একটি স্বার্থবাদী মহল। দোহাই দেওয়া হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তীব্র উড়োজাহাজ সংকট কাটাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, বাজারের চাহিদা ও অপারেশনাল ব্যবসার প্রয়োজনেই এই সিদ্ধান্ত। দাদাকে আদা পড়া খাওয়ানোর মতো যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ ও জ্বালানিসম্পদ আমদানি করলে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং সম্পর্ক উন্নয়নে তা কাজে দেবে বলে যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছে। শুধু এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ নন, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষও বিশাল অঙ্কের এ কেনাকাটার কার্যকারিতা ও সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং বাংলাদেশকে তাদের প্রোডাক্ট গছানোর চেষ্টায় সক্রিয় অনেক দিন থেকেই।
সেই চেষ্টা গেল আওয়ামী লীগ আমলে করেছে, প্রফেসর ড. ইউনূসের ইন্টেরিমের সময় করেছে।
দেশের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচিত সরকার আসার পরও হাল ছাড়েনি। অবিরাম আয়ত্তের চেষ্টা করেছে সরকার ও বাংলাদেশ বিমানের একটি অংশকে। কামিয়াবিও হতে চলেছে। অপেক্ষা করছে আগামী কয়েক দিনের। সেখানে আবার তারা সাফল্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক ও আগ্রহের খবর মার্কেটিংও করছে। খবরের এই মার্কেটিংয়ে জানানো হয়েছে, বর্তমানে বিমানের বহরে আন্তর্জাতিক রুটের জন্য ১৯টি উড়োজাহাজ থাকলেও ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মেটাতে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি উড়োজাহাজ দরকার। ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে বলে যুক্তি ও ধারণা দেওয়ার এন্তার চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা বাড়ানোর মনলোভা তথ্য।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ম্যাক্স ও পাঁচটি ড্যাশ ৮-৪০০ উড়োজাহাজ। নতুন ১০টি ড্রিমলাইনার যুক্ত হওয়ার পর বিমানের বহরে এই মডেলের উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়ে হবে ১৬টি। আর ৭৩৭-৮০০ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়ে আটটিতে উন্নীত হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক এড়াতে এয়ারবাসের পরিবর্তে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সিদ্ধান্তের পর ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও বাংলাদেশে তাদের তৎপরতা বাড়ায়। এখন সফলতা পাওয়ার সন্ধিক্ষণে তারা।
প্রধানমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার নির্দেশ দিয়েছেন—এ কথা বেশি বেশি চাউর করে কাজটি সারিয়ে নিতে যারপরনাই তৎপর মহলবিশেষ। এই প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫০ বিলিয়ন টাকা বা ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারের এই সিদ্ধান্তটি মূলত পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের একটি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকেছিল। এখন বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গেও সরকারের আলোচনা চলছে। এ ছাড়া স্বল্প মেয়াদে বিমানের বহর বাড়াতে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে লিজ বা ভাড়ার ভিত্তিতে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বহর সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী জুন মাসে জাপানের টোকিওতে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থগিত করা হয়েছিল।
সময়টা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের তাবৎ অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে বিমান কেনার মতো প্রকল্প সরকারের সাশ্রয়ী নীতির সঙ্গে মানায় না বলে অভিমত অনেকের। যেখানে সংকটের পর সংকট। জ্বালানি তেল নিয়ে চরম ভোগান্তি, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে শিল্প, বিনিয়োগে নিদারুণ স্তব্ধতা। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। তীব্র দাবদাহের সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে রাজধানীর বাইরের সাধারণ মানুষ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার গড়ে লোডশেডিং ছিল আড়াই হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকটে বেশ কিছুদিন বন্ধ ২০টির মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র। শিগগিরই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা নেই। ডিজেলের অভাবে কৃষি সেক্টরে সেচ নিয়ে হাহাকার। কৃষি উৎপাদন ব্যাহতের জেরে সামনে খাদ্যসংকটের শঙ্কাও রয়েছে। হাম পরিস্থিতি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মৃত্যু ও আক্রান্তের হার বাড়ছেই। এই ধারাবাহিকতায় হাম মহামারি পর্যায়ে চলে যায় কি না সেই ভাবনা জনস্বার্থ বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা বলছেন, সঠিক পদ্ধতি না মানলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের কেউ কেউ হাম নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামের চাপে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত মানুষ ক্লান্ত, অসহায়। এ রকম সময়ে বোয়িং বিমান কেনা সাধারণ মানুষের নজরে শুধু বিলাসিতাই নয়, এক ধরনের ভীমরতিও।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন