মাহমুদুর রহমান
বিষয়ের ব্যাপকতার জন্য আজকের লেখাটি অত্যন্ত দীর্ঘ হবে বলে বিরক্ত পাঠকের কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখছি। ধৈর্য ধরে পড়লে সবাই বুঝবেন যে, প্রতিটি বিষয়ের পূর্বাপর সম্পর্কের ফলে আমার আসলেই সংক্ষিপ্ত আকারে কিংবা দুই বুধবারে ভাগ করে লেখার উপায় ছিল না।
অতীতের কথা
শহীদ জিয়া একদলীয় বাকশাল পতন-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে জাতীয়তাবাদী ধারার বিএনপি প্রতিষ্ঠা করার সময় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কাঠামো সম্পর্কে ঠিক কী চিন্তাভাবনা করেছিলেন, আমার জানা নেই। তবে যেহেতু মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাল্টা মতবাদ হিসেবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব হাজির করেছিলেন এবং সংবিধান থেকে ‘সেক্যুলারিজম’ সরিয়ে সেখানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা’ স্থাপন করেছিলেন—তাই ধারণা করি, দেশের নব্বই শতাংশ বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেই তিনি মনেপ্রাণে লালন করতেন। বেগম খালেদা জিয়া যে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনে সর্বদা বাঙালি মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনাচারকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন—এ নিয়েও সম্ভবত কোনো বিতর্ক নেই। ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা’, দেশনেত্রীর সেই অবিস্মরণীয় স্লোগান সব প্রকৃত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীর চিরায়ত মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। মাত্র আট শব্দের কথাটির মধ্যে তিনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার সংগ্রামের বিভেদরেখা সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে গেছেন। এবার আসি তাদের ছেলে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংস্কৃতিচিন্তা প্রসঙ্গে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকারে দায়িত্ব পালনকালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। তৎকালীন এবং বর্তমান সরকারের একাধিক প্রভাবশালীও সেসব সফরে সঙ্গী ছিলেন। একসঙ্গে বিদেশে গেলে ক্ষমতাবানদের সঙ্গেও নানা বিষয়ে আলাপের বিরল সুযোগ ঘটে। সে ধরনের এক ঘরোয়া আলাপে আমরা সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ করছিলাম। হঠাৎ আমাকে বেজায় অবাক করে সে সময় একেবারে তরুণ তারেক রহমান প্রশ্ন করলেন, মাংস এবং গোশতের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের কোন শব্দটি সচরাচর ব্যবহার করা উচিত? তখন পর্যন্ত অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির বাইরে আমার বিশেষ পদচারণ ছিল না। তা ছাড়া এমন একটি অপ্রত্যাশিত, সিলেবাসবহির্ভূত প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতও ছিলাম না। মনে আছে, শুধু বলেছিলাম, দৈনন্দিন জীবনে আমি কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়া দুটোই ব্যবহার করি। সেদিন তারেক রহমানের প্রশ্নের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিচিন্তার প্রকাশে আমি যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলাম। বিএনপির ভবিষ্যৎ কর্ণধার যে এত তরুণ বয়সে আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন, এটাই আমাকে আশাবাদী করে তুলেছিল। রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের নিগূঢ় সম্পর্কটা তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠনের পর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেখে বেশ বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছি। সেটি খোলাসা করতেই আমার আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন। তবে, মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বাংলাদেশে ভিনদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ইতিহাস সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত প্রয়োজন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
আঠারো শতকে কলকাতায় ব্রিটিশ উপনিবেশের ছত্রছায়ায় যে তথাকথিত ‘বাঙালি রেনেসাঁস’ জন্ম নিয়েছিল, তার প্রধান উৎস ছিল হিন্দু ধর্ম এবং সংস্কৃতি। হিন্দু বাঙালির পুনর্জাগরণের লক্ষ্যেই ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত এবং দখলদার শাসকদের আনুকূল্যধন্য কলকাতার বাবুশ্রেণি এই উদ্যোগ নিয়েছিল। বাঙালি মুসলমানদের সেখানে সম্পূর্ণ ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল। মুসলমানের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি একেবারে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত সেই বাঙালি রেনেসাঁর চৌহদ্দিতে আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের প্রবেশের অধিকার ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের গেলানো হয়েছিল, সেটিও কিন্তু সেই আঠারো শতকের ইসলামোফোবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক ফোয়ারা থেকেই উৎসারিত। আজকের তরুণ জানে না যে, ১৯৭১ সালে বিজয় দিবসের পর কিছুদিন আমাদের রেডিও ও টেলিভিশনে সালাম দেওয়া এবং খোদা হাফেজ বলার রীতিও উঠে গিয়েছিল (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)। প্রবল জনমতের বাইরে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ কয়েকটি অখণ্ড পাকিস্তানপন্থি দলের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার সুযোগ নিয়ে সেই থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক জগতে ভারতীয় আদলে যে ইসলামবিদ্বেষের আবহ তৈরি করা হয়েছিল, আজ পর্যন্ত তার অবসান হয়নি। মাদরাসার ছাত্র হলেই তাকে ইসলামি জঙ্গি রূপে প্রচার, আলেম সমাজকে ‘ডিমোনাইজ’ করা, কুকুরের মাথায় টুপি দিয়ে ব্যঙ্গচিত্র বানানো, পবিত্র কোরআন শরিফের সুরার বিকৃতি, হিজাববিরোধী প্রচারণা—এসব কর্মকাণ্ড স্বাধীনতা-পরবর্তী এক পরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনেরই অংশ ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল এই দেশকে সম্পূর্ণভাবে ভারতীয়করণ করে ফেলা। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নব্য প্রভাবশালীর কণ্ঠেও আমরা যে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট জামানার অনুরূপ উগ্র মুসলমান, মৌলবাদ ইত্যাদি শব্দ শুনতে পাচ্ছি, সেটি প্রকৃতপক্ষে অর্ধশতাব্দীকাল ধরে চলমান সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা। জুলাই বিপ্লবে আমাদের তরুণরা শুধু ফ্যাসিবাদ থেকেই দেশকে মুক্ত করেনি, ভারতপন্থি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকেও শক্ত চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে মোকাবিলা করতে গিয়েই তরুণদের মধ্যে ক্রমেই তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠা শরীফ ওসমান হাদিকে শহীদ হতে হয়েছে। একটু লক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশের যে শ্রেণি এখন বিভিন্ন মিডিয়ায় জুলাইবিদ্বেষী প্রচার চালাচ্ছে, তারা সবাই চেতনাগতভাবে ইসলামবিদ্বেষী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এদেশীয় ‘ট্রোজান হর্স’। জুলাই বিপ্লবে এই গোষ্ঠী হেরে গেলেও প্রত্যাঘাতের জন্য নানা উপায়ে চেষ্টা করে চলেছে। শাহবাগি চেতনাজীবীদের বিএনপিতে অনুপ্রবেশ সেই পরিকল্পনার এক অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। ছত্রিশের লড়াই যে ৫ আগস্ট শেষ হয়নি, এই কঠিন বাস্তবতার আলোকে এবার বিএনপির সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক বিবর্তনের স্বরূপ বোঝার চেষ্টা করব।
নতুন বিএনপি সরকারের সব সাংস্কৃতিক সেনাপতি
মন্ত্রী : শুরু করা যাক মন্ত্রী মহোদয়কে দিয়ে। অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীকে বিএনপি সরকার এবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছে। জাতীয় পার্টি দিয়ে রাজনীতি শুরু করলেও পেশায় আইনজীবী নিতাই রায় দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তার সঙ্গে কয়েকবার দেখাশোনা হলেও ব্যক্তিগতভাবে তেমন মেশার সুযোগ হয়নি। তবে যতটুকু শুনেছি ও দেখেছি, তাতে সজ্জন মানুষ মনে হয়েছে। তিনি কখনো কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে তার কোনো লেখালেখিও চোখে পড়েনি। অর্থাৎ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার জন্য ওই বিষয়ে জানাশোনাটা সম্ভবত জরুরি নয়। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। বাংলাদেশের নব্বই শতাংশ বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি সম্পর্কে পেশায় আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরী জানেন তো? নাকি রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী সম্পর্কে না জেনেও সেই রাষ্ট্রের সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখা সম্ভব? বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াই কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দুই দশক আগে থেকে বুঝতে শুরু করেছিলেন। ফ্যাসিবাদের ষোলো বছরে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এবং পাঠ্যপুস্তকে যে ভয়াবহ ‘ডিইসলামাইজেশন’ চালানো হয়েছে, সেখান থেকে জাতিকে সঠিক পথে নিতে হলে অনেক পরিকল্পনা এবং কাজ করতে হবে, যার জন্য সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি প্রয়োজন। একটা উদাহরণ দিই।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ‘বাংলাদেশ জাতীয় অ্যাটলাস’ নামে সেই প্রাচীন বৈদিক যুগের বঙ্গ থেকে আজ পর্যন্ত মানচিত্র প্রকাশ করেছে। মানচিত্রবিষয়ক সেই বইয়ের সূচিপত্রে কয়েক শতাব্দীব্যাপী ‘স্বাধীন সুলতানি আমলের’ কোনো উল্লেখ পর্যন্ত নেই। অথচ প্রথমবারের মতো পূর্ব এবং পশ্চিম বাংলাকে একীভূত করে অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে স্বাধীন বাংলা সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। প্রথম স্বাধীন বাংলা ১৪ শতকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইলিয়াস শাহর আগে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯) দিল্লি থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও তিনি শুধু বাংলার পূর্ব অংশের সুলতান ছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির সুপ্ত ইসলামবিদ্বেষ এখানেই শেষ হয়নি। তারা পুরো সুলতানি আমলকে ‘গণেশ যুগে বঙ্গ’ নামে সূচিপত্রে উল্লেখ করেছে, যা দেখে যেকোনো পাঠকের মনে হবে, ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে ১৬০৫ সালে মোগল সুবে-বাংলা প্রতিষ্ঠা হওয়া পর্যন্ত ৪০০ বছর মুসলমানদের পরিবর্তে কোনো এক হিন্দু রাজা গণেশ ও তার বংশধররা বাংলা শাসন করেছেন। এশিয়াটিক সোসাইটি গণেশকে বিশেষভাবে ‘দিনাজপুরের একজন বাঙালি রাজা’ বর্ণনা করে হিন্দুত্ববাদী ভারতের চরম ইসলামবিদ্বেষী শাসকদল বিজেপির বয়ানের অনুকরণে সুলতানি আমলের মুসলমান শাসকদের প্রকারান্তরে বিদেশি বলতে চেয়েছে। অথচ মুসলমান শাসনের বিরুদ্ধে এই রাজা গণেশের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসখ্যাত সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহর মৃত্যুর পর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজা গণেশ ক্ষমতা পেলেও কিছুদিনের মধ্যে মুসলমানদের পাল্টা আক্রমণে তাকে সেই ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। পরে বিখ্যাত সুফি নূর কুতুব-ই-আলমের কাছে গণেশের ছেলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান জালাল উদ্দিন নামে দীর্ঘদিন বাংলা শাসন করেছিলেন। অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী যদি সত্যি বাংলার কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস জানেন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মারপ্যাঁচ বুঝতে পারেন, তাহলে তার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল। তবে ভয় হচ্ছে, ড. ইউনূসের জামানায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ থেকে মুক্তি পেয়ে আবার হয়তো আমরা সাংস্কৃতিক পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছি।
উপদেষ্টা : বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেসব নব্য বিএনপি ব্যক্তির চমকপ্রদ উত্থান ঘটেছে, তাদের মধ্যে ডা. জাহেদ-উর রহমান অন্যতম। প্রথমে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ‘স্ট্র্যাটেজিক উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি কি সরকারের, নাকি বিএনপির, নাকি উভয়েরই ‘স্ট্র্যাটেজি’ নির্ধারণের দায়িত্বে আছেন, সেটি অবশ্য আমার জানা নেই। সম্প্রতি তাকে সংস্কৃতি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুই অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তিনি এখন একের মধ্যে তিন। ২০১৮ সালে নির্বাসনে যাওয়া পর্যন্ত তাকে আমি চিনতাম না। বিএনপির কোনো আলোচনা অনুষ্ঠানেও দেখিনি। সম্ভবত ২০২১ সাল থেকে জানলাম যে তিনি লেখাপড়ায় ডাক্তার হলেও একজন আলোচিত ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটর, টকশো স্টার এবং শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচক। ২০২৪ সালে দেশে ফেরার পর তার কয়েকটি কনটেন্ট শুনে জানলাম তিনি ঘোরতর জামায়াত ও শিবিরবিরোধী এবং বিএনপির সমর্থক। আমার দেশ-এর সহকর্মীদের কাছ থেকে জেনেছি যে তিনি এখনো নাকি মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের একজন নেতা। সেটি হতেই পারে, কারণ তারেক রহমান নির্বাচনের অনেক আগে যে জাতীয় সরকারের ধারণা দিয়েছিলেন, সেখানে সমমনা দলের রাজপথের সাথিদের নিয়েই নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ডা. জাহেদ-উর রহমান সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার কয়েকটি ইউটিউব কনটেন্ট মনোযোগ দিয়ে শুনে তার সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন বোঝার চেষ্টা করেছি। ডা. জাহেদ-উর রহমানের নিজের বর্ণনা থেকেই তার চিন্তাচেতনা পাঠকদের এবার জানানোর চেষ্টা করব—
১. ডা. জাহেদ বাংলাদেশে প্রথম আলোকে একমাত্র ‘হ্যাডমওয়ালা, সেক্যুলার এবং লিবারেল’ সংবাদপত্র মনে করেন। ব্রাহ্মণ প্রথম আলো ছাড়া দেশের বাদবাকি মিডিয়া তার কাছে নিতান্তই নমঃশূদ্র।
২. হ্যাডমওয়ালা প্রথম আলোর একজন কলামিস্ট হিসেবে ডা. জাহেদের বেজায় গর্ববোধ রয়েছে।
৩. একসময় তারেক রহমানকে অন্যায় সমালোচনা করে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার কিছুটা ভুল করলেও মাহফুজ আনাম হাসিনার আমলে এক-এগারোর সময়কার সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করায় সেই অপরাধ এখন মিটে গেছে। তাই তার ভাষায় রাজনীতির ‘সুপার পাওয়ার’ বিএনপির মিডিয়ার ব্রাহ্মণ হাউসকে কোলে তুলে নেওয়া উচিত।
৪. আমার দেশ-এর প্রতি ডা. জাহেদ এতটা তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করেন যে তিনি কনটেন্টে একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের হেয় করার লোভ সংবরণ করতে পারেননি। নাম উহ্য রেখে আমাদের পত্রিকা সম্পর্কে তার কনটেন্টে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য নিম্নরূপ—
‘একটি পত্রিকা বন্ধ থাকার পর চালু হয়ে মনে করেছিল কী না কী হয়ে যাবে।’
আমার দেশকে লক্ষ্য করে উপরোক্ত মন্তব্য থেকে যে কেউ মনে করবেন আমরা চালাতে না পেরে কিংবা নিজের ইচ্ছায় ২০১৩ সাল থেকে পত্রিকা বন্ধ করে রেখেছিলাম এবং বিপ্লবের সুযোগ নিয়ে নতুন করে প্রকাশিত হওয়ার পর গত এক বছরে আমার দেশ মিডিয়া জগতে কোনো ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। দীর্ঘ পনেরো বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে যে ভয়ংকর নিপীড়ন চালিয়েছে, সেটিও স্ট্র্যাটেজি, সংস্কৃতি এবং তথ্য উপদেষ্টা তার কনটেন্টে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপেক্ষা করেছেন। আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের মধ্য দিয়ে বরং পত্রিকা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তার ব্যক্তিগত সন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ডা. জাহেদের আদর্শগত কারণে কোনো বিশেষ পত্রিকার প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং অন্য একটির প্রতি চরম বিদ্বেষ থাকতেই পারে। কিন্তু সরকারের অতীব প্রভাবশালী উপদেষ্টার এ-জাতীয় পক্ষপাতপূর্ণ আসক্তি আমাদের ফ্যাসিবাদের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
মইন-ফখরুদ্দীনের ভারতপন্থি সামরিক অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের ১৭ বছর (২০০৭-২০২৪) হ্যাডমওয়ালা প্রথম আলো-ডেইলি স্টার এবং আমার দেশ-এর ভূমিকার তুলনামূলক আলোচনার আগে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার যে গল্প ডা. জাহেদ-উর রহমান শুনিয়েছেন, সেটি যে ভুয়া, তার প্রমাণ দেওয়া আবশ্যক।
প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার এক-এগারো এবং শেখ হাসিনার পুরোটা শাসনকাল প্রধানত শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং জাতীয়তাবাদী দলের বিরুদ্ধে অর্ধসত্য এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যনির্ভর নোংরা ব্যক্তিগত চরিত্র হননসহ যাবতীয় প্রোপাগান্ডা চালালেও শেখ হাসিনার আমলে ডেইলি স্টার সম্পাদক ব্যক্তিগতভাবে শুধু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি আজ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানের কাছে মাফ চাওয়া তো দূরের কথা, কোনো রকম দুঃখ প্রকাশও করেননি। বরং কিছুদিন আগে বিএনপির এক অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বক্তৃতাকালে প্রকারান্তরে তার পত্রিকার বিএনপিবিরোধী সংবাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
তিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবল ক্ষমতাধর, আমার দেশবিদ্বেষী উপদেষ্টার আক্রোশ উৎপাদনের ঝুঁকি নিয়েও ইতিহাসের খাতিরে এবার প্রথম আলো এবং আমার দেশ-এর ভূমিকার তুলনামূলক আলোচনায় যেতে হচ্ছে। প্রথম আলো যখন বিএনপির ভাবমূর্তি নিকেশ করার মিশন নিয়ে মইন-ফখরুদ্দীন এবং হাসিনার সমর্থনে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছিল, তখন আমার দেশ ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একাকী কলম ধরেছে। ২০০৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এক অভিযোগের লিড নিউজ দিয়ে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সরাসরি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল। শেখ হাসিনার অভিযোগ ছিল—তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ লঘু করার জন্যই নাকি আমি ওই সংবাদ প্রকাশ করেছিলাম। ২০১০ সালে রিমান্ডে নিয়ে বারবার আমাকে ওই প্রশ্নই করা হয়েছিল। এই সংবাদ প্রকাশের পর নিয়মিত আমরা ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থায় বিচার বিভাগের অবক্ষয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেশুমার দুর্নীতি, বিরোধী মত দমন এবং দিল্লির কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছি আর বেগম খালেদা জিয়া প্রায় প্রতিটি জনসভায় আমার দেশ উঁচিয়ে ধরে হাসিনা সরকারের দুষ্কর্মের প্রমাণ দিয়েছেন। সেই সময়কার কয়েকটি আলোচিত লিড নিউজের তালিকা আজকের তরুণ পাঠকদের জন্য দলিল হিসেবে নিচে দিলাম—
১. চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে, ২১ এপ্রিল ২০১০
২. বিরোধী দল দমনে মামলার রেকর্ড, ২২ ডিসেম্বর ২০১১
৩. গভর্নমেন্ট গেছে পাগল হইয়া তারা একটা রায় চায়, ৯ ডিসেম্বর ২০১২
৪. অবরোধে অচল দেশ, কাল হরতাল, ১০ ডিসেম্বর ২০১২
৫. কারা শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বন্দি চাপে, ১৩ ডিসেম্বর ২০১২
৬. শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
৭. গণহত্যার মিছিলে আরো ২৪ লাশ, ৪ মার্চ ২০১৩
৮. বিপর্যস্ত দেশে মারমুখী সরকার, ৬ মার্চ ২০১৩
৯. আগ্রাসী পুলিশের বেপরোয়া গুলি, ৭ মার্চ ২০১৩
১০. ইতিহাসের জঘন্যতম পুলিশ অ্যাকশন, ১২ মার্চ ২০১৩ (১১ মার্চ বিএনপির নয়াপল্টন অফিসে তাণ্ডব চালায় হাসিনার ফ্যাসিস্ট পুলিশ)
খুনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি দিয়ে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছি, ‘সততায় পারবেন না প্রধানমন্ত্রী’। ১১ এপ্রিল ২০১৩ ভোর রাতে শেখ হাসিনা শত শত পুলিশ দিয়ে আমার দেশ প্রেস তালাবন্ধ করে এবং কারওয়ান বাজার অফিস থেকে সকাল ৮টার দিকে আমাকে দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তার করে ডিবিতে নিয়ে যান। আমরা যখন বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মমতম শাসকের বিরুদ্ধে ডা. জাহেদের ভাষায় এক তুচ্ছ হ্যাডমছাড়া পত্রিকা নিয়ে লড়াই করছিলাম, তখন আজকের প্রভাবশালী উপদেষ্টা নিশ্চয়ই প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আরো কোনো বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলছিলেন। আমি কারাবন্দি থাকায় হয়তো তার অতীত বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপ জানতে পারিনি। তবে হাসিনার আমলে তিনি কোনো ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, আমার জানা নেই।
যাহোক, এমন একজন ব্যক্তি যার কাছে পত্রিকা জগতে একমাত্র আদর্শ প্রথম আলো, তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে কোন আদর্শে পরিচালনা করবেন, সেটি বুঝতে পাঠকদের তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। উপদেষ্টার ভাষায় অতি তুচ্ছ পত্রিকা, আমার দেশ নিয়েই নব্য হ্যাডমওয়ালাদের সঙ্গে দিল্লি সমর্থিত ফ্যাসিবাদী জামানার মতোই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। এটা তো প্রমাণিত যে, আদর্শের ব্যাপারে আমি বড়ই অনমনীয়, যাকে আপনারা বলে থাকেন উগ্র এবং হঠকারী। দেখতেই তো পাচ্ছেন, দুই দশক ধরে আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রবল সন্দেহ হচ্ছে, সংস্কৃতি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সেনাপতিরা জাতীয়তাবাদী দলের অর্ধশতাব্দীর আদর্শ সত্যি কি ধারণ করেন? আমার প্রশ্নের জবাব হয়তো একদিন বিএনপির আদি নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা খোঁজার চেষ্টা করবেন।
শেষ কথা : মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের বিএনপি ধ্বংস করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য লড়াইয়ের সূচনার কাহিনি এবং ২০১৩ সালে আমার গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগের একটা ঘটনার কথা বলে আজকের দীর্ঘ লেখার সমাপ্তি টানব। আমার ধারণা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এসব কাহিনি কেউ জানাননি। ২০০৭ সাল। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং মরহুম আরাফাত রহমান কারাবন্দি। সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সভা নিষিদ্ধ। বিএনপির আজকের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সে সময় দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন না। আর আমি তো জাতীয়তাবাদের সমর্থক একজন সাধারণ পেশাজীবী মাত্র। নয়া দিগন্তে প্রতি সপ্তাহে সেনাসমর্থিত সরকারের দেশ ও বিএনপিবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কলাম লিখে ক্ষমতাসীনদের আক্রোশ উৎপাদন করছি। মির্জা ফখরুল একদিন আমার উত্তরা অফিসে এসে বললেন, মাহমুদ ভাই কী করা যায়? আমি প্রস্তাব করলাম একজন প্রধান অতিথি পেলে পেশাজীবীদের নিয়ে প্রেস ক্লাবে একটা প্রতিবাদ সভা করে মাঠে নামা যেতে পারে। মির্জা ফখরুল বললেন, আমরা একসঙ্গে গেলে তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার সম্মত হতে পারেন। সরকারে থাকতে আমার তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনার সুযোগ না হলেও মহাসচিব ভরসা দিলেন তিনি আমাকে অপছন্দ করেন না। আমরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নির্ধারিত দিনে তার বাসায় গেলে তিনি প্রধান অতিথি হতে সম্মত হলেন। আমরা প্রেস ক্লাবে প্যান্ডেল টানিয়ে মূলত প্রকৌশলী এবং কিছু অন্য পেশাজীবীকে নিয়ে সেই চরম বৈরী সময়ের প্রেক্ষাপটে বেশ বড় সভাই করতে পেরেছিলাম। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন। প্রথম সভার সাফল্য পরে সব পেশাজীবীকে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করেছিল।
দ্বিতীয় ঘটনা শেখ হাসিনার ছেলে জয়ের দুর্নীতির নথিপত্র সংগ্রহ নিয়ে। ২০২৬ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত, যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান নিজ উদ্যোগে বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাসিনাপুত্র জয়ের দুর্নীতির কিছু নথিপত্র জোগাড় করেছিলেন যে সম্পর্কে আমি বিন্দুবিসর্গ জানতাম না। ২০১৩ সালের এপ্রিলে আমি গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক দিন আগে বেশ রাতে শফিক ভাই হঠাৎ আমার দেশ অফিসে এসে হাজির হলেন। কয়েক মাস ধরে তখন অফিসবন্দি হয়ে গ্রেপ্তারের জন্য অপেক্ষা করছি। শুনলাম বেগম খালেদা জিয়ার কাছে শফিক রেহমান জয়ের দুর্নীতির কাগজপত্র সম্পর্কে বলতে গেলে তিনি নথির কপি আমার কাছে রাখতে বলেছেন। আমি কোনো কিছু না জানলেও ম্যাডামের কথা শিরোধার্য। ২০১৬ সালে আমি কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় এই এক রাতের ঘটনা নিয়ে এক হাস্যকরভাবে ভুয়া অপহরণ মামলা হলে আমার এবং শফিক ভাইয়ের সাত বছর করে সাজা হয়েছিল। তুরস্কের নির্বাসন জীবন থেকে ফিরে প্রফেসর ইউনূসের জামানায় এ মামলাতেই আমাকে পাঁচ দিনের জন্য আবার জেলে যেতে হয়েছিল। নিম্ন আদালতের সেই সাজা অবশ্য জজ কোর্টে বাতিল হয়ে গেছে। ২০১৬ সালে রোজার মাসে আমাকে জেলখানা থেকে উঠিয়ে এই মামলায় ডিবি ১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল। রিমান্ড শেষে শফিক রেহমান কাশিমপুর জেলে আমার একেবারে পাশের সেলে গিয়ে উঠলে আমি তার কাছে খানিকটা অনুযোগ করেই বলেছিলাম, এমনিতেই জানি না কোনোদিন জেলের বাইরে যেতে পারব কি না। আবার বিনা অপরাধে উটকো ঝামেলায় জড়ালেন কেন? সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভুয়া মামলায় আমাকে সেই সময় প্রায় এক বছর অতিরিক্ত জেলও খাটতে হয়েছিল।
বিএনপির সঙ্গে আমার প্রায় তিন দশকের সম্পর্ক এবং দলটির নেতা ও মন্ত্রীদের পুরো কাহিনি লিখতে গেলে সম্ভবত বাকি জীবন পার হয়ে যাবে। ডা. জাহেদ-উর রহমানের মতো নব্য বিএনপিদের কাছ থেকে এখন বিএনপির গল্প শুনতে তাই বড়ই কৌতুকবোধ করি। বাছুরের নতুন শিং উঠলে নাকি সবাইকে গুঁতো মারতে যায়। ডা. জাহেদের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাও আমার সঙ্গে কাশিমপুর জেলে ছিলেন। তার প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করায় একবার জেলার নাসিরকে বেশ ভর্ৎসনাও করেছিলাম। এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় রাজনৈতিক কারণে মান্না ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, যার কথা বেগম খালেদা জিয়া জানতেন। সে আরেক গল্প। ভবিষ্যতে প্রসঙ্গ এলে লেখা যাবে।