Image description

ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) পরিচালিত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) ভিসি নিয়োগের জন্য সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গত ৪ জানুয়ারি। এই পদে এগিয়ে ছিলেন বাংলাদেশের তিনজন একাডেমিশিয়ান। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স না মেলায় সে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়নি।

এদিকে পুনরায় সাক্ষাৎকারের দিন নির্ধারণ করেছে পরিচালক প্রতিষ্ঠান ওআইসি। কিন্তু আগামী বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সাক্ষাৎকারে পূর্বের প্যানেলের দুজন ডাক পাননি। অভিযোগ, প্রথম সাক্ষাৎকার আহ্বানের সময় ওআইসির পছন্দের শীর্ষ তিনে থাকা বাংলাদেশি একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে সেই দুজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে নতুন দুজনকে যুক্ত করা হয়েছে।

আইইউটি গাজীপুরে অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের পদত্যাগজনিত কারণে পদটি শূন্য হওয়ার পর নতুন ভিসি নিয়োগের লক্ষ্যে ওআইসি গত বছরের ১৩ মে বৈশ্বিকভাবে আবেদন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি দেয়। বিজ্ঞপ্তিটি আইইউটির ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও ব্যাপক প্রচারিত হয়।

সূত্র বলছে, প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনলাইন সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তিনজন যোগ্য প্রার্থীর একটি প্যানেল চূড়ান্ত করে ওআইসি। এই তিন প্রার্থীর চূড়ান্ত সাক্ষাৎকার সরাসরি গ্রহণের জন্য এ বছরের ৪ জানুয়ারি সৌদি আরবের জেদ্দায় ওআইসি সদর দপ্তরে দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ওআইসি কর্তৃপক্ষ হোটেল বুকিং, বিমান টিকেটসহ সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ক্লিয়ারেন্সের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানায়। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রার্থীদের কাউকেই ক্লিয়ারেন্স দেয়নি। ফলে ঢাকা থেকে উড্ডয়নের দু’দিন আগে প্রার্থীরা জানতে পারেন তাদের সাক্ষাৎকার স্থগিত করা হয়েছে।

চূড়ান্ত সাক্ষাৎকারের তালিকায় থাকা ওই তিন প্রার্থীর একজন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। অপর দুজনের মধ্যেও একজন বুয়েটের অধ্যাপক ড. সোহেল রহমান, যিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য। তৃতীয়জন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি। এর মধ্যে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি পুনর্নির্ধারিত সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পেয়েছেন অধ্যাপক সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া।

ওই সময়ে একটি সূত্র দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানায়, তিনজনের এই প্যানেল বাতিল করার কথা একজন উপদেষ্টার কাছে স্বীকার করেছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন। কারণ হিসেবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ভাল আসেনি বলে জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া নিজস্ব পছন্দের এক প্রার্থীর কথাও বলেছিলেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পছন্দের ওই প্রার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং জাপান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া তিনি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী পরিবারের সন্তান বলেও পরিচিত।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে তিনি দেশে ফিরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার চেষ্টা করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি পুনরায় মালয়েশিয়ায় চলে যান। ওআইসির প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত তিন প্রার্থীর তালিকায় তার নাম ছিল না। তবে ওআইসির পছন্দের তালিকার শীর্ষ তিনে নতুন করে যুক্ত হওয়া দুজন প্রার্থীর মধ্যে তিনি আছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রথম শর্টলিস্টে থেকেও বাদ পড়া এক প্রার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রাথমিক সাক্ষাৎকারের পর লম্বা একটা তালিকা থেকে আমরা শর্টলিস্টেড হলাম। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স না থাকায় উড্ডয়নের এক-দুদিন আগে সব কিছু ক্যান্সেল হয়ে গেল। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হলাম, এখন আমাদের দুজনকে বাদ দিয়ে নতুন করে দুজনকে তালিকায় নেওয়া হচ্ছে। যদি ক্লিয়ারেন্সই সমস্যা হবে, তাহলে আমরা দীর্ঘদিন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কিভাবে পালন করছি? এসব দায়িত্বে তো আমাদের আসার কথাই ছিল না।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আইইউটির ভিসি নিয়োগ সম্পূর্ণ ওআইসির বিষয়। এর সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত প্রার্থীরা বাংলাদেশি হওয়ায় ওআইসি বাংলাদেশের কাছে ক্লিয়ারেন্স চায়। সে সময় তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার ওপর এই দায়িত্ব ন্যস্ত করে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি ওআইসি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, শুধু এটুকুই নয়, ৪ জানুয়ারি কিংবা আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে এ বিষয়েও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়নি ওআইসি। ফলে ৪ জানুয়ারির আগেই ক্লিয়ারেন্স জমা দেওয়ার বিষয়টি জানত না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে দ্রুত ক্লিয়ারেন্স জমা দেওয়া হয়।

সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেনের পছন্দের ছিল কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি সঠিক নয়। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সব সময় নির্মোহ থাকতেন। আমরা গোয়েন্দা প্রতিবেদন যেমন পেয়েছি, তেমনটাই ওআইসিকে পাঠিয়েছি। কারো ব্যাপারে কোনো সুপারিশ করা হয়নি।