Image description

সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগপন্থী বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ থেকে সংঘবদ্ধভাবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো কান্ডে জড়ানো, অর্থ পাচার করে লন্ডনে বিলাসী জীবন, লন্ডনে ব্যবসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক পোস্ট করা শুরু হয়।

এসব পোস্টের কোনটিতে সংবাদমাধ্যমের সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এসব ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে দ্য ডিসেন্ট অনুসন্ধান শুরু করে তারেক রহমানকে নিয়ে যেসব নেতিবাচক বয়ান তার বিরোধীরা সংবাদমাধ্যমের বরাতে প্রচার করে থাকেন সেগুলো কোন কোন সংবাদমাধ্যমে কবে কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল- তা খুঁজে দেখতে।

দ্য ডিসেন্ট এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে তারেক রহমানকে নিয়ে সম্প্রতি আওয়ামী লীগপন্থী পেইজগুলো থেকে তার ‘ক্যাসিনো কান্ডে জড়ানো’, ‘ক্যাসিনো সম্রাট উপাধি পাওয়া’ ‘অর্থ পাচার করে লন্ডনে বিলাসী জীবন’, ‘লন্ডনে ব্যবসা’ ইত্যাদি যেসব বয়ান প্রচার করা হয়েছে সেগুলোর উৎস হচ্ছে মূলত চারটি সংবাদমাধ্যম: কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান এবং বাংলানিউজ২৪.কম।

কাকতালীয়ভাবে এই চারটি সংবাদমাধ্যমের মালিকানায় রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গ্রুপ বসুন্ধরা এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ।

(তবে এর বাইরেও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তারেক রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক খবরের স্ক্রিনশট ফেসবুকে প্রায়ই শেয়ার হতে দেখা যায়।)

সামাজিক মাধ্যমে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইনে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমের পুরনো খবর (সবগুলো খবরই ২০২৪ সালের আগের) ব্যবহৃত হলেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেখা যাচ্ছে এই গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলো ধারাবাহিকভাবে তারকে রহমানের প্রশংসামূলক প্রতিবেদন বা নিবন্ধ প্রকাশ করছে। সেরকম কয়েকটি প্রতিবেদন ও নিবন্ধ দেখুন এখানেএখানেএখানেএখানেএখানে ও এখানে

 

৫ আগস্টের আগে ও পরে তারেক রহমান ও তার পরিবারকে উপস্থাপনে বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলোর বৈপরিত্যের নমুনা

একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোতে একই ব্যক্তিকে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে ও পরে এমন বৈপরিত্যমূলক সংবাদ পরিবেশনের প্রবণতা লক্ষ্য করে আরও তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে দ্য ডিসেন্ট।

এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এই গ্রুপের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সদ্য প্রয়াত সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং দল হিসেবে বিএনপিকে নিয়ে কী কী ধরনের নেতিবাচক প্রতিবেদন বা নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছিল তা খুঁজে দেখেছে দ্য ডিসেন্ট।

এতে বেশ চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে।

এই চারটি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত ডাটা থেকে ‘তারেক’ ‘তারেক রহমান’, ‘তারেক জিয়া’, ‘খালেদা জিয়া’, ‘বেগম খালেদা জিয়া’, ‘বিএনপি’ ইত্যাদি কীওয়ার্ডের সাথে নেতিবাচক শব্দ যেমন: ‘দুর্নীতি’, ‘লুট’, ‘ষড়যন্ত্র’, ‘পাচার’, ‘ক্যাসিনো’, ‘ব্যর্থ’সহ বেশ কিছু কীওয়ার্ড যুক্ত করে সার্চ করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনের শিরোনাম গুগল সার্চে পাওয়া গেলেও সেগুলো ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেগুলোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তারিখের প্রিন্ট পত্রিকা বের করে প্রতিবেদগুলো পড়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এতে গত ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজ২৪.কম এবং ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সানে তারেক রহমান, খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এমন অন্তত ৮১টি প্রতিবেদন ও নিবন্ধ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ১৯টি অনলাইন থেকে বর্তমানে মুছে দেওয়া হয়েছে। তবে দ্য ডিসেন্ট ওয়েব্যাক মেশিন থেকে মুছে দেয়া বেশ কিছু প্রতিবেদনের লিংক উদ্ধার করেছে।

এরমধ্যে ৫২টি ছিল সংবাদ প্রতিবেদন, মোট নিবন্ধ বা কলাম ছিল ২৮টি, তারেক রহমানকে নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন ছিল ৩২টি, বিএনপিকে নিয়ে ২২টি, তারেক রহমানকে নিয়ে কলাম ছিল ৬টি, বিএনপির নামে কলাম ছিল ১২টি। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর ৪৪টি ছিল নামহীন সূত্রে লেখা।

এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, চারটি সংবাদমাধ্যমে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র এই ৮১টি প্রতিবেদনই নেতিবাচক হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে, তা বলা হচ্ছে না। বরং কীওয়ার্ড সার্চে এই ক’টি প্রতিবেদন এসেছে। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোর প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশিত কিন্তু ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়নি, বা আগেই ওয়েবসাইট থেকে মুছে দেয়া হয়েছে বা নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড সার্চে আসেনি- এমন প্রতিবেদন থাকতে পারে।

আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এই নির্দিষ্ট সময়ে তারেক রহমান, খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে নিয়ে কোন ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি- তা বলা হচ্ছে না। বরং ইতিবাচক কী প্রকাশিত হয়েছিল তা খুঁজে দেখা হয়নি এই লেখায়। 

এই ‘মিডিয়া ওয়াচ’ প্রতিবেদনটি শুধু দেখতে চেয়েছে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তারেক রহমান, খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে নিয়ে যেভাবে ইতিবাচক খবর প্রকাশিত হচ্ছে তা বিপরীতে ৫ আগস্টের আগে এই ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হয়েছিল কিনা, হয়ে থাকলে সেগুলো কতটা তথ্যনির্ভর ছিল?

প্রাপ্ত ডাটা অনুযায়ী, ৫ আগস্টের আগে খুঁজে পাওয়া ৫২টি সংবাদ প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু ছিল: বিএনপি এবং তারেক রহমানের “টাকা পাচার, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র, বিএনপির দুঃশাসনের কারিগর, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড, বিএনপি দল হিসেবে ব্যর্থ, খালেদা জিয়া-তারেক রহমান দল চালাতে ব্যর্থ” ইত্যাদি।

এসব বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রের উল্লেখ থাকতো না। এর মধ্যে ৪৪টি প্রতিবেদনে একবারের জন্যও নাম পরিচয় যুক্ত কোন সূত্রের বরাত দেয়া হয়নি! এই সংবাদ প্রতিবেদনগুলো বেশিরভাগ সময়েই ছাপা হয়েছে প্রিন্ট হওয়া কপিতে প্রথম পাতায়।

কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিবেদনগুলোর কয়েকটি উল্লেখ্যযোগ্য শিরোনাম হচ্ছে: ‘বিএনপির দুঃশাসনের কারিগর ছিল তারেক’, ‘উপার্জন না করেও লন্ডনে তারেকের বিলাসী জীবনের রহস্য উন্মোচন! সিলেট থেকে যাচ্ছে বিপুল অর্থ’, ‘ক্যাসিনোর আইডিয়া তারেকের!’, ‘খালেদা তারেক দলীয় পদও হারাচ্ছেন’, ‘পিএসসি ছিল হাওয়া ভবনের দখলে, টাকার বিনিময় সরকারি চাকরি’।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায় ‘দেশের রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা’ নামে পাঁচ পর্বের বিশেষ প্রতিবেদন পাঁচ দিন ছেপেছিল প্রথম পাতায়। এগুলোর শিরোনাম ছিল এমন— ‘তারেক-আইএসআই নিবিড় যোগাযোগ’, ‘বিএনপি জামায়াতের প্রার্থী তালিকা আইএসআইয়ের বানানো’, ‘সড়ক আন্দোলনেও ইন্ধন ছিল পাকিস্তানি আইএসআইর’।

কালের কণ্ঠের ২৮টি প্রতিবেদন পাওয়া যেগুলোতে সুস্পষ্ট সূত্র, প্রমাণাদি ছাড়াই বিষোদগার, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং অসত্য তথ্য ছড়ানো হয়েছিল তারেক রহমান, খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে নিয়ে। এরমধ্যে তারেক রহমানকে নিয়েই ছিল ১৬টি প্রতিবেদন, আর ১২টি ছিল বিএনপি দলের ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে। ১৫টি কলাম ছিল বিএনপি ও তারেক রহমানকে নিয়ে নেতিবাচক। কয়েকটি কলামের শিরোনাম ছিল, “জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলটির বিরামহীন অপকর্ম”, “শেখ হাসিনা পারেন, খালেদা জিয়া পারেন না”, “তারেক ক্ষমতায় এলে রক্ত গঙ্গায় ভাসাবেন?”, “তারেক জিয়ার রাষ্ট্রদ্রোহিতার একটি নমুনা”, “হায় আল্লাহ, বেগম খালেদা জিয়াও বীর মুক্তিযোদ্ধা!” ইত্যাদি।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের অন্তত ২১টি সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৪টি ছিল তারেক রহমানকে নিয়ে আর বিএনপিকে নিয়ে ছিল ৭টি। পত্রিকাটির উপসম্পাদকীয় পাতায় ছাপানো ৫টি কলাম আমরা বিশ্লেষণ করি, এরমধ্যে তিনটি ছিল বিএনপির নামে আর দুটি তারেক রহমানের নামে। একটি কলামের শিরোনাম ছিল এমন- ‘তারেক ক্ষমতায় এলে রক্ত গঙ্গায় ভাসাবেন?’

বাংলানিউজ২৪.কমের তিনটি প্রতিবেদন, দুটি কলাম আর ডেইলি সানের চারটি প্রতিবেদন, তিনটি কলাম বিশ্লেষণ করে একই ধরনের নামহীন সূত্রের বরাতে ভিত্তিহীন তথ্য এবং বিষোদগার পাওয়া গেছে।

চারটি সংবাদমাধ্যমে প্রাপ্ত ৮১টি সংবাদ প্রতিবেদন ও কলামের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে— ৬টি প্রতিবেদন ছিল তারেক রহমানের পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং ইসরায়েলের মোসাদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র বিষয়ক, তারেক রহমানের দুর্নীতি অথবা টাকা পাচার সংক্রান্ত ছিল ১৪টি এবং ৮টিতে ছিল দেশ নিয়ে তার ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত এবং তিনি দল চালাতে ব্যর্থ এমন ছিল ৮টি; ১৩টিতে ছিল বিএনপির ষড়যন্ত্র, ‘বিএনপি দল ব্যর্থ’ নিয়ে ১৫টি, ৫টি জামায়াতের সঙ্গে থাকায় বিএনপির ক্ষতি, জন আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র-অর্থায়ন নিয়ে ৫টি, ভারতের সঙ্গে লিয়াজো নিয়ে ছিল ১টি।

 

‘তারেক রহমানের লন্ডনে বিলাসী জীবন, টাকা পাচার’

বিগত বছরগুলোতে সময়ে সময়ে তারেক রহমানের দুর্নীতি, লন্ডনে বিলাসী জীবন, টাকা পাচার ইত্যাদি বিষয়ে কালের কণ্ঠ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। 

২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে কালের কণ্ঠে ‘উপার্জন না করেও লন্ডনে তারেকের বিলাসী জীবনের রহস্য উন্মোচন! সিলেট থেকে যাচ্ছে বিপুল অর্থ’ এবং ‘সিলেট থেকে তারেকের কাছে বিপুল অর্থ পাচার’ নামে দুইটি প্রতিবেদনটি ছাপা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদকের নামের দুই প্রতিবেদনের ভাষা একই। এতে তারেক রহমানকে বিপুল অংকের টাকা পাচারে জড়িয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে। উপার্জন না করেও সেখানে তাঁর চোখ-ধাঁধানো বিলাসী জীবন। এই অর্থের উৎস কোথায়? অনুসন্ধান বলছে, দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার হচ্ছে তারেকের কাছে। বিশেষ করে সিলেট থেকেই যাচ্ছে বেশির ভাগ অর্থ। এ ছাড়া লন্ডনে অবস্থানরত সিলেটি রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী থেকেও পাচ্ছেন টাকা।’

প্রতিবেদনের শেষে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রসংগত, লন্ডনে পলাতক তারেক রহমান ২০১৮ সাল থেকে পরিবার নিয়ে উচ্চাভিলাষী জীবন যাপন করে আসছেন। যদিও তিনি কোনো কিছুই করেন না সেখানে। তাঁর ও পরিবারের উচ্চাভিলাষী জীবনের যাবতীয় অর্থের জোগান দিচ্ছে একটি চক্র। এই চক্রের বেশির ভাগ সদস্যের বাড়ি সিলেটে। এবার তাই সিলেটকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করবে বিভিন্ন সংস্থা।’

২০১৯ সালে ২৮ মে রেজোয়ান বিশ্বাস নামে প্রতিবেদকের বিশেষ প্রতিবেদন কালের কন্ঠের প্রথম পাতায় ছাপা হয়। এটির শিরোনাম ছিল- ‘৩০০ কোটি টাকা পাচার তারেক-ঘনিষ্ঠ অপুর’। এতে লাল রঙের বুলেট পয়েন্ট করে উল্লেখ করা হয়, ‘তারেক রহমানের সাবেক এপিএস মিয়া নুর উদ্দিন অপু হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করেন’। ‘নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের কাছে পাঠান ২৩ কোটি’। 

 

বাংলাদেশ প্রতিদিনে ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে ‘সিলেট ও ঢাকা থেকে তারেকের কাছে অর্থ পাচার’ শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশ হয়। নিজস্ব প্রতিবেদকের সংবাদটি একই বিষয়ে কালের কন্ঠের সংবাদটির পরিমার্জিত কপি।

এতে বলা হয়, “যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থানরত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে অর্থের জোগান দেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে নজরদারি শুরু করেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তারেক রহমান প্রায় ১৪ বছর লন্ডনে অবস্থান করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন; কিন্তু দৃশ্যত তার কোনো উপার্জন নেই। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তার অর্থের অন্যতম জোগানদাতা; যাদের অধিকাংশই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী এবং তারা সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা।”

এ ছাড়াও ‘লন্ডনে তারেকের কোম্পানি’, ‘কীভাবে লন্ডনে আছেন তারেক পরিবারের কেউই বাংলাদেশের ভোটার নন’ নামে আরো সংবাদ করেছে পত্রিকাটি। (৫১, ৬৫)

হাওয়া ভবনের সঙ্গে তারেক রহমানকে জড়িয়ে বেশ কয়েকটি রিপোর্ট ছাপে পত্রিকাটি। ‘পিএসসি ছিল হাওয়া ভবনের দখলে, টাকার বিনিময় সরকারি চাকরি’ শিরোনামের সোর্স ছাড়া সংবাদটি ছাপা হয় ২০২৩ সালের আগস্টের ৬ তারিখে। আওয়ামীলীগের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য হুবহু ছেপে দেয় কালের কন্ঠ।

বিস্তৃত এই রিপোর্টটিতে বলা হয়, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পিএসসি ছিল চরম দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু। তারেক রহমানের ‘হাওয়া ভবন’ নিয়ন্ত্রণ করত নিয়োগ বাণিজ্য...পিএসসিকে দলীয়করণ করে তারেক নিয়োগ বাণিজ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।’ প্রতিবেদনটিতে প্রথম আলোর রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়।

২০১৪ সালে ‘রায় ও রায় পরবর্তী বিএনপির ভবিতব্য’ শিরোনামে বাংলনিউজ২৪.কমের একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, “ভাঙা সুটকেসের মালিকের ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুঞ্জন ক্ষমতায় থাকতেই শোনা যায়। ‘হাওয়া ভবন’, ‘গ্রেনেড হামলা’তো আছেই। কাজেই পুত্রের মাঝে সবসময় পিতাকে খুঁজতে চাওয়ার মতো বোকামি আর নেই। তাতে মাঝে মধ্যে রাহুলের মাঝে রাজীব প্রাপ্তি হলেও তারেকে জিয়া নয়।”  আরেকটি কলামের শিরোনাম ছিল, “শাহবাগের গণজাগরণ এবং বিএনপির নিয়তি-২"।

 

যে কোন কেলেঙ্কারিতে তারেক রহমানকে জুড়ে দেয়া

২০১৯ সালে ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাঈল হোসেন সম্রাটকে কেন্দ্র করে ক্যাসিনো কান্ড নিয়ে রিপোর্টার লায়েকুজ্জামানের বিশেষ রিপোর্ট ছাপে কালের কন্ঠ। এতে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এটি পাওয়া যাবে এখানে

তবে এক সপ্তাহ পরেই কালের কণ্ঠ ক্যাসিনোর এটির দায় চাপিয়ে দেয় তারেক রহমানের উপর। ২৮ সেপ্টেম্বরে নিজস্ব প্রতিবেদক সূত্রে ‘ক্যাসিনোর আইডিয়া তারেকের!’ এবং কালের কণ্ঠ অনলাইন সূত্রে ‘মোহামেডান ক্লাবের ক্যাসিনোর টাকা পাঠাতেন তারেকের কাছে’ শিরোনামে একই প্রতিবেদন দুইবার দুই শিরোনামে প্রকাশ করা হয়।

এক সপ্তাহ আগের প্রতিবেদনে ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে ঢাকার একাধিক যুবলীগ নেতার তথ্য দেয়া হলেও পরের সপ্তাহে তা বদলে তারেক রহমানের সংশ্লিষ্টতার খবর প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ

এক সপ্তাহ আগের প্রতিবেদনে ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে ঢাকার একাধিক যুবলীগ নেতার তথ্য দেয়া হলেও পরের সপ্তাহে তা বদলে তারেক রহমানের সংশ্লিষ্টতার খবর প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ

এতে উল্লেখ করা হয়, ‘একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, ক্যাসিনোর আইডিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের’। আরো বলা হয়, ‘র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, ক্যাসিনো থেকে যে আয় করা সম্ভব এ ধারণা প্রথম তিনি পান তারেক রহমানের কাছ থেকে। বিএনপির আমলে এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে। এরপর ২০১৬ সালেও তিনি লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে কথা বলেন। তখন তারেক রহমান তাঁকে ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে যেতে বলেন। সেই অনুযায়ী তিনি প্রথমে মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো কারবার শুরু করেন। ক্যাসিনোর টাকা তারেক রহমানকেও পাঠাতেন তিনি।’ 

রিপোর্টিতে বিএনপির অন্যান্য নেতাদেরকেও ক্যাসিনো কান্ডে যুক্ত থাকার ব্যাপার দাবি করা হয়। এমন আরেকটি প্রতিবেদন এখানে

২০২০ সালে আলোচিত ‘রিজেন্টের সাহেদকে’ নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিএনপি সরকারের আমলে রাজাকার মীর কাসেম আলী ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সাথে সর্ম্পক গড়ে তা‌দের মাধ্যমে তা‌রেক জিয়ার হাওয়া ভব‌নের অন্যতম কর্তা ব্যক্তি হ‌য়ে উঠে সে (সাহেদ)।’ এমন আরো দুটি প্রতিবেদন দেখুন এখানেএখানে

কালের কণ্ঠে এ জাতীয় আরো কয়েকটি প্রতিবেদন দেখুন এখানেএখানে ও এখানে

 

‘আইএসআইয়ের সঙ্গে মিলে তারেকের ষড়যন্ত্র’

তারেক রহমান পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে মিলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন– একাধিক প্রতিবেদনে এমনটি দেখিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন। 

"দেশের রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা” শিরোনামে নামে ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিরিজ সংবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রতিদিন। ২১ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত “তারেক-আইএসআই নিবিড় যোগাযোগ” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অনুসন্ধানে জানা গেছে, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আইএসআইর রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। জানা গেছে, সৌদি আরবের জেদ্দায় গত ৪ জুলাই তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইর শীষর্স্থানীয় দুই কর্মকর্তার একটি বৈঠক হয়েছে।’

বিএনপি জামায়াত এবং তারেক রহমানকে আইএসআইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে বাকি চারটি পর্ব দেখুন এখানেএখানেএখানে ও এখানে।

 

এ ছাড়াও বিএনপির সঙ্গে মোসাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপিয়েছে পত্রিকাটি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তারেক রহমানের সম্পর্ক নিয়ে প্রতিবেদন করে বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘নরেন্দ্র মোদি কানেকশন তারেক রহমানের’ নামে প্রতিবেদনটিতে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘লন্ডনে বসেই তিনি গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছেন ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। লন্ডনপ্রবাসী মোদি সমর্থক ভারতের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তার’।

 

‘বিএনপির দুঃশাসনের কারিগর ছিল তারেক’, ‘দল চালাতে ব্যর্থ তারেক’

তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়েও নানা সময়ে প্রতিবেদন করেছে কালের কণ্ঠ। বিশেষত নির্বাচনের আগে পরে এ ধরনের বেশি দেখা গেছে। দলের দায়িত্ব পালনে তারেক রহমান ব্যর্থ দেখাতে এমনটি দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।

২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি নিজস্ব প্রতিবেদক সূত্রে “বিএনপির দুঃশাসনের কারিগর ছিল তারেক” শিরোনাম দিয়ে শেষ পৃষ্ঠায় ভারতীয় সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং ভারতের কয়েকজন লেখকের বক্তব্য দিয়ে প্রতিবেদনটি করে কালের কণ্ঠ। বিষোদগারের পাশাপাশি রিপোর্টে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বলা হয়, ‘ভোটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পটপরিবর্তনের পরীক্ষায় বাংলাদেশ উত্তীর্ণ।’

 

একই বছরের ১০ নভেম্বরে "নির্দেশনা নেই বিএনপির তৃণমূলে হতাশা", এরপর ২০১৯ সালের ১৬ আগস্ট "লক্ষ্যই স্থির করতে পারছে না বিএনপি" শিরোনামে একই ধাঁচের সংবাদ প্রকাশ করে।

২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর ‘ভারমুক্ত বনাম ভারযুক্ত : ভালো নেই মির্জা ফখরুল’ নামে একটি প্রতিবেদন করে কালের কন্ঠ। নিজস্ব প্রতিবেদকের এই সংবাদে বলা হয়, ‘ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তিতে নেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কার্যত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করলেও এখনো তিনি ‘ভারমুক্ত’ (পূর্ণ মহাসচিব) হতে পারেননি। অনেকের মতে, মূলত লন্ডনপ্রবাসী দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মন জুগিয়ে চলতে না পারাই এর নেপথ্য কারণ।’

২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি প্রতিবেদনে সাব শিরোনাম করা হয়, ‘বিএনপিতে বাড়ছে নেতৃত্বের সংকট, সংশ্লিষ্টরা বলছেন লন্ডন থেকে দল পরিচালনা সম্ভব নয়’। প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়, ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী দল পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। দেশের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে লন্ডন থেকে দল পরিচালনা সম্ভব নয়।

২০১৯ সালে ইংরেজি পত্রিকাটিতে খালেদা-জিয়া তারেক রহমানকে ব্যর্থ হিসাবে উপস্থাপন করে একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। ইউএনবির সংবাদ সূত্রে প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘বিএনপিতে ভাঙন এখন দৃশ্যমান; অনেকেই জুবাইদাকে নেতৃত্বে চান’।

প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়, “বিএনপির তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে হতাশা বিরাজ করছে, তা কাটিয়ে উঠতে ডা. জুবাইদা রহমানের মতো এক নতুন, ক্যারিশম্যাটিক ও সুনামসম্পন্ন নেতৃত্বের এখন প্রয়োজন।”

নির্বাচন কাছাকাছি ২০১৮ সালে ১ নভেম্বর কালের কন্ঠ লিড নিউজ ছাপে "খালেদা-তারেক দলীয় পদও হারাচ্ছেন”। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘দণ্ডিত বা দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি দলীয় পদে থাকতে পারবেন না বিএনপির গঠনতন্ত্রের এমন ধারা সংশোধনের প্রস্তাব বাতিল করে ব্যবস্থা নিতে বলেছে ইসিকে। ফলে খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমান দলের শীর্ষপদে থাকতে পারবেন না। উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার যথাক্রমে সাত ও দশ বছরের কারাদন্ড এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও একটি অর্থ পাচার মামলায় তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন ও সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।’

 

'শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও গ্রেনেড হামলায় বিএনপি'

৫ আগস্টের পর বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলোর একাধিক প্রতিবেদনে (দেখুন এখানেএখানে ও এখানে) প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এর বিরুদ্ধে ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জিয়া পরিবারকে ফাঁসানোর’ অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও একই কাজ বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলোও করেছিল! অর্থাৎ, গ্রেনেড হামলায় জিয়া পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে সিরিজ রিপোর্ট করেছিল সংবাদমাধ্যমগুলো।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় প্রথম আলো তারেক রহমানকে দায়ী করেছে বলে ৫ আগস্টের পরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলো। তবে ৫ আগস্টের আগে বসুন্ধরার সংবাদমাধ্যমেও তারেক রহমানকে এই ঘটনায় দায়ী করে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় প্রথম আলো তারেক রহমানকে দায়ী করেছে বলে ৫ আগস্টের পরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলো। তবে ৫ আগস্টের আগে বসুন্ধরার সংবাদমাধ্যমেও তারেক রহমানকে এই ঘটনায় দায়ী করে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল

২০১৬ সালে ‘শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা বার বার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে শুধু ‘সূত্র জানায়’ বরাতে লেখা হয়, ১৯৯১ সালে ধানমন্ডি স্কুলে উপনির্বাচনে ভোট দিতে গেলে গ্রিনরোডে গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির কর্মীরা গুলিবর্ষণ ও বোমার বিস্ফোরণ করিতে শুরু করে। ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালায়।

ডেইলি সানের ২০২১ সালের ২১ আগস্ট একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা: রায় কার্যকরে বিলম্ব, কতদিন লাগবে?’। বিশেষ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহতদের পরিবার দ্রুত রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন, যদিও আদালত ইতোমধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৪৯ জনকে দণ্ড দিয়েছেন।’ (৯৩) ডেইলি সানের আরেকটি বিভ্রান্তিকর শিরোনামের খবর দেখুন এখানে

 

‘বিএনপি একটি ব্যর্থ দল’

বিএনপিকে নিয়ে করা প্রতিবেদনগুলোতে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন, গ্রেপ্তার-মামলার বিষয় এড়িয়ে তাদেরকেই দোষারোপ করার দিকটি লক্ষ্য করা গেছে।

২০১৫ সালে ১৫ মে ‘ভুলে ভুলে ডুবতে বসেছে বিএনপি’ নামে এনাম আবেদীন ও শাফিক শাফির বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ।

এতে বলা হয়, ‘২০০১ সালের নির্বাচনের আগে দলীয় কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে বনানীতে ‘হাওয়া ভবন’ ভাড়া নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি করেন তারেক রহমান। বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দলের অনেকেও আড়ালে হাওয়া ভবনের ভূমিকাকে দায়ী করেন।’ 

প্রতিবেদনটিতে বিএনপির দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে আরো বলা হয়, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি ঠিক করতে পারেনি বিএনপি। দলীয় নেতাদের মূল্যায়ন, ওই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

বিশেষত নির্বাচনের সময় বিএনপিকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদনগুলো বেশি দেখা যায়। ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর ‘সরেজমিন অনুসন্ধান : ঢাকায় ধানের শীষ কোথায়? পোস্টার না লাগিয়েই ছেঁড়ার অভিযোগ’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কন্ঠ। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয় বিএনপি থেকে গণসংযোগে বাধা, মাইক লাগাতে না দেওয়া, পোস্টার ছেড়ার অভিযোগ থাকলেও সরেজমিনে তারা প্রমাণ পাননি। এটা এক ধরনের প্রচারণা কৌশল হতে পারে বিএনপির। এমন আরেকটি প্রতিবেদন এখানে

বাংলাদেশ প্রতিদিনে ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে ‘পথহারা বিএনপি, সরকারে তলিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ’ শিরোনামের লিড প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দফায় দফায় আলটিমেটাম, কখনো বা হেফাজতে ইসলাম, মাঝেমধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি বিতর্কের চোরাবালিতে ডুবেছে বিএনপি। অন্যদিকে মানি লন্ডারিং ও দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় বিএনপির জন্য নেতিবাচক বিতর্কের সৃষ্টিই করেনি একটিতে নির্বাসিত জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকার তারেক রহমানকে বিতর্কিত করেছে।’

 

জন আন্দোলনকে 'বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র' হিসেবে প্রচার

শাপলার ঘটনায় জামায়াত-বিএনপির উপর দায় চাপানোর কয়েকটি প্রতিবেদন কালের কন্ঠ প্রচার করেছে। ২০১৩ সালের ২২ মে একটি প্রতিবেদন করে কালের কণ্ঠে। হেফাজতে অর্থের জোগানদাতা ১৮ দল শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘৫ মে’তে পবিত্র কুরআন পোড়ায় জামায়াত শিবির ছাত্রদল যুবদল নেতাকর্মীরা।’

এটি দেখা যায় জুলাই আন্দোলনের সময়ও। ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই রেজোয়ান বিশ্বাসের বিশেষ প্রতিবেদন ‘নেপথ্যে জামায়াত-বিএনপির শীর্ষ ৫০ নেতা’ সংবাদে বলা হয়, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে জামায়াত-বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অর্ধশতাধিক নেতার নাম পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাঁরা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হামলার পরিকল্পনা করেন। তাঁদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।’

এর আগে ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় ছাদ থেকে পাইপ বেয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নামার খবরকে বিকৃত করে একটি সংবাদ প্রতিবেদনে কালের কন্ঠ লিখেছে, “ছাদ থেকে ফেলা সবাই স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল এক হয়ে তাঁদের ওই ভবন থেকে নিচে ফেলে দেয় বলে আহতদের পারিবারিক সূত্রের অভিযোগ। পত্রিকার ঢাকা ও চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিবেদক বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ছাদ থেকে ১৫ জনকে ফেলা হয় নিচে’।

 

বিএনপির ভারত বিরোধিতা নিয়েও সমালোচনা

বিএনপির ভারত বিরোধিতা নিয়েও কালের কন্ঠের সমালোচনা দেখা যায়। গত ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ নিজস্ব প্রতিবেদকের নামে ‘বিএনপির ভারত বিরোধিতা নিয়ে প্রশ্ন’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। যদিও এর আগে গ্রুপটির আরেক পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিনে তারেক রহমানের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রয়েছে বলে নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছিল।

২৪ সালে কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে এতে বলা হয়, “বিএনপির প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। দলটির এই অবস্থানের সঙ্গে মালদ্বীপে ভারতবিরোধী তৎপরতার মিল দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের অনেকে। তাঁরা বলছেন, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি হতাশা থেকে এ ধরনের অবস্থান নিয়েছে। তবে এতে বিএনপির উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”