Image description
 

চট্টগ্রামে ১০ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে শীর্ষ ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে এবার অত্যাধুনিক মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টায় চন্দনপুরায় অবস্থিত বাসায় পুলিশ পাহারার মধ্যে এই ঘটনা ঘটায় নগর পুলিশে তোলপাড় চলছে৷

 

বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর পরিবারের ভাষ্য। ওই বাড়িতে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানও পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। গুলিবর্ষণের পর পরিবারটি নিরাপত্তায় ভুগছে বলে জানা গেছে।

 

এর আগে গত ২ জানুয়ারি এই ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি করা হয়েছিল। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা দেন সাজ্জাদ। এতে লেখা হয়—‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। তবে আগের ঘটনায় থানায় কোন মামলা করেনি ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান।

 

স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাড়ির পেছনে খালপাড় থেকে ভারী অস্ত্র নিয়ে গুলি করা হয়েছে। এতে কেউ হতাহত না হলেও বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি সন্ত্রাসী চক্র দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কোম্পানি থেকে চাঁদা দাবি করে আসছিল। মাসখানেক আগে কোম্পানির চেয়ারম্যানকে ফোন দিয়ে হুমকি দেয়। প্রথমবার বাড়ির সামনে দিয়ে গুলি করলেও সেখানে পুলিশ প্রহরায় থাকায এবার বাড়ির পেছন দিক থেকে গুলি করেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসার সু্ষ্ঠু পরিবেশ যেমন বিঘ্নিত হবে তেমনি ব্যবসায়ীদেরকেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে। এ ঘটনায় আমাদের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতংকের মধ্যে রয়েছে।’

জানা গেছে, শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ বাসার পেছনে ৩-৪ জন মুখোশধারী অস্ত্রধারী ৬ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি করেন। পুলিশি পাহারায় মধ্যেই বাসাটিতে আবারও গুলির ঘটনায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

 

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা গুলি ছুড়েছেন। ভুক্তভোগীর দাবি, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছেন।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সকালে নামাজ পড়ে সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ বাসার পেছনে মুখোশধারী অস্ত্রধারীরা গুলি করতে থাকে। ৬ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিকিউরিটি গার্ড সন্ত্রাসীদের দেখতে পেয়ে বাসার পাহারায় থাকা পাঁচ থেকে ছয়জন পুলিশ সদস্যকে বিষয়টি জানায়। পুলিশ সদস্যরা বাসার দোতলায় উঠে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে এর আগেই সন্ত্রাসীরা চলে যায়। সন্ত্রাসীদের হাতে পিস্তল, চায়নিজ রাইফেলসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসেন। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন। পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়েন।

গুলির খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি শনিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, সন্ত্রাসীরা একটি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল যোগে ওই এলাকায় আসে। গাড়ি একটু দূরে রেখে হেঁটে বাসার কাছে গিয়ে গুলি করে। এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তার লোকজন দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অস্ত্রধারীরা মুখোশধারী হওয়ায় তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তবে সাজ্জাদের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও বোরহান এ ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।’

স্মার্ট গ্রুপ একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গুলি করার অভিযোগের বিষয়ে সাজ্জাদ আলী অভিযোগ অস্বীকার করে একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘গুলি কে করেছে আমি জানি না। তবে যেই করে থাকুক, ভালোই করেছে। কয়েক বছর আগে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে তাদের কারণে ৫২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।’

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন। তালিকা অনুসারে তার নাম সাজ্জাদ খান।

পুলিশ আরও জানায়, চাঁদা না পেলেই গুলি করেন সাজ্জাদের অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন। আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন। ২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন বুড়ির নাতি খ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

পুলিশ বলছে, গত বছর বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সমালোচনা করায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বায়েজিদের আরেক সন্ত্রাসী আকবর হোসেন ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে আছে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে। এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান সাজ্জাদ।