সংবাদ সম্মেলন কী সেটা বোঝার বয়স হয়নি চার বছর বয়সী রিদার। কোলে চড়ে মায়ের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে এসেছে সে। তার সামনেই বড় টেবিল। টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো সাংবাদিকদের বুম। পাশেই বসা মা রেশমা খাতুন। সেখান থেকেই ব্যবসায়ী স্বামী জাহাঙ্গীর আলম অপহরণের বর্ণনা দিচ্ছিলেন আর কাঁদছিলেন। রেশমার কান্নায় যখন পিনপতন নীরবতা, তখন বুমের দিকে মুখ নিয়ে আধো আধো বোলে রিদা বলছিলেন- ‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেন, আমার বাবা আমাকে অনেক আদর করে। আমি শুধু বাবাকে ফিরে পেতে চাই। আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমার বাবার জন্য আমার খুব পরাণ পোড়ছে। বাবাকে ছাড়া একটুও ভাল্লাগে না আমার। কিচ্ছু ভাল্লাগে না।’- এভাবে রিদা কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন রেশমা ও তার দুই বড় মেয়ে। এ সময় কনফারেন্স রুমে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বুধবার (৫ মার্চ) বিকেলে প্রেসক্লাব যশোরে এই সংবাদ সম্মেলন হয়।
রিদার বাবা জাহাঙ্গীর আলম (৪৮) যশোর শহরের শংকরপুরস্থ ভেটেরিনারি হাসপাতালের সামনে আর আর মেডিকেল নামে ভেটেরিনারি ওষুধের ব্যবসা করেন। তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে শহরতলির সুজলপুর এলাকাতে বসবাস করেন তিনি। গত সোমবার রাতে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে কয়েক দুর্বৃত্ত সাদা প্রাইভেটকারে করে জাহাঙ্গীরকে তুলে নিয়ে যায়। এর পর তারই মুঠোফোন দিয়ে পরিবারের কাছে চাওয়া হয় এক কোটি টাকার মুক্তিপণ। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করতে পারেনি। এমতাবস্থায় বুধবার বিকেলে জাহাঙ্গীরকে জীবিত উদ্ধার ও অপহরণকারীদের বিচারের দাবি জানিয়ে যশোর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন অপহৃত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রেশমা খাতুন। অপহরণের তিন দিন পার হলেও স্বামীকে না পাওয়ায় উৎকণ্ঠায় পরিবারটি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত সোমবার (২ মার্চ) রাতে জাহাঙ্গীর দোকান বন্ধ করে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে করে খোলাডাঙ্গা কদমতলার বাসায় ফিরছিলেন। পথে চাঁচড়া রায়পাড়া পীরবাড়ি মোড়ে পৌঁছালে একটি প্রাইভেটকারে কয়েকজন এসে গতিরোধ এবং তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহরণের পরে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবহৃত ফোন নম্বর থেকে রাত ১০টার দিকে তার স্ত্রীর ফোনে কল করে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নইলে তাকে হত্যা করা হবে মর্মে হুমকি দেওয়া হয়। এর পর থেকে মোবাইল ফোনটি বন্ধ রয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রেশমা খাতুন বলেন, ‘সাত বছর ধরে শংকরপুর ভেটেরিনারি হাসপাতালের সামনে ওষুধের ব্যবসা করে আসছেন আমার স্বামী। রাতে তারাবি পড়ে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফেরেন প্রতিদিন। তবে সোমবার আর ফিরেনি। সে না ফেরায় তিন সন্তানকে নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় রয়েছি। আমার বড় মেয়ের সামনে এসএসসি পরীক্ষা। এমন অবস্থায় সেও তার বাবাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিন দিন পার হয়ে গেছে; তার সন্ধান পাচ্ছি না। আমরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার স্বামীকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার ও অপহরণকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবার এ ঘটনায় অভিযোগ দিলে আমরা মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছি। অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারে পুলিশের কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে। ব্যবসা না পূর্বে কোনো শত্রুতার জেরে ঘটনাটি ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে- সেটি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। আমরা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। আশা করি, দ্রুত উদ্ধার করতে পারব।’
সারাবাংলা