মো. মাহমুদুল হাসান
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণদের সাহস ও বীরত্ব দেখে বিশ্বজুড়ে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত এ আন্দোলনের ফলে ব্যাপক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দ্বারা কলুষিত শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ঘটে। সরকারি বাহিনীর হাতে ১৪০০ জনেরও বেশি তরুণ নিহত হন এবং অসংখ্য মানুষ তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারান। অবশেষে, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে হাসিনার পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এর তিনদিন পর ৮ আগস্টে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন, যা ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধান করে।
নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করেছে। প্রশ্ন হলো আবার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া বাংলাদেশ কেমন চলবে? দেশ কি আবার বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িয়ে পড়বে?
১৯৫২ সালের মিসরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিয়ে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এ আলোচনা বাংলাদেশকে জুলাই-পরবর্তী ঘটনাবলি মোকাবিলা করতে এবং জুলাই বিপ্লবকে সফল করতে সাহায্য করতে পারে।
একাধিক বিপ্লব সত্ত্বেও, দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্বমঞ্চে মিসরের ভাবমূর্তি প্রায়ই হতাশাজনক। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং অস্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য এবং বৈষম্য দেশটিতে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস মিসরকে ‘নীল নদের উপহার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাছাড়া, দেশটিকে প্রায়ই আরব বিশ্বের হৃদয় (heart) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং পিরামিডের বিস্ময়সহ সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের এই দেশে, বর্তমানে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা কারাগারে বন্দি। সর্বোপরি, পুলিশি সহিংসতা, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যুসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সঙ্গে দেশটি অপরিচিত নয়।
মিসরেও তো ১৯৫২ সালে জুলাই বিপ্লব হয়েছিল। কিন্তু তারপরও দেশটির এ অবস্থা কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ মিসরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে এবং মিসরের ভুল-ভ্রান্তি এড়াতে পারবে বলে আমি মনে করি।
এই ক্ষেত্রে মিসরীয় সাহিত্যের একটি বইয়ের প্রেক্ষাপট আলোচনা করা যেতে পারে।
সম্প্রতি, আমি মিসরীয় নারী লেখিকা জয়নব আল-গাজ্জালীর Return of the Pharaoh : Memoir in Nasir’s Prison (বাংলায় কারাগারে রাতদিন নামে প্রকাশিত) বইটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝার চেষ্টা করেছি। এর মূল আরবি সংস্করণÑআইয়াম মিন হায়াতি (আমার জীবনের দিনগুলি)Ñ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার গবেষণা আমাকে ১৯৫২ সালের জুলাইয়ের মিসরের বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়। মিসরের জুলাই বিপ্লব জনগণকে নতুন করে আশাবাদ এবং উৎসাহ দিয়েছিল। এটি তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো দেখিয়েছিল।
মিসরের প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ইতিহাস আলোচনা করলে সে দেশের জুলাই আন্দোলন এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলো বোঝা সহজ হবে।
১৯২২ সালে রাজা প্রথম ফুয়াদের অধীনে মিসরে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হাতে, যারা সুয়েজ খাল অঞ্চলে বিশাল সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছিল। ১৯৩৬ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজা প্রথম ফুয়াদ মিসর শাসন করেন। এরপর তার পুত্র রাজা ফারুক ১৬ বছর বয়সে ক্ষমতায় আসেন। ফারুককে আনুষ্ঠানিকভাবে এক বছর পরে ১৯৩৭ সালে সিংহাসনে বসানো হয়। তিনি দেশ শাসন করেন ২৩ জুলাই ১৯৫২ পর্যন্ত, যখন সামরিক নেতৃত্বাধীন জুলাই বিপ্লব তাকে উৎখাত করে। এর ফলে ১৮০৫ সালে শুরু হওয়া মুহাম্মদ আলী রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে।
১৯৫২ সালে জেনারেল মুহাম্মদ নাগিব এবং জেনারেল জামাল আবদেল নাসেরের নেতৃত্বে পরিচালিত Free Officers Movement (ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট) বা মিসরের জুলাই বিপ্লবের প্রকৃতি এবং গঠন বাংলাদেশের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জুলাই ২০২৪ বিপ্লবের চেয়ে আলাদা। তবু, দুটি ঘটনা এবং তাদের প্রেক্ষাপটের মধ্যে মিল উপেক্ষা করা কঠিন।
ফারুকের সরকারের বিরুদ্ধে মিসরীয়রা যে যে কারণে আন্দোলন করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল এর ব্যাপক দুর্নীতি এবং এর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ওপর বাইরের (প্রধানত ব্রিটিশ) প্রভাব। দেশ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তার ওপর ফারুকের খুব কম নিয়ন্ত্রণ ছিল। যদিও তার শাসনামলে সববিরোধী গোষ্ঠীর ওপর কঠোরভাবে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, নির্যাতনের প্রাথমিক শিকার (victim) ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যরা। এর কারণ হলো ফারুকের রাজনৈতিক প্রভুরা-ব্রিটিশরা-তাদের মিসরের ওপর নিরঙ্কুশ এবং প্রশ্নাতীত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। ফলে, ‘ইখওয়ান [মুসলিম ব্রাদারহুড] এবং রাজা ফারুকের সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমেই ঘন ঘন এবং ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠে’ এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা হাসান আল-বান্না এবং তার সংগঠন ‘সক্রিয়ভাবে ওইসব সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে, যারা রাজা ফারুকের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একমত পোষণ করে।’ (David Polizzi, Toward a Phenomenology of Terrorism, Springer International Publishing, ২০২১, পৃষ্ঠা : ৬৮)। এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, হাসান আল-বান্নাকে ১৯৪৯ সালে কায়রোতে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে হত্যা করা হয়।
ফারুকের মিসরে যখন দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং বিদেশি আধিপত্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন বিভিন্ন শাসনবিরোধী গোষ্ঠী একত্র হয়েছিল। এভাবে, ১৯৫২ সালের জুলাই বিপ্লব শুরু হয় এবং ফারুকের শাসনের পতন ঘটে।
ঠিক যেমন ঔপনিবেশিক ব্রিটেন ফারুকের মিসরে প্রভাব বিস্তার করেছিল, তেমনি বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত হাসিনা-শাসিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে যথেষ্ট প্রভাব রাখত (বিশেষ করে ২০০৯ সালের শুরু থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত)। সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্রিটেন ফারুকের সরকারকে সমর্থন করেছিল। ব্রিটেন চেয়েছিল আরব দেশগুলো থেকে ইউরোপে অবাধ তেল সরবরাহ চালিয়ে যেতে। একইভাবে ভারত বাংলাদেশে হাসিনার শাসনকে স্থায়ী করতে আগ্রহী ছিল, যাতে বাংলাদেশের বন্দর এবং স্থল পরিবহনকে তার সুবিধার জন্য ব্যবহার করা অব্যাহত থাকে।
আবার, যেভাবে মুসলিম ব্রাদারহুড ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত ফারুক শাসনামলের নিপীড়নের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু (target) ছিল, একইভাবে ভারত-নিয়ন্ত্রিত হাসিনার রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীÑবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু ছিল। মিসরে ফারুকের সময় ব্রাদারহুডের প্রধান হাসান আল-বান্না শহীদ হন। একইভাবে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের হাসিনার শাসনামলে জীবন দিতে হয়।
মিসরে যেমন ফারুকের দুঃশাসনের অবসান ঘটেছিল জুলাই ১৯৫২ বিপ্লবের মাধ্যমে, বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে হাসিনার একদলীয় শোষণের অবসান হয়।
তবে, একটি স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করলেই দেশে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হয় না। ১৯৫২ সালের জুলাইয়ে মিসরের বিপ্লবের অভিজ্ঞতা থেকে এটি প্রমাণিত।
মিসরের জুলাই বিপ্লবের এক বছর পর, ১৯৫৩ সালে দেশটি একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং জেনারেল মুহাম্মদ নাগিব এর প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। পরের বছর, ১৯৫৪ সালে, জুলাই বিপ্লবের আরেক নেতা জেনারেল জামাল আবদেল নাসের ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৭০ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন।
দুঃখের বিষয় হলো, মিসরের জুলাই বিপ্লব দেশে স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারেনি।
প্রথমত, ১৯৫২ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরপরই, দেশটি তার আগের বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত, কর্তৃত্ববাদী শাসন, স্বৈরাচারের পরিচিত ধরন এবং জনগণের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতিতে ফিরে যায়। ফারুকের সময়ের তুলনায় নাসেরের সময় এবং পরবর্তী সময়ে আরেনা বেশি ব্রাদারহুড নেতা ও কর্মী নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন। ব্রাদারহুড সদস্যদের প্রতি নাসেরের বৈরী আচরণের একটি আংশিক চিত্র জয়নব আল-গাজ্জালির পূর্ব উল্লিখিত বইয়ে পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লব মিসরে বিদেশি আধিপত্যের অবসান ঘটাতে চেয়েছিল। কিন্তু মিসরে বিদেশি আধিপত্যের অবসান আজও হয়নি।
১৯৫৯ সালে Life ম্যাগাজিনের (খণ্ড ৪৭, নম্বর ৩) ২০ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত ‘Where I Stand and Why’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে, রাষ্ট্রপতি জামাল আবদেল নাসের লিখেছিলেনÑ‘১৯৫২ সালের বিপ্লব মিসরকে রাজা ফারুকের দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন এবং তার ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত করার সাত বছর হয়ে গেছে। সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা সহজ ছিল না।’ (পৃষ্ঠা : ৯৬)
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা কিছুটা সত্য, কারণ ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশে নতুন করে পাওয়া স্বাধীনতা রক্ষা করা সহজ না, হয়তো সহজ হবেও না।
বাংলাদেশের জুলাই মাসের (যুব) যোদ্ধাদের রক্ত বৃথা যাবে কি নাÑবাংলাদেশের জুলাই মাসের অভ্যুত্থান সফল হবে, নাকি ব্যর্থ হবে এবং বাংলাদেশ বিদেশি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি নাÑএসবই নির্ভর করছে সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আন্তরিকতা এবং বিচক্ষণতার (অথবা এর অভাব) ওপর।
আমি আশা করি, বাংলাদেশ মিসরের জুলাই মাসের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেবে এবং তার জনগণের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেবে। আমি আরো আশা করি, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান এবং বিএনপি যে ম্যান্ডেট পেয়েছেন, তা তাকে এবং তার দলকে স্বৈরাচারী করে তুলবে না।
লেখক : মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক