মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রেশনিং নির্দেশনা অমান্য করে দ্বিগুণ তেল বিক্রি করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির এই অনিয়মে চরম হুমকিতে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাত। যুদ্ধ শুরুর পর ৪ মার্চ থেকে আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ কম তেল বিক্রি করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে দেশের তেলের মজুত বিপজ্জনক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। যার ফলে এখন যানবাহনে তেল বিক্রিতে বড় ধরনের রেশনিং করা হচ্ছে। এতে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি বিশ্বস্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে এই ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর এক বৈঠকে জ্বালানি সচিব বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করেছেন। ওই জুম বৈঠকে এক সিনিয়র কর্মকর্তা তেল খাতের সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ‘চোরের বাচ্চা’ বলেও আখ্যা দেন।
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিপিসি ও তেল বিতরণ কোম্পানি সরকারি নির্দেশনা অর্থাৎ, রেশনিংয়ের আদেশ না মেনে উলটো দ্বিগুণ তেল বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিপিসিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেককে ওএসডি ও বদলি করা হয়েছে। তেল বিতরণ কোম্পানির ব্যাপারে তদন্ত চলছে। তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে তেল বিতরণ কোম্পানিগুলো অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সরকারি নিদের্শনা পাওয়ার পরই তেল রেশনিং করা শুরু হয়েছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহিরুল হাসানও একই কথা বলেন।
অন্যদিকে ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক নাজমুল হক যুগান্তরকে বলেন, ডিপোগুলো দুর্নীতির হাট। ঠিকমতো টাকা না দিলে অনেক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে সেখানে বহিরাগতদের সমাগম-তাদের চাঁদার হাটের ক্যাশিয়ার। এ ব্যাপারে কঠিন পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশে তেল খাতে আরও বড় বিপদ আছে।
জানা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ হামলা শুরু করে। এর পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে বাংলাদেশে। ১ মার্চ থেকে সব ডিপোতে দ্বিগুণ হারে তেল উত্তোলন শুরু করে ডিলার ও ফিলিং স্টেশনগুলো। ১ মার্চ ডিপো থেকে তেল বিক্রি করা হয় ২২ হাজার ৯১৯ টন। ২ মার্চ ২৩ হাজার ৪৭০ টন। অথচ স্বাভাবিক সময়ে তেল বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টন। এরপর ৪ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে তেল বিক্রিতে ১০ শতাংশ রেশনিং করতে নির্দেশনা দেয় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানিকে। এই তিন কোম্পানি শুধু ফিলিং স্টেশন ও ডিলারদের কাছে তেল বিক্রি করে থাকে। ওই নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সব ডিলার ও ফিলিং স্টেশন ২০২৫ সালে এই সময়ে যে পরিমাণে তেল নিয়েছে তার থেকে ১০ শতাংশ কম তেল দিতে হবে।
৪ মার্চ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়। সেখানে বিপিসির সব পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে তেলের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ডিজেলের মজুত দেড় লাখ টনের নিচে নেমে আসছে। যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সেখানে সব বিতরণ কোম্পানিকে তেল বিক্রিতে রেশনিং করার নির্দেশনা দেন এক পরিচালক। কিন্তু সেই দিনও দ্বিগুণ তেল বিক্রি করা হয়-এদিন বিক্রি করা হয় ২৬ হাজার ৪৫০ টন। এমনকি পরের দিন ৫ মার্চও নির্দেশনা না মেনে ২৬ হাজার ৩৩৬ টন তেল বিক্রি করা হয়। ওই দিন রাত ১০টার পর জ্বালানি সচিবের সভাপতিত্বে একটি জুম বৈঠক হয়। সেখানে বিতরণ কোম্পানিগুলো ৪ ও ৫ মার্চের তেল বিক্রির তথ্য জানালে ক্ষুব্ধ হন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। জ্বালানি সচিব বৈঠকে বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ভর্ৎসনা করেন। বলেন, আপনারা দেশকে বিপদে ফেলে দিলেন। সরকারি আদেশ অমান্য করেছেন। ওই বৈঠকে এক কর্মকর্তা বিতরণ কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের ‘চোরের বাচ্চা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, নিশ্চয়ই আপনাদের বাড়তি উপরি আছে। না হলে সরকারি আদেশ অমান্য করলেন কেন?
এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, ওই ঘটনার পর মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ডিপোতে কর্মকর্তা পাঠিয়ে তদন্ত করেছে। তা ছাড়া পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলা হয়েছে। তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এরপর বিপিসির পরিচালক (অপারেশন) আজাদুর রহমান এবং পরিচালক (মার্কেটিং) মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনকে ওএসডি করা হয়েছে। দুজনই সরকারের যুগ্ম সচিব। পরের দিন বিপিসির দুই জিএমকে ওএসডি ও বদলিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু বিতরণ কোম্পানির ব্যাপারে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।