Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামীকাল ১২ মার্চ শুরু হচ্ছে। এ অধিবেশনকে ঘিরে এরই মধ্যে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্পিকার নির্বাচন, প্রেসিডেন্টের ভাষণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে শুরু হচ্ছে এই অধিবেশন। নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রাণবন্ত সংসদ আশা করছেন বিশ্লেষকরা।

অধিবেশনের শুরুতেই সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া প্রথম অধিবেশনে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেগুলোর অনুমোদন, সংশোধন অথবা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। এ ছাড়া মৃত্যুবরণ করা সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাবও গ্রহণ করা হবে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন প্রায় এক মাস চলবে। এ সময় প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব এনে আলোচনা হবে।

২০১৪ সালে প্রার্থী ও ভোটার বিহীন, ২০১৮ সালে রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালে আমি ডামির পাতানো নির্বাচনের সংসদে ছিল না কোনো প্রাণ। ওই সব সংসদের প্রতি মানুষের আগ্রহ তেমন ছিল না। দীর্ঘ দিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এবারের সংসদের দিকে তাকিয়ে সবাই। এবারের সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত হবে সেটা দেখার জন্য মুখিয়ে দেশবাসী।

সব মিলিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দল সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সরকারি দল তাদের নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে দুইদিনব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন করেছে। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও তাদের নব নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে দু’দুদিনের বিশেষ ‘ওরিয়েন্টশন কোর্স’ সম্পন্ন করেছে। এদিকে সংসদ পরিচালনার সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আজ সংসদে বৈঠক করবে সরকারি দল। গতকাল জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলামের সাথে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি সৌজন্য সাক্ষাৎ করে এক সাথে সংসদকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ ইনকিলাবকে বলেন, নতুন সংসদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর বিরোধী দলের অভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। কখনও বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে, আবার কখনও সংসদের ভেতরে কার্যকর বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়নি। কখনো সরকারের সাথে মিশে গেছে। ফলে জাতীয় সংসদ অনেক সময়ই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নীতিগত বিতর্ক ও ইস্যুভিত্তিক আলোচনা সমালোচনা হবে এবং তাতে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা থাকবে এমনটাই সবার প্রত্যাশা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীল ও সক্রিয় বিরোধী দলও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরকে বাদ দিয়ে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

অধিবেশনের প্রথম দিনই সংসদে উঠছে ১৩৩ অধ্যাদেশ
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক। সেই বিধান মেনেই প্রেসিডেন্টের আহ্বানে ১২ মার্চ বেলা ১১টায় বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংসদের প্রথম বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে নতুন সংসদের কার্যক্রম। প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেগুলোর অনুমোদন, সংশোধন অথবা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। সেগুলো আইনে পরিণত করতে সময়সীমা মাত্র ৩০ দিন। তবে সব অধ্যাদেশই আইনে পরিণত হবে নাকি কিছু বাদ যাবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ ভেঙে গেলে বা অধিবেশন না থাকলে প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। এই ক্ষমতাবলে অন্তর্বর্তী সরকারের ৫৫৯ দিনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়। এর মধ্যে গণভোট, জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয়, সরকারি চাকরির বয়স বৃদ্ধি, গুম-খুনের বিচার ও স্থানীয় সরকারসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ বেশ আলোচিত ও স্পর্শকাতর। আইনে পরিণত করতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তুলতে হবে এসব অধ্যাদেশ। পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন না হলে বাতিল হয়ে যাবে সেসব অধ্যাদেশ।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এই অধ্যাদেশগুলো যে যে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত, সেই মন্ত্রণালয়গুলো এগুলো সংসদে উপস্থাপন করবে। আলোচিত যে অধ্যাদেশগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর ওপর বেশি আলোচনা ও বিতর্ক হবে। প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করেছেন মানেই যে সংসদ সেটি গ্রহণ করবে বা করতে বাধ্য এমন নয়। সংসদ স্বাধীন, তারা এটি গ্রহণ করতেও পারে আবার নাও করতে পারে।’

এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ এটি অধ্যাদেশ নয়, বরং প্রেসিডেন্টের আদেশ ছিল। আইনজীবীরা বলছেন, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল হলে ওই সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বৈধতা হারাবে। তাতে তৈরি হতে পারে নানা জটিলতা।

সুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, অনেকগুলো মামলাতে সংশোধন হয়েছে। বিশেষ করে সিআরপিসি (ফৌজদারি কার্যবিধি), সিপিসি (দেওয়ানি কার্যবিধি) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। এগুলো যদি অনুমোদন না হয়, তবে সংকট দেখা দেবে। তাই উচিত হবে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের উদ্দেশ্যে যেভাবে এগুলো গ্রহণ করেছে, সেভাবেই আইনে রূপান্তর করা।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের জন্য অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে আইন মন্ত্রণালয়। কোনো অধ্যাদেশ আইনি ভিত্তি না পেলে পরবর্তীতেও সেই বিষয়ে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা যাবে।

সংসদে গণভোট বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় জামায়াত-এনসিপি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোট বাস্তবায়নে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি। সরকার গণরায় উপেক্ষা করলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই গণভোট বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় জামায়াত ও গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা ছাত্র-নাগরিকদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের দাবি, গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করলে জনগণ আবারও মাঠে ফিরবে। আর বিএনপি বলছে, সংসদে আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার কথা।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। এতে বৈধ ৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৬ হাজার ২১১ ভোটের মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০। আর ‘না’ এর পক্ষে আসে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১ ভোট। বড় ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তৈরি হয়েছে সংশয়। এমনকি গণভোট কার্যকরের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কেউ বলছেন, এই বাংলাদেশে যেন পুনরায় কোনো ফ্যাসিস্টের জন্ম না হয় সে জন্যই গণভোটের কার্যকারিতা একান্ত জরুরি। আবার কেউ বলছেন, আইনগতভাবে যেটি বৈধ নয়, সেটির ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই সংসদের। গণভোট নিয়ে সংসদের সিদ্ধান্ত সঠিক।

জামায়াত নেতারা বলছেন, সংসদ অধিবেশনের প্রথম থেকেই গণরায় বাস্তবায়নে কাজ করবে ১২দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা (এমপি)। সরকার গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করলে জনগণ আবারও জুলাই ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মত জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদের। তিনি বলেন, সরকার যদি গণভোটের বিপরীত পথে হাঁটে তাহলে হয়তো বিরোধী দলের রায়কে তারা উপেক্ষা করতে পারবেন, তবে জনরায় উপেক্ষা করার সুযোগ জনগণ দেবে না। এ জন্য জনগণ এখনই বলছে, প্রয়োজনে আরেকটি জুলাই বিপ্লব হবে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়ার কোনো সুযোগ সাংবিধানিকভাবে না থাকায় সংসদেই আলোচনা করেই হবে যাবতীয় সংস্কার।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ না থাকায় এবং শপথের বিধান না থাকায় তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই পরিষদকে সংবিধানে ধারণ করার পরই শপথ হতে পারে।

ভোটের পর একই দিনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়ার কথা ছিল জুলাই সনদে। কিন্তু ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নেয়নি বিএনপি। এ বিয়টি নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এদিকে সংসদে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অতীতের ‘গৃহপালিত’ বিরোধীদলের মতো হবে না তাদের ভূমিকা। দলের নেতারা বলছেন, সংসদে তারা জনগণের অধিকারের বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন এবং জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবেন। দলটির একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের সঙ্গেও জামায়াত নেতাদের বৈঠকে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বৈঠকে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদে গেলে তারা জনস্বার্থের প্রশ্নে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত ভূমিকা পালন করতে চান। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবেন না। প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, আমাদের সংসদ সদস্যরা অতীতের অযৌক্তিক বা প্রতীকী বিরোধিতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তিনির্ভর ও ইস্যুভিত্তিক বিরোধী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে সবটুকু করবে। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগে সহযোগিতা এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-এই দুই নীতির সমন্বয় ঘটিয়েই সংসদে ভূমিকা রাখবে আমাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।