আহসান হাবিব বরুন
গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে বাক স্বাধীনতা। মানুষের চিন্তা, মতামত, বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের এই অধিকারই একটি রাষ্ট্রকে জীবন্ত রাখে।
কিন্তু এই স্বাধীনতারও একটি নৈতিক ও সামাজিক সীমারেখা আছে। যখন এই স্বাধীনতা ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ ভাষা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর স্বাধীনতা থাকে না—বরং সেটি সমাজের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে,এই সীমারেখা অতিক্রমের পরিণতি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে যে কটূক্তি করেছেন, তা শুধু একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য নয়—এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজনীতি হওয়ার কথা মানুষের কল্যাণ, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার জায়গা। সেখানে মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে—কিন্তু তা হবে যুক্তি ও শালীনতার মধ্যে। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অশালীন ভাষা কখনোই সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা জরুরি। নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তারেক রহমান এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি বিরোধী নেতাদের বাসায় গিয়ে সৌজন্যতা বিনিময় করেছেন, সংলাপের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। বারবার তিনি সহনশীল আচরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তার এই ইতিবাচক ও মানবিক আহ্বানের বিপরীতে বিরোধী শিবিরের একটি অংশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াত ইসলামের কিছু বক্তব্য ও অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক, অসহযোগিতামূলক এবং শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে।
নির্বাচনের আগে জামায়াত ইসলামের আমির শফিকুর রহমান একটি জনসভায় তারেক রহমানকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, 'রাখ তোর ফ্যামিলি কার্ড।' হাসিনা রেজিম পতনের পর বলেছিলেন,' আমরা এক ফ্যাসিস্ট এর হাত থেকে আরেক ফ্যাসিস্ট এর হাতে যেতে চায় না।' এসবই একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। এই বক্তব্যগুলোকে কেউ রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে দেখতেই পারেন, কিন্তু ভাষার ধরন এবং লক্ষ্যবস্তু বিবেচনায় এগুলো অনেকাংশে ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে পড়ে। এতে করে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—যেখানে একটি পক্ষ সংলাপ ও সহনশীলতার আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে অন্য পক্ষ যদি কটূক্তি ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে, তাহলে কি সেই পরিবেশে একটি সুস্থ গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভাষা ও আচরণের সঙ্গে অতীতের কিছু নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। এক সময় পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে রুচিহীন ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করতেন, আজকের কিছু বক্তব্যে তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। রাশেদ প্রধানের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে—এটি কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি আমরা আবার সেই পুরনো অসুস্থ রাজনৈতিক ধারার দিকেই ফিরে যাচ্ছি?
তবে এখানে আমাকে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, রাশেদ প্রধানের কটূক্তি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় সহিংস আচরণও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে তার বাসভবনের সামনে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি, হামলা বা ইট,পাটকেল নিক্ষেপ—এসব ঘটনাও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
প্রসঙ্গত,আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার সনদগুলোতেও স্পষ্টভাবে বলা আছে—বাক স্বাধীনতা ব্যবহার করতে হবে দায়িত্বশীলতার সাথে। অন্যের সম্মানহানি, মিথ্যা প্রচার, বিদ্বেষ ছড়ানো বা সহিংসতা উসকে দেওয়া কোনোভাবেই এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এই সীমারেখা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। সেখানে রাজনৈতিক নেতারা পরস্পরের সমালোচনা করেন, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অশালীন ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন।
সুতরাং, বাংলাদেশ একটি কার্যকর রাষ্ট্র। এখানে কেউ যদি সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত আইনের মাধ্যমে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং এটি সমাজে আরও অস্থিরতা তৈরি করে এবং আইনের শাসনকে আরো বেশি দুর্বল করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা হল,একটি ভুলের জবাব আরেকটি ভুল দিয়ে হতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল—উভয়েরই উচিত সংযম দেখানো। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থিতিশীলতা ও ঐক্য। রাজনৈতিক উত্তেজনা বা কটূক্তি কখনোই সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক নয়।
এদিকে,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার এই সমস্যাকে আরও বড় করে তুলেছে। এখন একটি বক্তব্য মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে একটি অসংযত মন্তব্য খুব দ্রুত বড় ধরনের বিতর্ক বা উত্তেজনার জন্ম দেয়। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।
তরুণ প্রজন্মের কথাও এখানে ভাবতে হবে। তারা রাজনীতির ভাষা ও আচরণ দেখে শেখে। যদি তারা দেখে রাজনীতিতে কটূক্তি, আক্রমণ আর অসহিষ্ণুতা স্বাভাবিক—তাহলে ভবিষ্যতের রাজনীতিও সেই পথেই হাঁটবে। কিন্তু আমরা যদি শালীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের চর্চা করি, তাহলে তারাও সেটিই অনুসরণ করবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা চাইলে উত্তেজনা বাড়াতে পারে, আবার চাইলে দায়িত্বশীলভাবে বিষয়টি তুলে ধরে সমাজকে সচেতন করতে পারে। তাই গণমাধ্যমেরও ভূমিকা হতে হবে সংযত ও দায়িত্বশীল। ভিউ বাড়ানোর জন্য উত্তেজনাকর কন্টেন্ট তৈরি করা কোনো পেশাদার গণমাধ্যমের কাজ হতে পারে না। এ বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
পরিশেষে বলা যায়, বাক স্বাধীনতা আমাদের একটি মূল্যবান অধিকার। কিন্তু এই অধিকার তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দায়িত্বশীলতার সাথে ব্যবহার করা হয়। অন্যথায় এটি সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং অস্থিরতার জন্ম দেয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা—আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে ।
সুতরাং কোনো মানদন্ডেই বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।