ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. রফিকুল ইসলাম খান। এ নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এম. আকবর আলী ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। এ আসনে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৮২১ ভোটের মধ্যে পড়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫ ভোট। ভোট পড়ার হার ৭০ শতাংশ।
অপরদিকে মাদারীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমদান হানজালা ৬৪ হাজার ৯০৯ ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ আসনে মাত্র ৩৮৫ ভোট কম পেয়ে হেরে গেছেন বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার। তিনি পেয়েছেন ৬৪ হাজার ৫২৪ ভোট। এ আসনে ভোট পড়েছে ৫৬.৩৪ শতাংশ। ৩ লাখ ২৪ হাজার ২৮৯ ভোটারের এ আসনে ভোট পড়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৭১০টি। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৩ হাজার ৭১৯টি।
শুধু সিরাজগঞ্জ-৪ বা মাদারীপুর-১ আসন নয়, অন্তত ৪৯টি আসনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেসব আসনে মাত্র ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। এ সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে বিএনপিরই ২১ প্রার্থী হেরে গেছেন। যদিও দলটির ৭৩ প্রার্থী ভোট পাওয়ার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। বাকি ৫২ জন আরও বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। অপরদিকে মাত্র ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হেরেছেন ১৮ জন। যদিও এ দলের ১৪৩ জন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির তিনজন, স্বতন্ত্র চারজন এবং এলডিপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একজন করে প্রার্থী মাত্র ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
যদিও নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা দাবি করেছিলেন, জামায়াতে ইসলামীকে অনেক সংসদীয় আসনে এক-দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন আসনের সংখ্যা হবে ৫০-এর ঊর্ধ্বে। নির্বাচনের পরে ভোট গণনা, ফলাফল তৈরি ও ফলাফল ঘোষণার মধ্যে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়েছে বলেও দাবি করেছিলেন তারা। তবে ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের পাশাপাশি বিএনপির প্রার্থীরাও হেরেছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি।
১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপির ২৯০ জন ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা পেয়েছেন ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৬৫ হাজার ভোট। ভোট পাওয়ার হার ৪৯.৯৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৭ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ২ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার ভোট। দলটি ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর এনসিপির ৩২ জন প্রার্থী পেয়েছেন ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ ভোট, যা ভোটের ৩.০৫ শতাংশ।
এ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৮৫ জন। এদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৮১ হাজার মানুষ। এর মধ্যে বৈধ ভোট ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার। বাতিল ভোট ১৬ লাখ ৯১ হাজার। ভোট পড়ার হার ৬০ দশমিক ২৪ শতাংশ।
১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজয় : ফলাফল বিশ্লেষণে অন্তত ৪৯টি আসনে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের তথ্য মিলেছে। খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২ হাজার ৬০৮ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির মোহাম্মদ আলী আসগারের কাছে হেরে গেছেন। এ নির্বাচনে আলী আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট আর মিয়া গোলাম পারওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ ভোট। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭৫.৬৬ শতাংশ।
ঢাকা-১০ আসনে ৩ হাজার ৩০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বর্তমান সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এ আসনে তিনি পেয়েছেন ৮০ হাজার ৪৩৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. জসীম উদ্দীন সরকার পেয়েছেন ৭৭ হাজার ১৩৬ ভোট। এ আসনে ভোট পড়ার হার ৪৩.৩৯ শতাংশ।
ঢাকা-১১ আসনে ২ হাজার ৩৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এমএ কাইয়ুম পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৩৩ ভোট। পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির মো. সারজিস আলম ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট পেয়ে জয়ী হতে পারেননি। এ আসনে বিএনপির মুহাম্মদ নওশাদ জমির ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ৫ হাজার ৫৯২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তিনি ভোট পেয়েছেন ৮৮ হাজার ১৯৭টি। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল ৯৩ হাজার ৭৮৯ ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে।
ফলাফলে আরও দেখা গেছে, ১০ হাজার বা তার কম ভোটের ব্যবধানে যেসব আসনে বিএনপির প্রার্থীরা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন, সেগুলো হচ্ছে-রংপুর-৪ (ব্যবধান ৯৪০২ ভোট), রংপুর-৬ (ব্যবধান ২৪২৫ ভোট), কুড়িগ্রাম-২ (৯১২১ ভোট), জয়পুরহাট-১ (৯৮৮৩ ভোট), নওগাঁ-২ (৬৯৯৩ ভোট), রাজশাহী-১ (১৮৮৪ ভোট), পাবনা-৩ (৩২৬৯ ভোট), পাবনা-৪ (৩৮০১ ভোট), কুষ্টিয়া-৪ (৮৫৯৮ ভোট), বাগেরহাট-১ (৩২০৪ ভোট), ময়মনসিংহ-১ (৬৩৩৯ ভোট), নেত্রকোনা-৫ (২৭৬৫ ভোট), ঢাকা-৪ (২৯২০ ভোট), ঢাকা-৫ (৯১৫০ ভোট), ঢাকা-১৬ (৩৩৬১ ভোট), চাঁদপুর-৪ (৫০২০ ভোট) এবং রাজশাহী-৪ (৫৭৬৫ ভোট)।
অপরদিকে জামায়াতের ১৮ জন প্রার্থী ১০ হাজার বা এর কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। ওইসব আসনগুলো হচ্ছে-ঠাকুরগাঁও-২ (ব্যবধান ৫৩১০ ভোট), দিনাজপুর-৩ (৪৩৬৯ ভোট), লালমনিরহাট-১ (৯১১৪ ভোট), লালমনিরহাট-২ (৬৬৯৪ ভোট), গাইবান্ধা-৪ (৩০৩৪ ভোট), সিরাজগঞ্জ-১ (৭৭৯৮ ভোট), খুলনা-৩ (৮৮৩৫ ভোট), বরগুনা-২ (৫৩৯৬ ভোট), ঝালকাঠী-১ (৬৮৯০ ভোট), ময়মনসিংহ-৪ (৭৭৮৮ ভোট), কিশোরগঞ্জ-৩ (৯৯৯০ ভোট), ঢাকা-৭ (৬১৮৩ ভোট), ঢাকা-১৭ (৪৩৯৯ ভোট), সিলেট-৬ (৮৩৪৮ ভোট), কুমিল্লা-৫ (৯৯৩৮ ভোট) এবং কক্সবাজার-৪ (১৫৪৯ ভোট)।
অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র যেসব আসনে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন, সেসব আসন হচ্ছে-পঞ্চগড়-১, দিনাজপুর-৫, ময়মনসিংহ-৩ ও ১০, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৩, গোপালগঞ্জ-২, সিলেট-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ এবং চট্টগ্রাম-১৪।
নির্বাচনে কোন দলের কত ভোট : ইসি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সর্বোচ্চ ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর জামায়াত ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্য দলগুলোর মধ্যে এনসিপি ছয়টি আসনে জয় লাভ করেছে। দলটির ৩২ প্রার্থী পেয়েছেন ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ ভোট, যা ভোটের ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি আসন পেলেও দলটির সব প্রার্থী মোট ভোট পেয়েছেন ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৭টি, যার শতকরা হার ২ দশমিক ০ শতাংশ। আর খেলাফত মজলিস পেয়েছে ১টি আসন। ভোট পেয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩০টি, যার শতকরা হার ০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
ভোটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয়লাভ করলেও মোট ভোট পেয়েছে ২০ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬টি, যা মোট ভোটের ২.৭০ শতাংশ। অন্যান্য দলের মধ্যে গণসংহতি আন্দোলন পেয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮১২টি, যার শতকরা হার ০ দশমিক ১৪ শতাংশ। গণঅধিকার পরিষদ পেয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৩০ ভোট, ভোটের হার ০ দশমিক ৩২ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮২ ভোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি মোট ভোট পেয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৬৮১টি।
এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫০টি দলের মধ্যে বাকি ৪১টি দলের কোনোটিই ১ শতাংশ ভোটও পায়নি। ইসিতে নিবন্ধিত ৫৯টি দলের মধ্যের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আটটি দল প্রার্থী দেয়নি।