Image description

মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে আগের প্রশাসকদের সরিয়ে নতুন প্রশাসক হিসেবে বিএনপি নেতাদের নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গত রোববার এক প্রজ্ঞাপনে স্থানীয় সরকার বিভাগ জানায়, করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে মেয়রের বদলে সরকার প্রশাসক বসালেও সিটি করপোরেশনগুলোতে কাউন্সিলর না থাকায় ভোগান্তি যাবে না নগরবাসীর। গত দেড় বছরের মতো বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিতই থাকতে হবে। কারণ, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে ১৪ ধরনের নাগরিক সেবা দেওয়া হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সব কাউন্সিলরকে বরখাস্ত করায় এই সেবা কার্যত বন্ধ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নির্বাচন না হলে এমন সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না থাকায় পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে– বলা যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে এখনও প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী সমকালকে বলেন, প্রশাসনের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসকের কাজ করতেন। এতে জনপ্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ জন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করবেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচন দ্রুতই করার পরিকল্পনা আছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি চিঠি পেয়েছি; সেটি পর্যালোচনাধীন। কমিশন বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর নির্বাচন আয়োজনের কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।

স্থানীয় নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের ৫৯-এর ১ ধারায় বলা আছে, আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার দেওয়া হবে।

আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২ জুন। সে হিসাবে গত বছরের ১ জুন এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ জুন। এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২২ ফেব্রুয়ারি। এই তিন সিটিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব আবু আলম শহীদ খান সমকালকে বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত দ্রুত হবে, ততই ভালো। এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৭ উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার প্রথম কর্মদিবসেই জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। 

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, সামনে একের পর এক স্থানীয় নির্বাচন করতে হবে ইসিকে। সংসদের দুটি আসনের ভোট গ্রহণের পর সিটি করপোরেশন দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে সব স্থানীয় নির্বাচন সেরে ফেলতে হবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করবে কিনা– এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার এসব আইন পরিবর্তন করে অধ্যাদেশ আকারে জারি করেছে। বর্তমান সরকারকে সেগুলো আইনে রূপান্তর করতে হবে। এরপর নির্বাচনের কাজ শুরু হবে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন দ্রুত ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনও গ্রহণ করেনি।

স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে চব্বিশের আগস্টে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। পৃথক অধ্যাদেশগুলোতে সরকারকে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই ক্ষমতাবলে ইউনূস সরকার ঢাকা উত্তর সিটিতে মোহাম্মদ এজাজকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। অন্যান্য করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভায় সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

জামায়াত, এনসিপি তখন থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দাবি করছে। বিএনপি সংসদের আগে স্থানীয় নির্বাচনের বিরুদ্ধে ছিল। গত আগস্টে আরও চারটি পৃথক অধ্যাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বন্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সংবিধান অনুযায়ী, সরকারের নির্দেশনা সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন করবে। জুলাই সনদে এই ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই তাতে একমত হয়। 

প্রশাসক হলেন যারা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম। একসময় তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। গত নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন। বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান। গত নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান তিনি। 

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে দেওয়া হয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব। খুলনা-২ আসনের এই সাবেক এমপি এবারও একই আসন থেকে নির্বাচন করে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এবারের নির্বাচনে তিনি সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে তাঁকে মনোনয়ন না দিয়ে সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে মেয়র পদে নির্বাচন করে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলের মনোননয়ন চেয়েও পাননি। 

গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি গাজীপুর-২ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। এর আগে টানা ১০ বছর তিনি কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

নগরবাসীর ভোগান্তি
সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে যেসব নাগরিক সেবা দেওয়া হয়, তার মধ্যে অন্যতম জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন। এ ছাড়া নাগরিক, চারিত্রিক, উত্তরাধিকারী (ওয়ারিশ), আয়, অবিবাহিত, দ্বিতীয় বিয়েতে আবদ্ধ না হওয়া, পারিবারিক সদস্য, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদও দেওয়া হয়। 

পাশাপাশি বিভিন্ন প্রত্যয়ন, অনাপত্তিপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় যাচাইকারী হিসেবে স্বাক্ষর দিতে হয় কাউন্সিলরকে। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে মশক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের তদারকি এবং টিসিবির পণ্য বিতরণের কাজও পরিচালিত হতো কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে। পাসপোর্ট ইস্যু, ব্যাংক হিসাব খোলা, জমির মালিকানা পরিবর্তনসহ নানা প্রয়োজনে এসব কাগজ লাগে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর একযোগে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করার পর থেকে সেবা পেতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও তাদের দিয়ে এসব সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একটি জন্ম সনদ যেখানে এক দিনেই পাওয়ার সুযোগ ছিল, সেটি পেতে এক মাস লাগার নজিরও সৃষ্টি হয়েছে। 

স্থানীয় নির্বাচন চায় জামায়াত
ছয় সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের প্রতিবাদ করে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সোমবার বিবৃতিতে বলেছেন, দলীয় পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি; নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং পাতানো নির্বাচনের প্রথম ধাপ। নবগঠিত বিএনপি সরকার এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শুরুতেই জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপি সব জায়গায় বিনা ভোটের মেয়র দিচ্ছে: এনসিপি
অন্তর্বর্তী সরকারকে বিনা ভোটের সরকার বলে গালি দেওয়া বিএনপি এখন সব জায়গায় বিনা ভোটের মেয়র দিচ্ছে বলে অভিযোগ এনেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গতকাল রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন। 

পোস্টে আসিফ মাহমুদ বলেন, শহরগুলোতে ভোটের অঙ্ক দেখে নির্বাচন দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না সরকারি দল। ইন্টেরিমকে সকাল-বিকেল বিনা ভোটের সরকার বলে গালি দেওয়া দলটি এখন বিনা ভোটের মেয়র দিচ্ছে সব জায়গায়। তিনি লেখেন, ‘আপকামিং: বিনা ভোটের উপজেলা চেয়ারম্যান, বিনা ভোটের ইউপি চেয়ারম্যান, বিনা ভোটের মেম্বার, বিনা ভোটের ওয়ার্ড কাউন্সিলর।’